দুলু বাঁ হাত দিয়ে চোখের কোণ মুখে নিল। এই স্যাকরা দোকান থেকে সে মানোয়ারাকে রূপোর হারছড়া কিনে দিয়েছিল। সেদিন খুশির ঈদের চাঁদের মতো জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছিল মানোয়ারার হাসি দুলু সেই হাসিতে যোগ দিয়ে বলেছিল, তুমার হাসিটার দামই লাখ টাকা। আল্লাতালা হাসি বিলোবার জন্যি তুমাকে পেঠিয়েছে।
গালে টোল পড়লে মানোয়ারা বেহেস্তের ফরিস্তা। দুলু তখন ওর মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। গলা কাঁপে আবেগ জ্বরে, তুমার জন্যি আমার এই জান বাজি রইল। কবে মরে যেতাম গো যদি না তুমি আমার পাশে থাকতে।
মানোয়ারা আহ্লাদী হয়ে উঠত কথা শুনে, স্ফুরিত অধর নাচিয়ে বলত, আমার জন্ম হয়েছে শুধু তুমার দেখভাল করার জন্যি। তুমি আমার আকাশ গো। তুমার ছায়া থিকে আমাকে খেদিয়ে দিও না কুনোদিন।
মানোয়ারাকে তাড়িয়ে দেয়নি দুলু, মানোয়ারাই চলে গেছে স্বেচ্ছায়। বড়োগাছে হাঁড়ি বেঁধেছে সে। রসে ভরে উঠছে তার ঠিলি। নুরি বেগমের বহুগামিতা স্বভাবটা কী করে যেন ঢুকে গিয়েছে মানোয়ারার ভেতর। শুধু রূপভাঙিয়ে শরীর দেখিয়ে দিন চলছে তার। চাঁদ মহম্মদের ঘরে মানোয়ারা এখন আর আসে না। কেন আসবে? দেখা হলে চাঁদ মহম্মদ টাকা চায়। সাদাতের কাছে মেয়েকে এক প্রকার বিক্রি করে দিয়েছে সে।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এক গোছা টাকা দিয়ে সোনার দোকান থেকে বেরিয়ে এল মানোয়ারা। রূপোর হার খুলে সোনার হারটা পরে নিয়েছে সে। গায়ের রঙের সাথে মিশে গেছে সোনা। দুল তখনও হাল ছেড়ে দেয়নি। রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে মানোয়ারার দিকে। চোখে চোখ পড়লে যদি হেসে ওঠে মানোয়ারা।
চোখে চোখ পড়ল কিন্তু হাসল না মানোয়ারা। বাসি মেটের মতো ঠোঁটের রঙ করে সে কটমটিয়ে তাকাল। ঘাবড়ে যাওয়া দুলু এই মানোয়ারাকে চিনতে পারে না। কত দ্রুত মানুষ বদলে যেতে পারে। এর ব্যাখ্যা তার জানা নেই। মানোয়ারা এখন সমস্ত ব্যাখ্যার উর্ধ্বে।
সাদাতের সঙ্গে হাজারদুয়ারী দেখতে গিয়েছিল সে লালগোলা ট্রেনে চেপে। ফেরার সময় বেলডাঙার কাছে মানোয়ারা আর সাদাতের সঙ্গে দেখা হল দুলুর। দুলুর হাতে তখন গুপিযন্ত্র, পায়ে বাঁধা ঘুঙুর তোড়া। দুলু গলা কাঁপিয়ে গাইছিল : পীরিতি চাল কুমড়োর বিচি/ও নারী কাদিস মিচিমিচি। ডালের বড়ি ঝোলে দিলে গলে গলে পড়ে। সে বড়ির সুয়াদ ভালো, রাতে খাটিয়া নড়ে। গানটার শেষের দিকের কথাগুলো কানে যেতে লজ্জা পায় মানোয়ারা। সাদাত ঠোঁট টিপে টিপে হাসে। যাত্রী চেঁচিয়ে বলে, ও ভাই, রসের গান আর এট্টা হোক। দুলুর উৎসাহে ভাটা পড়ে না, সে গায়; বনের মধ্যে সিংহ রাজা, বনের বাইরে আমি/যতই খাও বাইরে বাতাস, আমিই তুমার স্বামী। গান শেষ হল, পয়সাও পেল দুলু। কিন্তু যার জন্য গান গাওয়া, সে মুখ ফুটিয়ে টুঁ শব্দটিও করল না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তার। মানোয়ারা তবু প্রতিক্রিয়াহীন। হাঁ করে সে চেয়ে আছে বাইরের দিকে। ট্রেন চলছে শেয়ালদামুখো কু ঝিকঝিক।
