আবার রাগটা চলকে ওঠে বুকের ভিতর। মা মাগো শক্তি দাও। মা শীতলা বুড়ি, তুমি এর বিচার করো। মুখের রক্ত উঠিয়ে মারো ওদের। আমার অর্থ নেই, অস্ত্র নেই, কিছু নেই। আমাকে বিচার দাও মা। না হলে আমি পাগল হয়ে যাবো। বাঁধের উপর বুক চাপড়ে দৌড়োবো। আমাকে কেউ ধরতি পারবে না। মা গো, মা। আমার মুখ রেখো মা। আবার নড়ে ওঠে ভিকনাথের ঠোঁট। যেন ঢাকের কাঠি চড়বড় করছে চামড়ায়। এবার বাজনা বাজবে। শিব নাচবে। ডাকিনী-যোগিনী সব নাচবে। ভিকনাথ সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আখখেতের আলোর উপর দাঁড়াল।
হতাশ ভিকনাথ একসময় ঘরের দিকে ফিরে আসে। গাই-বাছুরে মিল থাকলে সে কি করবে? হায়রে কলি, আমার বুকে শেল দে। এ পাপ আমি আর হজমাতে পারছি না। হয় আমাকে নে, নয়তো ওদের নে। এ খেলা সাঙ্গ কর। ঢের হল। বেলা গেল। ভিকনাথের আফসোসবাধের বাতাসে ডাং গুলি খেলে। খলখলিয়ে ওঠে আখগাছের ঢেউ। বেশির ভাগ আখ কেটে নিয়ে গিয়েছে কোম্পানীর লোক। মিল কোম্পানীর পেয়ালা ঘুরে ঘুরে পাহারা দেয়, রাতকালে ডাক ভাসায়, মাঠের অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া আসে, জাগো হে, জাগো জাগো।
এভাবেই বয়স বাড়ে সন্ধ্যার। তৃপ্ত হয়ে ঘরে আসে ঝারি। ভিকনাথ আসে তারও কিছু পরে। জোনাকপোকা টিমটিম করে জ্বলছে আলো। লেবুতলার ঝোড়ে ঝি ঝি পোকার উৎস বসেছে। আকাশ ভারত। তুলোবরণ মেঘ উড়ছে। তিনঝুঁটিয়া চুলায় কাঠের হুল ঠেলে দেয় যার, অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে চাফুটেছে টগবগিয়ে, একটা গুনগুনানো সুর ঝারির কমলায়ে ঠোঁটে জলের মুখে ফেনার মতো নরম হয়ে বাজে।
ভিকনাথ ঘরে ঢুকেই কটাশ চোখে তাকাল, চা-পাতার ফুটন্ত গন্ধটা বুকভরে টেনে নিয়ে সে কিছুটা নরম হবার চেষ্টা করল, কুথায় গেছিলে সাঁঝবেলায়?
যাব আর কুথায়। ঘরে জ্বালানি নেই। জ্বাল দেবার কাঠ ঢুনতে গেছিলাম। ঝারির চোখে মিথ্যে ঠেলে উঠল।
মিছে কথা বলতে মুখে বাঁধল না। ভিকনাথ ধীরে ধীরে তাতছিল।
ঝারি ঠোঁট উল্টে বলল, মিচে বলব কেনে? আমার সাথে ভারতী-বউদি গিয়েচিলো। বিশ্বেস না হয় শুধোও গে যাও।
চুলা থেকে চায়ের বাটিটা নামিয়ে গুঁড়া দুধ গুলল ঝারি। একটা জোনাক পোকা উড়তে উড়তে তার মাথার চুলে আটকে গেল। অন্য সময় হলে ঝারি ওই পোকাটাকে ধরে দেশলাইয়ে খালি খোলের ভেতর পুরে রাখত। আজ মেজাজ ঠিক নেই, ভিকনাথ তার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে, ঝারি চোরা চোখে ভিকনাথের দিকে তাকিয়ে ভারমুখ ঝুলিয়ে বসে থাকল।
ভিকনাথের নজর এড়াল না এসব, রাতের কথা ভেবে তার গলার সুর চটকানো কলার চেয়েও নরম হয়ে এল, তুমাকে ঘরে না দেখলে মাথায় আমার বোলতা কেমড়ে দেয়। তা ছাড়া দশ লোকে দশ কথা বলে। আমি যে কুনদিকে যাবো ঠিক বুঝতে পারচিনে।
অতো সন্দেহ নিয়ে বাঁচা যায় না। ঝারি ফুঁপিয়ে উঠল, এত বছর ঘর করচি হর রোজ পাশে শুচ্চি তবু তুমার বিশেস হয় না। বল, কী করলে তুমার বিশ্বেস হবে?
