আসানসোলের বাজার থেকে মানোয়ারার জন্য একটা গোলাপী রঙের শাড়ি কিনেছে সাদাত। এবার ঈদের শাড়িটা মানোয়ারার পছন্দ হয়নি তেমন একটা। দেবগ্রামের বাজারে ভালো শাড়ি খুব কম পাওয়া যায়। বহরমপুর মুর্শিদাবাদ গেলে হয়ত মনের মতো শাড়ি পাওয়া যেত। মানোয়ারার শরীর সাথ দিল না। ঈদের বাজার দেবগ্রাম থেকে সারতে হল তাকে। সেই থেকে সাদাতের মনে মনে একটা ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলে সে মানোয়ারার জন্য একটা ভালো শাড়ি কিনে আনবে। মেয়েদের মন পেতে গেলে শাড়ি গয়নার প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
পাকা গমের মতো মানোয়ারার গায়ের রঙ। হাসলে সেই রঙের সাথে মিশে যায় গোলাপী আভা। পুরো মুখটা তখন গোলাপের চেয়েও সুন্দর হয়ে ওঠে। মানোয়ারার এই রূপটাই দু’চোখে আঁকা হয়ে আছে সাদাতের। নুরি বেগমের পুরো মুখটাই যেন মানোয়ারার মুখে বসানো। যৌবনে নুরি বেগমের দিকে তাকালে অনেক হাজী-কাজীর বুকে শুরু হত ভূমিকম্প।
মানোয়ারা মায়ের স্বভাব পেয়েছে, তার চোখের তারায় মাঠ পালানো হাওয়ার যাদু-ছোঁয়া। সাদাতের ডর লাগে। বনের পাখি খাঁচার শাসন ভালোবাসে না। যার উড়ে বেড়ানো স্বভাব তার কি ঘরের চার দেওয়াল ভালো লাগে। সাদাতের চোখের সামনে এখনও দুলুর করুণ মুখের অসহায় ছবিটা ভেসে ওঠে। মানোয়ারা তাকে ধোঁকা দিয়েছে। সেই চোট এখনও সামলে উঠতে পারেনি। শরীরের ঘা দ্রুত সারলেও মনের ঘা সহজে শুকোয় না। দুলুর দীর্ঘশ্বাস সাদাতের উপর পড়ছে। কাউকে কাঁদিয়ে মানুষ যদি সুখের খোঁজ করে তাহলে সেই সুখের শরীরে ঘুন লাগতে কতক্ষণ?
রাত এগারটার পরে লাইনের হোটেল থেকে ট্রাক ছাড়ল সাদাতের। বিল মেটানোর সময় টাকার তোড়াটা বেরিয়ে এসেছিল পকেট থেকে। পাশে দাঁড়ানো ছোকরাটা জীবনে যেন টাকা দেখেনি এমন চোখে দেখছিল। তার চাহনি ভালো লাগল না সাদাতের। কিছু চোখ থাকে যার ভাষা পড়া খুব সহজ। সাদাতের মনে হল টাকাগুলো এত বে-সাবধানীতে না রাখলে ভালো হত। ড্রাইভার রহমান তাকে সাবধান করে বলেছিল, সাদাতভাই, এত কাছাঢিলা হয়ো না। দিনকাল খারাপ। নিজেকে গুছিয়ে রাখতে শেখো। নাহলে পথেঘাটে ঠকবে।
ট্রাক দাঁড়িয়েছিল মেন রোডের ওপর। রহমান হর্ন বাজাচ্ছিল ঘনঘন। হোটেলওয়ালা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, সাদাতভাই, আবার আসবেন গো। খোদা হাফেজ। টাকা গুনতে গুনতে হাতটা কপালে ছোঁয়ালো সে। সাদাত বলল, খোদা হাফেজ। আল্লার মর্জি হলে আবার দেখা হবে বড়ো ভাই। ট্রাকের কাছে সাদাত পৌঁছাতেই রহমান মুখ বেজার করে বলল, বড়ো দেরি হয়ে গেল মালিক। ভাবছি রাতটা এখানে কাটিয়ে ভোর ভোর গাড়ি ছাড়লে কেমন হয়?
