–মালকড়ি যা আচে দিয়ে দাও।
সাদাতের গা-হাত-পা কাঁপছিল। কাঁপা কাঁপা চোখে সে দেখল তার চার পাশে গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আরও চার পাঁচজন। লাইন হোটেলের সেই ছেলেটাকে সে দেখতে পেল সবার পিছনে। দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁতের মাংস খুঁটছিল ছেলেটা। মুচকি মুচকি হাসছিল সে।
রহমানকে গাছের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে ওরা। চাবি কেড়ে নিয়ে নিজেরাই রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দিল লরি। সাদাতের পাথর বসানো সোনার আংটি দুটো খুলে নিল ষণ্ডামার্কা লোকটা।
ফাঁকা রাস্তায় রাতের ট্রাক ছুটে যাচ্ছে সাঁইসাঁই। শীত হাওয়ার দাপটে বেশির ভাগ জানলা বন্ধ। বিপদ বুঝে সাদাত হাতজোড় করে বলল, টাকা পয়সা যা আছে, সব তো নিলে। এবার গাড়ির চাবিটা দিয়ে দাও। আমরা যাই। যাবি মানে? খিঁচিয়ে উঠল পাশে দাঁড়ানো লোকটা। গলায় মাফলার জড়িয়ে সে করে উঠল, আগে ট্রাক সার্চ হবে, তারপর
-কয়লাগুণ্ডি ছাড়া ট্রাকে আর কিচু পাবেনা। সাদাতের গলা শুকিয়ে আসছিল। প্রগাঢ় অন্ধকারে ভয় চেপে বসছিল ওর বুকের উপর।
তিন ব্যাটারির টর্চ জ্বেলে ড্রাইভার কেবিনে ঢুকে গিয়েছে তিনজন। হন্যে হয়ে ওরা খুঁজচে কিছু পাওয়া যায় কিনা। শেষে মানোয়ারার গোলাপী রঙের শাড়ির প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একজন খ্যাখ্যা করে হাসে। তার হাসিতে যেন বিষ ছিল, সাদাতের সারা শরীর জ্বলে উঠল রি-রি করে। দাঁত বের করে প্যাকেটটা নাচাতে নাচাতে ভুড়িওয়ালা লোকটা বলল, শালা হারামী, লুকিয়ে এটা ঘর নিয়ে যাচ্চিল, কী আছে এতে?
বউয়ের জন্য এট্টা শাড়ি কিনেছিলাম। সাদাত কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, আমরা গায়ে থাকি, ওখানে ভালো শাড়ি পাওয়া যায় না।
ভালো হয়েছে, এটা আমার বউ পরবে। ভুঁড়িওয়ালা লোকটা জানলা দিয়ে শাড়ির প্যাকেটটা ছুঁড়ে দিল নীচে। সাদাতের কলজেটা মুচড়ে উঠল এক অসহনীয় ব্যথায়, ভাই গো তুমাদের পায়ে ধরি, শাড়িটা নিও না। ঈদে বউটারে ভালো শাড়ি দিতে পারিনি, মনে আমার দুঃখ রয়ে গেছে।
-তোর দুঃখ তুই বোঝ। আমরা তো কুলি নই যে তোর বোঝ বইব।
সাদাতের কাকুতি-মিনতি সব ঝড়ের মুখে শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল। মুহূর্তে খুন চড়ে গেল তার মাথায়। গাড়ির রডটা তুলে নিয়ে সে সজোরে আঘাত করল মোটা লোকটার মাথায়। ঠোঙ্গা ফাটানোর মতো শব্দ হল একটা, তারপর গোড়া কাটা গাছের মতো কেবিন থেকে লোকটা ঠিকরে পড়ল নিচে।
রে-রে করে ছুটে এল আর সবাই। ওদের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।
