কপালে ভাঁজ ফেলে ভিকনাথ বলল, তুমি ওর সাথে কথা বলবে নি। তুমি ওর সাথে কথা বললে দশ লোকে দশ কথা শোনায় আমাকে।
-তা তো শোনাবেই। নরম মাটিতে যে বেড়াল বাহ্যি সারে গো! ঝারি অদ্ভুত দক্ষতায় মুখে বিষাদ মাখিয়ে হাসল।
ভিকনাথ নিজেকে শুনিয়ে বলল, গাঁয়ে বাস করলে গাঁয়ের মানুষের কথা শুনতে হবে। তুমাকে নিয়ে কতবার বিচার সভা বসল। কই পাড়ায় আর কুনো বউকে নিয়ে তো এসব হয় না।
আরে কুনো বউতো আমার মতন নজর কাড়া নয়। ঝারি তার কাচবরণ শরীরের দিকে তাকাল। এই শরীরটাই তার কাল হল। সুফল ওঝাও ছিপ ফেলতে চেয়েছিল শরীরের নদীতে। ঝারি তাকে হাসতে হাসতে ফিরিয়ে দিয়েছে। ভরা বুকে জল ছলছল ঢেউ দিয়ে বলেছে, তুমার মেয়ের চাইতে আমি আর ক’ বছরের বড়ো হবো গো। আমাকে মেয়ে না ভাবো, বুন ভাবতে দোষ কুথায়?
সুফল ওঝা মনোক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে গিয়েছে। ঝারি আর এই পাপকথা দু’কান করার স্পর্ধা দেখায় নি। বরং নিজেকে বাঁধ দিয়েছে গোপনে। হাজার ঝামেলার মধ্যেও লুলারামকে হারের লকেটের মতো ঝুলিয়ে রেখেছে বুকের ভিতর। সবাইকে ভুলে গেলেও লুলারামকে সে ভুলতে পারবে না কোনোদিনও।
লুলারাম প্রায়ই বলে, চলো আমরা পেলিয়ে যাই। এত গুজুর পুটুর আর ভাল্ লাগে না। এভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে কি বাঁচা যায় গো?
ঝারির সমস্ত শরীর ঝাঁকা দেওয়া কুলগাছের মতো নড়ে উঠেছে, লুলারামের বুকে আঙুলের নিড়ুনি দিয়ে বলেছে, নিজের সুখের জন্য মেয়ে দুটার কথা কি তুমি ভাববে না। বৌদি নেই। সে থাকলে এট্টা অন্য কথা। বৌদির অবর্তমানে মেয়ে দুটাই তুমার সব। ওদের ব্যা-থা হয়ে গেলে তখন এসব আর একবার ভাবা যাবে। এখন এসব মুখে আনাও পাপ।
ঝারির স্পষ্ট কথা শুনে লুলারাম আর দ্বিতীয়বার এমন কথা মুখে আনার সাহস পায়নি। ঝারি তার চাইতে বয়েসে অনেক ছোট তবু ওর কথাবার্তায় যে বুদ্ধিমত্তার ছাপ আছে তা লুলারামকে অবাক না করে পারে না। তবু চিনচিনে একটা কষ্ট ঝারির জন্য তার ভিতরে চোরাস্রোতের মতো বয়ে যায়।
ঢিলির আত্মহত্যা ঝারিকে প্রচণ্ড দুঃখ দিয়ে গেছে। লুলারামের মুখ চেয়ে সে পাড়া ছেড়ে চলে গিয়েছে দু-মাসের উপর। দু-মাস লুলারাম তার বাপের বাড়িতে এসে দেখা করে গেছে, গোপনে সে বাঁচিয়ে রেখেছে অবৈধ সম্পর্কের বিষগাছ।
ঝারি যত বড়ো মুখ করে বলুক না কেন লুলারামের সাথে তার সম্পর্কটা লতিয়ে পেঁচিয়ে জড়িয়ে গিয়েছে সংসারের গায়ে। তার ঝটকা এসে লাগছে ভিকনাথের অস্থির মনে। সে আরো বিব্রত হয়ে পড়ছে। তার চোখের সামনে সব রাস্তাগুলো অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
