ভূষণীবুড়ির অসুখের খবর শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল গুয়ারামের, বয়স হলে মানুষের আর রোগজ্বালা ছাড়তে চায় না। দুলাল এয়েচে এদদিন পরে, মাকে ঘরে না দেখলে তার মনটা কি হবে বলো তো?
-সে তো বুঝচি কিন্তু? দুর্গামণি কিছু বলতে গিয়ে থামল।
গুয়ারাম তাড়া লাগিয়ে বলল, থামলে যে, কি বলছিলে বলো?
-দুলালের মায়ের মনে হয় কঠিন অসুখ হয়েচে। দুর্গামণি আমতা আমতা করে বলল, জ্বর সেই কবে থিকে হয়েছে, আর ছাড়ছে না। রঘু বলল, দরকার হলে কেসনগর লিয়ে যাবে। গোস্বামীপাড়ার কপোবাবু চাঁদা উঠিয়েচে।
–তাহলে তো আমার সিখানে একবার যাওয়া দরকার।
দুর্গামণি তাকে বাধা দিয়ে বলল, যা করার রঘুই করবে, তুমার আর গিয়ে কাজ নেই। ডাল-ভাত বেঁধে দিচ্ছি, খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ো।
আলুমাখা, কলাইডাল আর বড়িভাজা করেছে দুর্গামণি।কাঁচা সরষে তেলের গন্ধটা জড়িয়ে গেছে গরম ভাতে। ঘরে লঙ্কা ছিল না, দুর্গামণি ডিবরি নিয়ে গিয়ে বেড়ার ধারের গাছটা থেকে লঙ্কা তুলে নিয়ে এল। কাঁচা লঙ্কা চটকে গরম ভাত খাওয়ার অভ্যাস গুয়ারামের দীর্ঘদিনের। ভাতের সঙ্গে বিরিডাল জড়িয়ে গেলে স্বপ্নের এক সুষমখাদ্য তৈরি হয়। দুর্গামণি আগে থেকে সব যেন জানত, তাই ব্যবস্থা করে রেখেছিল আগাম।
খাওয়ার পরে বাপ আর ছেলে মুখোমুখি বসে বিড়ি ফুঁকল তারিয়ে-তারিয়ে। বিড়ির সুতোর কাছে আগুন আসতেই হাই তুলে চুনারাম বলল, নিদ লাগচে, ইবার আমি শুয়ে পড়ব।
গুয়ারাম বলল, তুমি দোক্তা খেতে ভালোবাসো, তুমার জন্যি দোক্তাগুণ্ডি এনেচি-লিবা না?
চুনারাম হাসল, রেখে দে, কাল সকালে নিব।
শীত হাওয়ায় অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল চুনারামের। ফিসফিস কথাগুলো কানে ভেসে এল বুড়ার। দুর্গামণি খিলখিল করে হাসছে। গুয়ারাম টিয়াপাখির মতো কি যেন বলছে বউটার বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে। ডিবরির আলো এসে পড়েছে মাটির দাওয়ায়। দুর্গামণি অনেকক্ষণ পরে মুখের ঘাম মুছে বলল, এবার শীত লাগচে, কপাটটা ভেজিয়ে দাও।
গুয়ারাম আবার হুমড়ে পড়ল দুর্গামণির খোলা বুকে, থুতনি ঠুসে ধরে বলল, আমার কাছে জাড় খেদাবার মেসিন আছে।
-সে আমি জানি। আর বাহাদুরী করো না। এবার ঘুমোও। দুর্গামণির সতর্ক কথায় জেদ বেড়ে গেল গুয়ারামের, দু-হাত বাড়িয়ে দুর্গামণিকে বুকের কাছে টেনে এনে বলল, জাড়ের দিন শেষ হল বলে, ইবার তুর-আমার দিন শুরু হবে।
কথার ওমে বয়স বাড়ে রাতের।
.
২৫.