সেদিন ট্রেন থেকে নেমে দেবগ্রামে দুলু দেখতে পেয়েছিল ভূষণীবুড়িকে। জ্বরে ভুগে কাঠি হয়ে গিয়েছে তার দেহ। কথা বলার ক্ষমতা নেই, শুধু চিঁ-চিঁ শব্দ। কিছুটা এগিয়ে যেতেই দুলাল এগিয়ে এল তার সামনে। তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল রঘু। সে সামনে এসে বলল, যাক, দুলালকাকা ফাড়া কেটে গেল। ঠিক সময়ে এসেছিল দুলাল, না হলে মাকে ফিরিয়ে আনা তারপক্ষে সম্ভব হত না।
রঘুনাথকে এ ব্যাপারে সাবাশ দেয় দুলাল। কাঁধের উপর হাত রেখে বলল, যা কামিয়ে এনেছিলাম সালার থেকে তা সব চলে গেল।
-মা বেঁচে থাকলে অমন টাকা ঢের হবে। রঘুনাথ জোর গলায় বলল, মায়ের মতন সম্পত্তি আর আছে নাকি গো? ও পয়সা-কড়ি নিয়ে খামোখা ভেবো না। দুলাল চুপ করে কথা শুনছিল রঘুনাথের। শুধু লম্বায় বাড়েনি ছেলেটা, তার মগজও বেড়েছে শরীর বাড়ার সাথে সাথে।
কৃষ্ণনগর স্টেশনে সুবর্ণার সঙ্গে দুলালের যে দেখা হবে তা সে নিজেও জানত না। প্যান্ট-শার্ট পরা একজন এসে তাকে বলল, এ ভাই, তোমাকে ওই ভদ্রমহিলা ডাকছেন।
চোখ ঘোরাতেই ধাক্কা খেয়েছিল দুলাল। সুবর্ণা স্টেশনের শেডের নীচে দাঁড়িয়েছিলেন লোক্যাল ট্রেন ধরার জন্য। দুলালের দিকে এগিয়ে এলেন তিনি, কি ব্যাপার তুমি এখানে?
-মা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, আজ তাকে ঘর লিয়ে যাচ্চি।
–কই তোমার মা? সুবর্ণা চঞ্চল হয়ে উঠলেন চোখের পলকে।
ভূষণীবুড়ি সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসেছিল। বসে থাকারও ক্ষমতা ছিল না তার। দুর্বলতায় চোখ ঢুকে গিয়েছে কোটরে। হনুহাড় জাগানো মুখ। বয়স শুধু যৌবন খায় না, আয়ুও খায়। তার প্রমাণ এখন সে।
ভূষণীবুড়িকে চিনতে সুবর্ণার প্রথমে কষ্ট হয়। সেই সুশ্রী মুখটাকে তিনি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ান। সময়ের পলি জমেছে ভূষণীর চোখে মুখে। সে এখন আর শুধু মহিলা নেই, বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছে।
সুবর্ণা তার পাশে গিয়ে ফাঁকা জায়গাটায় বসল, আঙুল দিয়ে ঠেলা মেরে বলল, আমাকে চিনতে পারছো?
চোখ রগড়ে অনেকক্ষণ ধরে সুবর্ণাকে দেখল ভূষণী, শেষে চিনতে না পেরে আফসোসের সঙ্গে বলল, কে বটে গো তুমি?
-মাঠবাবুকে মনে আছে তোমার? সুবর্ণা ধার ছুরি ছুঁড়ে দেওয়ার মতো প্রশ্ন করল। চোখ রগড়ে নিয়ে ঘোলাটে চোখে তাকাল ভূষণীবুড়ি, ফোকলা মাড়ি দেখিয়ে হাসতে গিয়ে সহসা গম্ভীর হয়ে গেল সে, এখুন আর চোখে ভালো দেখতে পাই না। চারদিক ঝাপসা হয়ে আসছে। ওপরওলা ইবার দয়া করলে বাঁচি গো!