দু-বেলা দু-মুঠো ভাত ছাড়া সে ঝারিকে আর কি সুখ দিতে পেরেছে। বিয়ের এত বছর পরেও কোল ভরল না ঝারির। ওর শরীরে দোষ আছে, ভূষণীবুড়ি গণনা করে বলে ছিল কথাগুলো। সব গাছে যে ফুল-ফল হয় এমন নয়। ঝারি স্বর্ণলতার মতো একলা, তার চোখ ধাঁধানো রূপ আছে কিন্তু সেই রূপের ব্যবহারিক কোনো প্রয়োগ নেই।
ভিকনাথের তিনকুলে কেউ নেই সেই জন্য খোটা খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে ঝারি। শাশুড়ি-ননদ থাকলে ওরা খোঁটা দিয়ে কানের পোকা বের করে ছেড়ে দিত। সেদিক থেকে ঝারি এখন ঝাড়া হাত-পা। শুধু লুলারাম আক্ষেপ করে বলে, আষাঢ়ে চাষ করে খেততলা ভরবেনি এ কেমুন কথা গো? চলো, গোয়াড়ী গিয়ে তুমারে বড়ো ডাক্তার দেখিয়ে আনি। আমার যে অনেক দিনের সখ তোমার গর্ভে আমার ছেলে যেন খেলা করে।
-যা হবার নয়, তা বারবার বলে আমায় কেনে দুঃখ দাও? ঝারির বুকের মধ্যে কাঁপুনি দেওয়া তোলপাড় শুরু হল।
লুলারাম তার চওড়া কপালে চাঁদের মতো ছোট্ট চুমা খেয়ে বলল, কেন দুঃখ পাও, তুমার এই শরীলে দুঃখ বড়ো বেমানান। যত দিন বাঁচবা মুখে হাসি রেখে বেঁচো, দেখ না মাছেরা কেমুন বেঁচে থাকে, কখনও কানদে না।
ঝারি কুঁকড়ে গেল, তুমি আমারে এত ভালোবাসো তার প্রতিদানে আমি তুমারে কিছু দিতে পারলাম না। মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো। বিথা এ শরীল বয়ে বেড়িয়ে কী লাভ? এর চেয়ে গলায় ফাঁস নেওয়া ঢের ভালো।
কথাটা শোনার পর গভীর বিষাদ আর অনন্ত আক্ষেপে লুলারামের মুখটা উঠে গেল আকাশের দিকে, কী কথা শোনালে গো, এ কথা কানে শোনাও পাপ। তুমি যদি মরার কথা ভাবো আমি তাহলে কী করে বাঁচার কথা ভাবব? তুমার-আমার বাঁচা মরা তো লাঠাই-ঘুঁড়ির সম্পর্ক।
রাত বেড়ে যায় নিজস্ব নিয়মে। জামগাছের পেঁচাটা উড়ে গিয়ে বসে পাশের বাড়ির কুলগাছে। বাসার মধ্যে বসে থাকা পাখিগুলো ঘুম ভেঙে ডেকে ওঠে কিচির মিচির। পেঁচার গায়ের গন্ধে তাদের ভয় বাড়ে বই কমে না।
ভিকনাথ বিড়ি ধরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভাঙনটা সে টের পেয়ে গিয়েছে। ঝারি একটা স্বপ্নের সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে টলে ভেঙে যেতে পারে সেই পলকা সাঁকো।
ভিকনাথকে সে বাধা দেয় না, নিশ্চুপ পায়ে সে হেঁটে আসে বাইরে। শীত হাওয়ার দাপটে কুঁকড়ে আহে গাছের পাতা। শেষ রাতে যদি জ্যোৎস্না ফোটে তাহলে ভোরের ফুলের মতো হেসে উঠবে চরাচর। ঝারি এখনও স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। সম্পর্কটা স্থায়ী হবার পর থেকে সে নূপুর-নোলককে নিজের মেয়ে ভাবতে শুরু করেছে। সে আপন ভাবলে কি হবে–ওরা তাকে শত্রু ভাবে। হাবভাবে জানিয়ে দেয় ওরা তার ছায়া মাড়াতে নারাজ।