লাইন থেকে ফিরে এলে দুলুর শরীর আর চলতে চায় না। পা দুটো ভারী হয়ে থাকে সব সময়। চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তখন কথা বলার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে যায়। মনে হয় মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেই বুঝি ভালো হত।
বাস স্ট্যান্ডে নেমে সরাসরি বাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল দুলু। স্যাকরা দোকানে মানোয়ারাকে দেখতে পেয়ে তার যে কী হল সে যেন হাঁটাচলার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলল। বুকের গভীর থেকে কুয়োর জল চুয়ানোর মতো চুয়াতে লাগল দুঃখ।
এখন মানোয়ারাকে দেখলে তার পুরো দুনিয়াটা ফাঁকা লাগে। কোনো মতে হিসাব মেলে না কেন এমন হল তার জীবনে। এ পাড়ায় সাদাত আছে বহুদিন, অথচ কোনোদিন মানোয়ারা তার দিকে তাকায়নি। হাত কাটার পর তার যে কী হল সেই জটিল হিসাবটা মেলাতে পারছে না দুলু। বারবার ভার হয়ে আসে চোখ, টলটল করে জল।
বাজারের দিকে এগোতে গিয়ে আর এগোতে পারে না দুলু। কাপড় দোকানের পাশ থেকে সে দেখতে থাকে মানোয়ারার হাবভাব। সাদাত তাকে মনের মতো করে রেখেছে। মোকামপাড়ায় সাদাতের চাটাইয়ের ব্যবসা। প্রায় জনাকুড়ি মানুষ তার হয়ে চাটাই বানায় রোজ। বাঁশ-বাখারি সব সাদাতের। মানুষগুলো শুধু বুনে দিয়ে খালাস।
লরি ভর্তি হয়ে চাটাই যায় রানীগঞ্জ, আসানসোল, দুর্গাপুর, চিত্তরঞ্জন। ওদিকে বাঁশষ্ঠাচারির চাহিদা প্রচুর। মহাজনরা চাটাই কিনে খনি-অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়। এ ব্যবসায় ধার-বকি নেই, প্রথম থেকে নগদা-নগদি কারবার। ট্রাক বোঝাই চাটাই নিয়ে গেলে পকেট বোঝাই টাকা আনে সাদাত। এভাবেই প্রায় সাত বছর ধরে তার ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে। মোটা টাকা ব্যাঙ্ক আর পোষ্টাপিসে সুদে বাড়ছে তার।
দুলু দূর থেকে দেখল মানোয়ারা সোনা দোকানে বসে আছে দেবী হয়ে। বিয়ের পরে ওর রূপ যেন ফেটে বেরচ্ছে। যৌবনপ্রভা রাধাচূড়া ফুলের চেয়েও উজ্জ্বল। তাকালে আর চোখ ফেরাতে পারে না দুলু। মানোয়ারাকে মনে হয় স্বপ্নদেশের রাজকন্যা। এই মেয়ের সঙ্গে একসময় তার জানাশোনা ছিল একথা এখন আর মানতে চায় না মানোয়ারা। তার ঠোঁটের হাসি সোনার হারের উপর গড়িয়ে পড়ে আরও উজ্জ্বল দেখায়। মানোয়ারার জন্য চা এনেছে দোকানদার। গোল বিস্কুটে কামড় দিয়ে মানোয়ারা দেবীর হাসি হাসছে। সে যত হাসছে তত বুক ভেঙে যাচ্ছে দুলুর। মনের ভেতর ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে হঠাৎ উদয় হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের মতো।
দুলু ভাবছিল অন্য কোনো ছেলে হলে মানোয়ারাকে খুন করে দিত। নিদেনপক্ষে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারত তার গালে। কুৎসিৎ করে দিত সুন্দর মুখের ভুগোল।
দুলু পারেনি। এই না পারাটা তার অক্ষমতা। দুর্বলতা। মানোয়ারাকে সে ইচ্ছে করেই জিতিয়ে দিয়েছে। প্রেমে জোর খাটেনা। প্রেম সেই আজব লেবু যা কচলালে তেতো হয়ে যায়।