সাদাত সজোরে ঘাড় নেড়ে উঠল অনীহায়, ভোর ভোর গেলে পৌঁছাতে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। মানোয়ারা বেগম আমার জন্যি ভেবে ভেবে শুকিয়ে তেনা হয়ে যাবে।
-তুমার কথা ভেবেই কথাটা বলেছিলাম। রহমান অসন্তুষ্ট হল। আকাশে চুন ফুটকির মতো তারা ফুটেছে। অসময়ে একটা কালো মেঘ এসে ভিড় করেছে পুব কোণে। এ মেঘে বৃষ্টি হবে না তবু ভয় দেখাতে দোষ কোথায়। সাদাত বলল, মেঘ দেখে কি ভয় পেয়ে গেলে রহমান! কয়লা তো কদমা নয় যে জল লাগলে গলে যাবে।
–আমি সে কথা বলচি নে। রহমান দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাকাল, আমার চিন্তা অন্যখানে। তুমার কাছে হার্ড-ক্যাশ আছে। তুমি যে চাটাই বেচে ফিরচো একথা লাইনের সবাই জানে।
–জানবে না কেনে? সাদাত মাথা চুলকে বলল, অতো ভেবে লাভ নেই, ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। তুমি গাড়ি স্টার্ট করো। ইনশাআল্লা। খোদা আমাদের সাথে সাথে চলবেন। আমরা যে খোদার বান্দা।
বাম হাতে স্টিয়ারিং ধরে ডান হাতে সিগারেট ধরাল রহমান। ধোঁয়া ছেড়ে ভাবল মুসাফিরের বাছবিচার থাকতে নেই। যেখানে পানি সেখানে সবাই ওজু করে নেই। কার কোথায়, কখন এন্তেকাল কে জানে। তবু মনটা কু’গায় কেন সবসময়?
যে মেঘে বৃষ্টি হবার কথা নয়, সে মেঘে বৃষ্টি হল। রাস্তার ধারে লরি থামিয়ে গ্রেপলটা ভালো করে বিছিয়ে দিল রহমান। ফেরার সময় সাদাত কয়লা নিয়ে যায় ট্রাক ভরে। ওদিকে কয়লার চড়া দাম। আড়তখানায় সাপ্লাই দিলে লাভ নেহাত মন্দ হয় না। এ যেন এক ঢিলে দুই পাখি মারার সমান। খালি ট্রাক ফিরে গেলে তারই ক্ষতি। ট্রাকের ভাড়া তো দিতেই হত। অতএব ট্রাক ভরে নিয়ে যেতে দোষ কোথায়?
বৃষ্টি থামলেও রাস্তা ছিল পিছল। খুব সাবধানে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে ছিল রহমান। বৃষ্টির পরে শীতের কনকনানি বেড়েছে, হাওয়া বইছিল এলোমেলো। গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে সাদাত দূরের দিকে তাকাল। ফাঁকা রাস্তায় হেড লাইটের আলো পড়ে সাপের পিঠের চেয়েও চকচক করছে পিচ। সাদাত রহমানকে বলল, স্পিড তোল। ভয় কি আমি তো আছি।
বেশি দূর নয়, একটা বাঁক পেরতেই লরি থামাতে বাধ্য হল রহমান। সামান্য তন্দ্রামতন এসেছিল সাদাতের। গাড়ির ঝাঁকুনিতে সে দেখল রাস্তা জুড়ে পড়ে আছে একটা গাছের গুঁড়ি। কোনোভাবেই সেই গুঁড়ি পেরিয়ে সামনে যাওয়া সম্ভব নয়। ব্যাক-গিয়ারে গাড়ি কতদূর যেতে পারে।
সাদাত কপাল কুচকে বলল, গাড়ি থামাও।
রহমান গাড়ি থামানোর আগেই শুনতে পেল খিস্তি-খেউড়। শাবল হাতে এগিয়ে এল একজন ষণ্ডমার্কা লোক। এর আগে এই লাইনে মানুষটাকে কোনোদিন দেখেনি সাদাত। লোকটা এগিয়ে এসে শাবলটা মাথার উপর তুলে আঘাত করতে চাইল সাদাতকে। সাদাত সরে দাঁড়িয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, মারচো কেনে, কি চাও তুমরা?