ভিকনাথ ফাঁদে পড়া চোখে তাকাল, তুমাকে আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারিনে।
–নিজেকে ঠিক বোঝো তো? চোখ মুছে কোনোমতে বলল ঝারি, কলিজা উপড়ে দিলেও তুমি আমারে বিশ্বেস করবে না। ওই সুফল ওঝা তুমার মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে। জানি নে ওর পিচে পিচে ঘুরে তুমার কি লাভ হয়? এর চেয়ে ঘরের কাজে মন দাও, কাজের কাজ হবে।
কিছুটা কুণ্ঠিত ভিকনাথ ঢোঁক গিলে ঝারির মুখের দিকে তাকাল, কানবার কি আচে? আমি খেটেখুটে ফিরলাম। ঘর বন্ধ। কোন মানুষটার মাথার ঠিক থাকে?
-তা বলে মুখে যে আসে তাই বলবে? ভাড়া করা মেয়েমানুষকেও কেউ অমন ভাষায় কথা বলে না। আমার কুনো যাওয়ার জায়গা নেই, তাই মুখে কুলুপ এঁটে পড়ে আচি। অন্য কেউ হলে অমন সনসারের মুখে লাথি মেরে ড্যাং-ড্যাং করে চলে যেত। আমি পারচি নে বলে আমাকে এত সাতাবে। শীতলা মা তুমার ভালো করবে নি।
–চা দাও দিনি, আর মিলা খ্যাজরম্যাজর করো নি। ভিকনাথ স্বস্তি এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাইল ওদের মাঝখানে।
দপ দপ করে জ্বলছিল ডিবরিটা, ময়লা জমেছে সলতেয়। সম্পর্কেও যদি ময়লা জমে তেল পৌঁছাতে পারে না ডগায়। ঝারি হার মানার মেয়ে নয়। সে সাতঘাট চষা মেয়ে। সরু কোমরে হিল্লোল জাগিয়ে বলল, লোকের মুখে ঝাল খেয়ে নিজের মাথায় ঘুঘরো পোকা কেন ঢুকালে বুঝিনে। সত্যি করে বলল তো লুলারামদা আমাদের কি কুনো খারাপ চায়? দায়ে-অদায়ে এগাঁয়ের কেউ তো পাশে দাঁড়ায় না, সে ছাড়া। যে মানুষটা কালো চুলের ভালো করবে তুমি তার পিছে লাগবে? কেমন মানুষ গো তুমি? যে তুমার ভালো করবে তারেই তুমি আছোলা বাঁশ দিবে।
-ওই হারামীটার নাম তুমি আর আমার ছিমুতে নিও না। ওর নাম শুনলে আমার গা চিড়বিড় করে। মুখ বেঁকিয়ে সমস্ত শরীরে একটা অপ্রতিরোধ্য ঘৃণার জন্ম দিল ভিকনাথ, ওর হয়ে ওকালতি করতে তুমার শরম লাগছে না। আমি হলে তো গলায় দড়ি দিয়ে মরতাম। ধাওড়াপাড়ার কেউ ওরে পছন্দ করে না। সব্বাই জানে–ও একটা রাড়ুয়া।
ঝারির বুকের গভীরে মোচড় দিয়ে উঠল ব্যথা, কী যা তা বলচো? কারোর সাথে কেউ কথা বললে খারাপ হয়ে যায় না। এক পাড়ায় গায়ে গা লাগিয়ে থাকি, দেখা হলো তো হাসতে হয়, কথা বলতে হয়। না হলে বনবাদাড়ে থাকা ভালো।
কিছুক্ষণ গুম ধরে থেকে ভিকনাথ অন্ধকারে তাকাল, পেঁচাটা ঘাপটি মেরে বসে আছে চারা জামগাছের ডালে, ওর চোখ দুটো জুলজুল করছে আঁধারে। ওই পেঁচাটার মতো লুলারামকে মনে হল ভিকনাথের। ঝারিকে সে ইঁদুরের মতো ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে। ঝারিও তার পুরুষ-ঠোঁটের ফাঁকে জিভ ঢুকিয়ে তাপ নেয়। জগৎখালি বাঁধের নীচে ওদের প্রায়ই দেখা যায়। লোকে যা বলে–সব কথা কি বানানো? যা রটে তা কিছু না কিছু বটে।
