সুবর্ণা ভূষণীবুড়ির হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে এসে ধরে থাকলেন অনেকক্ষণ, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, তোমার সাথে যে আবার দেখা হবে ভাবিনি। দুনিয়াটা গোল। তাই দেখা হয়ে গেল
ভূষণীবুড়ির কথা বলার ক্ষমতা নেই। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। দুলাল কথা শোনার জন্য ওদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। রঘুনাথ তাকে ফিসফিসিয়ে কি যেন বলে হাঁ করে ওদের দু জনের দিকে তাকাল।
মানোয়ারাকে নিয়ে সাদাত লেবেল ক্রশিং গেট পেরিয়ে চলে গেল বটতলার দিকে। ওদের পেছন পেছন যাওয়ার কোনো ইচ্ছে হল না দুলুর। মানোয়ারা আজ তাকে যা দুঃখ দিল, সেই দুঃখের কথা সে কারোর কাছে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারবে না। মানুষ এত বদলে ফেলে নিজেকে? নিজেকে বদলে ফেলা সহজ নয়। অথচ মানোয়ারা দিব্যি তা পেরে গেল। সাদাতকে সে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে। না হলে সাদাতই বা কেন মুখে কুলুপ আঁটবে?
একই গায়ে ছোট থেকে মানুষ, অথচ কেউ কাউকে চিনল না–এই কষ্ট হাজার চেষ্টা করলেও মিলিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দেবগ্রামের মোড় থেকে কালীগঞ্জে যাবার বাস ধরবে ওরা। বাসেও দেখা হবে ওদের সঙ্গে।
রাগে ক্ষোভে মাথাটা ঝিনঝিন করছিল দুলুর। বাপের জন্য তার একটা পাউরুটি কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা। এই সামান্য কাজটাও ভারী ঠেকছে তার কাছে। একটা মেয়ে তার জীবনটাকে এভাবে জ্বালিয়ে দেবে, ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার করে দেবে সে ভাবতে পারছিল না।
নিজেকে শক্ত করার কোনো কৌশল দুলুর জানা নেই। যদি তা জানা থাকত তাহলে কঠিন বর্মের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলত সে। হাজার কষ্ট হলেও আর কখনো মানোয়ারার মুখের দিকে তাকাত না সে। কী আছে ওই হারিয়ে যাওয়া মুখে? হারিয়ে যাওয়া মনগুলো দুঃখের খনি, মুখগুলো দোজকের গুনাহ।
কদিন থেকে শরীরটা ভালো নেই দুলুর। শরীর ভালো না থাকলে ট্রেনের কামরায় গান গেয়ে বেড়ানো খুব ঝুঁকি হয়ে পড়ে। গেল রোববার রানিং-ট্রেনে উঠতে গিয়ে বাঁ হাতটা পিছলে যাচ্ছিল দুলুর। ভাগ্যিস পাশের হকারটা তাকে ধরে ফেলে না হলে সেদিনই তার শরীর ট্রেনের চাকায় পিষে গিয়ে অক্কা পেত। এই অন্যমনস্কতার পেছনে পরোক্ষভাবে মানোয়ারার হাত রয়েছে। ভুলব ভুলব করেও তাকে যে কিছুতেই ভুলতে পারছে না দুলু। ভোরবেলায় সাদাতের ট্রাক ছেড়ে গেল আসানসোলের দিকে। এখন চার-পাঁচ দিন গ্রাম ছাড়া হয়ে থাকবে সাদাত। চাটাই ব্যবসায় কাঁচা টাকার মুখ দেখা গেলেও বেশির ভাগ সময় থাকতে হয় ঘরছাড়া। মানোয়ারা মানিয়ে নিয়েছে এসব। পুরুষমানুষকে ঘরে আটকে রাখলে চলবে না। সংসারের উন্নতির জন্য টাকা চাই। তা ছাড়া মানোয়ারা এখন আর একা নেই। সাদাতের সন্তান তার গর্ভে বাড়ছে। আর ক’মাস পরে তারা দোকা থেকে হয়ে যাবে তিনজন। মানোয়ারার সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে তখন।
