দুলু ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। মাথাটা ভার হয়ে আছে সেই তখন থেকে। কোনো কিছু ভালো লাগছে না তার। মানোয়ারার উপর তার এখন আর কোনো টান নেই। মানোয়ারা নিজের হাতে খুন করেছে এই সম্পর্ক। নিজেকে আড়ালে সরিয়ে নিয়েছে সে। সে তো চাম এঁটুলি নয় যে জোর করে কারোর গায়ে আটকে যাবে।
ঘরে গিয়ে মন বসল না দুলুর, তার কান খাড়া হয়ে রইল একটা শব্দ শোনার জন্য। এত দূর থেকে মানোয়ারার সুর ভাসানো বিলাপ ভেসে এল বাতাসে। সত্যি কপাল পুড়েছে মানোয়ারার নাহলে গর্ভের সন্তান কেন বাপের মুখ দেখতে পাবে না।
আটটা নয় নটার পরে ট্রাক এসে থামল তেঁতুলতলায়। সঙ্গে দু-জন পুলিশ এবং আরো লোকজন। চাঁদ মহম্মদ পাগলের মতো ঘুরছে খবরটা শোনার পর থেকে আর মাঝে মাঝে চেপে ধরছে চুলের গোছা। বুক ভাসানো আর্তনাদে সে যেন খুঁজে পেতে চাইছে শোকের সান্ত্বনা। মেয়ের মুখোমুখি দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই তার। কেঁদে কেঁদে মেয়েটা তার পাগল হয়ে গেল। এ সময় নুরি বেগম থাকলে মেয়েটাকে সামাল দিতে পারত। ফাঁকা বুকের মাঝখানটা চিনচিনিয়ে উঠল চাঁদ মহম্মদের।
দুল তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চিৎকার করে ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁদে উঠল চাঁদ মহম্মদ। কাঁদতে কাঁদতে সে লুটিয়ে পড়ল তেঁতুলতলার ধুলোয়। ততক্ষণে পুরো পাড়া লুটিয়ে পড়েছে সাদাতের লাশের উপর। শ’ মানুষের চিৎকারে ডুবে যেতে লাগল মানোয়ারার হৃদয় নিঃসারিত কান্না।
.
বাঁধের উপর দাঁড়ালে পুরো আকাশ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে দূরের আখ খেতের উপর। ভিকনাথ দূরের দিকে তাকালো। সাহেবমাঠ থেকে ফিরে তার মাথার কোনো ঠিক নেই। ঘরের দরজায় টিপতালা মারা, খাঁ-খাঁ করছে চারপাশ। এই অবেলায় ঝারি গেল কোথায়?
বউটার পাড়া ঘোরার স্বভাব। ঘরে তার মন মোটে তিতে চায় না। শুধু বাইরপানে টান। কি যে পায় টো-টো করে ঘুরে কে জানে? ভিকনাথ কত দিন তাকে মানা করেছে, কথা শোনে নি। আজকাল তার স্বভাব হয়েছে বেয়াড়া। ভিকনাথ কোনো কথা বললে এ কান দিয়ে শুনে ও কান দিয়ে বের করে দেয়। বেশি বললে খিলখিল করে হাসে। ইচ্ছে করে বুকের কাপড় ফেলে দিয়ে ফাঁদ পেতে বসে থাকে পাখি ধরার জন্য।
বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে তেষ্টায় গলাটা খড়খড় করছিল ভিকনাথের। টিউকলের কাছে গিয়ে মুখ লাগিয়ে আর জল খেতে মন হল না। বয়স হয়েছে, এখন কি ওসব মানায়?