-হায়রে, মেরে ফেলেচে গো! লাট্টুদারে মেরে ফেলেচে। কী আস্পর্ধা। ভুড়িওয়ালা লোকটাকে মেরে ফেলতে চায়নি সাদাত অথচ অঘটনটা ঘটে গেল চোখের নিমেষে। কী ভুল করল সে। এবার এদের হাত থেকে পার পাওয়া মুশকিল। সাদাতকে কেবিন থেকে টেনে নামাল ষণ্ডামার্কা লোকটা। অন্ধকারে চোখে আগুন উগরে সে বলল, তোর রক্তের বড়ো তেজ। যা, বাঁচতে চাস তো পালা। কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না সাদাতের। আশেপাশের মাঠগুলোয় শুয়ে আছে নিকষ কালো অন্ধকার। দুধারে ফাঁকা ধানের ক্ষেত। মাঝে মাঝে অস্পষ্ট ঝোপঝাড়।
যণ্ডামাক লোকটা এবার গর্জে উঠল, যা পালা। বাঁচতে চাস তো পালা। ওয়ান-টু-থ্রি..! পালা।
সাদাত প্রাণ বাঁচানোর দৌড়ে শরীর সামান্য নড়াতেই পিছন থেকে গুলি এসে ফুটো করে দিল তার পাঁজরা। পরপর ছটা। সাদাত লুটিয়ে পড়ল মানোয়ারার গোলাপী রঙের শাড়ির উপর।
চোখ বোজার আগে সাদাতের গলা থেকে বেরিয়ে এল অস্ফুট আর্তনাদ, হায় আল্লা…! তারপর দু-বার নড়ে নিথর হয়ে গেল তার দেহটা।
অন্ধকারে ডুবে রইল সাদাত, শুধু আলোর স্মৃতি হয়ে পড়ে রইল গোলাপী শাড়িখানা।
০৬. সাদাতের শোক
২৬.
বিকেলের পরে পুরো কালীগঞ্জ-মোকামপাড়া থমথম করছিল সাদাতের শোকে। থানার ওয়ারলেসে খবর এসেছে অনেক আগে। খবরটা শোনার পর থেকে কথা হারিয়ে দুলু চায়ের দোকানে বসে আছে চুপচাপ। মানোয়ারাকে এমন সংবাদ সে কোনোদিন দিতে পারবে না। আল্লাতালার এ কী নিদান! মাথায় কোনো কিছু ঢুকছিল না তার। জলজ্যান্ত মানুষটা ট্রাক নিয়ে গেল, কপালের কী লিখন, শেষে কিনা সেই ট্রাক বয়ে আনবে তার লাশ।
চা-দোকানী বলল, মন খারাপ করে কী হবে। ঠাণ্ডা পড়চে জব্বর। চা খাও।
হুঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে দুলু বলল, দাও এক কাপ। জানো দাদা, মনটা ভালো লাগচে না গো।
-ভালো না লাগারই কথা। দোকানদার আড় চোখে তাকাল, তার চোখের ভাষা অন্য, তুমার তো ভালো হল, ভাই। পাখি এবার তুমার উঠানে দানা খাবে।
তার মানে? ভাঁড়ের চা চলকে গায়ে পড়ল দুলুর, হু-হু জ্বালা করে উঠল, শালা দোজকের কীট, কুথায় কি বলতে হয় জানো না বুঝি? কোন আল্লা তুমাকে মানুষ করে পাঠিয়েছিল কে জানে! তুমি তো কাফেরেরও অধম। আগে জানলে আমি তুমার দোকানে বসতামনি।
দুলু চায়ের ভাঁড়টা রাস্তায় ছুঁড়ে দিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
সাইকেল নিয়ে থানায় গিয়েছিল মানোয়ারার চাচাতো ভাই ফজলু। সে হঠাৎ দুলুকে দেখে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল, খবর শুনেছিস? মানোয়ারার কপাল পুড়ল। সাদাত খুন হয়েছে। আহা রে, বুনটার আমার কি হবে বল তো?
কথা বলার ইচ্ছা করছিল না দুলুর, কী বলবে সে, বলার মতো কিছু বাকি নেই তার। ফজলু তবু ব্যস্ত হয়ে বলল, লাশ রাত আটটায় এসে যাবে। তুই একটু থাকিস।