ভোরবেলায় চাটাইয়ের আড়ত অবধি এসেছিল মানোয়ারা। সাদাতের পাশে দাঁড়িয়ে সে বলল, সাবধানে যেওক্ষণ। টেইম মতন ধাবার হোটেলে খেয়ে নিও। তুমি না ফেরা পর্যন্ত আমার চোখে নিদ আসবে নি।
শাদীর পর থেকে রাতের ঘুম প্রায়ই চটকে যায় মানোয়ারার। সাদাতের কোনো সময় জ্ঞান নেই। ওর মন চাইলেই মানোয়ারাকে জাগিয়ে দিয়ে শরীরী খেলায় মেতে উঠবে। বাধা দিতে গিয়ে পলকা বাঁশের মতো ভেঙে পড়ে মানোয়ারা। এই আত্মসমর্পণের খেলায় এত যে আনন্দ লুকিয়ে থাকে আগে জানত না মানোয়ারা, এখন ভালো লাগার রেণুগুলো তাকে সুখী মানুষের মতো তিল তিল যত্ন নিয়ে সাজায়। সাদাত ঘরে না থাকলে সময় কাটতে চায় না মানোয়ারার। কতক্ষণ আর রেডিও শুনে সময় কাটাবে সে। পাড়া ঘোরার অভ্যাস নেই তার।
সাদাতের পথ চেয়ে পাঁচটা দিন দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়। শেষের দিনগুলো আর কাটতে চায় না মানোয়ারার। জামাই ঘরে না থাকলে মেয়ের টানে চাঁদ মহম্মদ দু-একবার দেখা দিয়ে যায় মানোয়ারাকে। কিন্তু এ ব্যাপারে মানোয়ারার কোনো হেলদোল নেই। বাপের উপর পুরো আগ্রহটা হারিয়ে ফেলেছে সে।
চাঁদ মহম্মদ অভাবী মানুষ। সাদাতের কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা সে বাগিয়ে নিয়েছে মানোয়ারাকে বাজী রেখে। এই খবরটা জানার পর মাথাটা গরম হয়ে আছে মানোয়ারার। বাপকে সে কথা শুনিয়েছে মনের ঝাল মেটাবার জন্য। সাদাতের টাকা তো এখন তার টাকা। এ টাকা নয়-ছয় করা যাবে না। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে সামলে রাখার জন্য টাকার যে কত প্রয়োজন সে এর আগে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। ঘর খরচের জন্য রোজ তাকে যেতে হত পাল কোম্পানীর আটা চাকিতে। দুলু তাকে হাতে তুলে যা দিত তাতেই তার সংসার চলত কোনোমতে। সেই সব কষ্টের দিন আজও মনে পড়ে তার। বাপের উপর রাগটা তাই সে আর চেপে রাখতে পারে না। ওই কুঁড়ে মানুষটাকে দেখলে তার মাথায় যেন বিছে কামড়ে দেয়।
ভোর ভোর সাদাতের ট্রাক মোকামপাড়ায় ঢুকে যাওয়ার কথা। দু-এক ঘণ্টা দেরি হলে অস্থির হয়ে ওঠে মানোয়ারা। সে ঘর-বার করতে থাকে। মনে কতরকমের চিন্তা এসে উদয় হয়। আসানসোল অনেক দূরের পথ। দুর্গাপুর পেরিয়ে আরও যেতে হয় অনেকটা।
সাদাতের মুখে গল্প শুনেছে সে ওদিকটার পুরো খনি এলাকা। প্রায়ই ধস নামে গ্রামে। খনির ভিতর আগুন জ্বলে ওঠে কখনও বা। কাঁচা কয়লার ধোঁয়ায় ভরে থাকে আকাশ। জায়গাটা রুক্ষ্ম হলেও প্রাণের স্পন্দন আছে সেখানে।