ভিকনাথ ঢালু পথ বেয়ে নেমে গেল বুড়িগাঙের দিকে। জল এখন শান্ত, কালচে সাপের মতো। সেই হিলহিলানো জলের দিকে তাকিয়ে ভিকনাথ ভাবছিল তার পোকাড়ে ভাগ্যের কথা। বিয়ের সময় তার মা বেঁচেছিল। কত করে মানা করল, রূপের ফাঁদে পা দিস নে বাপ। ফর্সা দেখে ঢললি, এটা কি তুর উচিত হল। মনে রাখিস ফরসা হল গিয়ে গুয়ের মালসা। ওদের যত ঘাটবি বদ-ঘেরান বেরুবে। দুর্গন্ধে মরে যাবি বাপ।
মায়ের কথাকে সেদিন কানে তোলে নি ভিকনাথ। ঝারির গালে টোল ফেলা হাসিটাই বারবার করে তাতিয়ে দিল তাকে। বিয়ের আগে ঝারিকে চুমা খেল সে ঝোপের আড়ালে। ঝারিও তাকে কোনো বাধা দিল না। পাখির মতো নরম চোখ তুলে বলল, আবার এসো। এবার এলে রেতের বেলায় এসো। মুরগি মেরে খাওয়াব।
-মুরগি তো আমাদের দেশেও পাওয়া যায়? শুধু মানসোর খাওয়ার জন্য এতদূর কেন আসব?
-তুমার মতলবের কতা বুঝেচি৷ ঝারি আবার গালে টোল ফেলে হাসল, যা খেতে চাও সব পাবা। তবে তার আগে গাছতলায় আমার কপালটা সিঁদুরে ফেটিয়ে দিও। মধু খেয়ে উড়ে গেলে আমি যে তখুন মরব।
ছিঃ, অমন কতা বলো না গো, প্রাণে বড়ো বাজে। আমারে যা ভাবো, আমি তেমনধারা নই গো। সময় এলে মিলিয়ে নিও।
এতদিন ধরে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে চলেছে ভিকনাথ। কত রাগ মনের ভেতর উথলায়। সব রাগ জল হয়ে যায় ঝারির হাসোন ভরা মুখটা দেখলে। বউটা আগে তো এমন ছিল না। ওই লুলারাম ওর কচি মাথাটা চিবিয়ে খেল। এটা সেটা দিয়ে মনটাও হাতিয়ে নিয়েছে সে।
ঝারি আগে মাঠের কাজে যেত, এখন আর সে যায় না। কেন যাবে? তার আঁচলের গেরোয় এখন সব সময় টাকা বাঁধা। লুলারাম তাকে লুকিয়ে-চুরিয়ে টাকা দেয়। টাকার বদলে ঝারি তাকে সব দেয়। এখানেই মরমে মরে যায় ভিকনাথ। তার হাত-পা রাগে অসাড় হয়ে যায়। মাথার ভেতর দশাতে থাকে বিষপোকা।
দু-জনের একজনকে খতম করে দেবে ভিকনাথ। একটা ফুলে দুটো ভ্রমর থাকবে কেন? একটা আকাশে দুটো চাঁদ কখনও কিহয়? সুফল ও সাথ দিল না। যদি সাথ দিত তাহলে কবে পগারপার হয়ে যেত লুলারাম।
সারাদিন রোদে জ্বলেছে ভিকনাথের শরীর, মাঠের কাজে ঝলসে গেছে রঙ। হাড়মাস কালি হয়ে যাবার যোগাড়। ঘরে এসেও বউয়ের হাতের এক গ্লাস জল পেল না। বউ গিয়েছে শ্যামের বাঁশি শুনে ঢলাতে। মা শীতলাবুড়ি, এ কী যুগ দিলে গো? ডিকনাথের ঠোঁট নড়ে চড়বড়িয়ে। পাগলের মতো সে খুঁজতে থাকে ঝারিকে। হাতের কাস্তেটা সে ফেলে না, শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এই কাস্তে দিয়ে মাঠে ঘাস কাটতে গিয়ে একটা খরিদ সাপের ড্যাকাকে কেটে ফেলেছিল সে। খরিম সাপের ছায়ের তেজ মা-খরিসের চেয়েও বেশি। সেই তেজী বিষধর সাপকে সে যদি কাটতে পারে তাহলে লুলারাম কোথাকার কোন ছার। একবার দেখা হলে এপার না হয় ওপার। এক কোপের বেশি দু’কোপ নেবে না সে।
