-মা, আপনার কি শরীল খারাপ করচে? বাবুরে কি খপর পাঠাব? ও মা, কথা বলুন গো। আমার ভেষণ ভয় করছে। দুলালের আকুলতায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন সুবর্ণা। অস্ফুটে বললেন, বাবা দুলাল, আমি তোমার মা হই গো, তোমার এই মাকে মনে না থাকারই কথা। তুমি তখন ছোট, আমি তোমাকে দেখতে গিয়েচিলাম হলদিপোঁতায়। সেদিনের কথা তোমার মনে থাকার নয়, তবে বাবা তোমার আসল মায়ের এসব কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। সে আমার সতীন, তবু তার জন্য আমার মন বড়ো কাঁদে। আমরা কেউ-ই মানুষটাকে পেলাম না! শুধু কামড়াকামড়ি করে মরলাম। আজ শেষবেলায় এসে বুঝতে পারছি–যৌবন সব নয়, যৌবনের ওপরে বুঝি সম্পর্ক।
ইন্দুকে দুলাল কথাগুলো বলতেই মুখ শুকিয়ে গেল ওর। অনেক ভেবে বলল, আত্মীয়ঘরে খাটবা, তুমার লাজ লাগবে না? তাছাড়া ওরাও তো তুমার কাছে কুঁকড়ে থাকবে। এভাবে কি কাজ হবে গো? লোক জানাজানি হওয়ার আগে আমাদের এ গা ছেড়ে চলে যাওয়া দরকার।
–মেয়েমানুষটা বড়ো ভালো গো! দুলালের চোখে থৈ-থৈ করে শ্রদ্ধা।
–সে তো সব বুঝলাম। কিন্তু ইন্দুবালার মন সায় দিচ্ছিল না।
দুলাল বলল, তুমার মন না চাইলে আমি ইখানে ভাগাড়ের শকুনের মতো পড়ে রইবোনি। দু’জনা একসাথে এসেছি, যিখানে যাবো একসাথে যাবো। সারারাত ঘুমাতে পারেনি দুলাল। প্রথম মোরগ ডাকার আগে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল সে। ইন্দুবালাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, চলো গো, আর দেরি করা যাবে না। যা আচে-তল্পিতল্পা সব বেনধে নাও। এখানে সুখের ভাত গলায় কাঁটার মতন বিধবে। চলো, সময় থাকতে পালাই…।
বাঁকের দু-দিকে পুরো সংসার। দুলাল আগে, ইন্দুবালা তার পিছু পিছু হাঁটে। একসময় হাঁপিয়ে উঠে বাঁকটা নামায় দুলাল, ঘষটে যাওয়া কাঁধ রগড়ে নিয়ে বলল, সম্পর্ক হলে গিয়ে এমন লতা যারা কুনো মরণ নাই গো! কত সম্পর্ক মরে যায়, সেগুলো কি ঠিক মরে গো?
দুলালের চোখে সংসারের আলো চিকুর কেটে গেল।
গুয়ারাম পোড়া বিড়িটা ফাঁকা ধানমাঠে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, কী রে দুলাল, নেতিয়ে গেলি যে, তুর পা বুঝি আর চলচে না।
দুলাল থতমত খেয়ে তাকাল, তার চোখে তখনও তার দ্বিতীয় মায়ের ছবি শচীমাতার মতো পুত্ৰবিরহে আকুল হয়ে কাঁদছে। কে তাকে সান্ত্বনা দেবে? দুলালের এত মনের জোর কোথায়? সে তার বাপের মতো বরাবরই আবেগী। অন্যমন সহজে তার মন ছুঁয়ে যায়। এ-ও এক জীবনজোড়া রোগ। এ রোগ যার ভিতরে রয়েছে তার আর বাঁচা নেই।
ফেরিঘাটে এসে নৌকোর উপর বাঁক নামাল দুলাল। আসার সময় মায়ের পা ছুঁয়ে এলে মনের ভারটা নির্ঘাৎ কমত। তা যখন হয়নি তখন তাকে স্মরণ করে একবার অনন্ত প্রণাম করা দরকার।
দুলাল নৌকা থেকে বড়ো গঙ্গার বুকে হাত রাখল। এমনি একটা আনন্দঘন শিরশিরে ভাব উঠে এল তার শরীরে। এত বছর আগের কথা স্পষ্ট তার মনে পড়ে না। তবে ভূষণীবুড়ির মুখে বারবার শুনেছে মাঠবাবুর নামটা। ওই নামটা আউড়ানোর সময় ভূষণীবুড়ি নিমেষে হয়ে যেত মানিকডিহির বড়ো গাঙ। হাজারবার নীলকণ্ঠবাবুর কথা বললেও ভূষণীবুড়ি একবারও সুবর্ণার কথা বলেনি। তবে কি মায়ের কোনো গোপন রাগ আছে তার উপর?
রাগের কথা মাঠও জানে না, আকাশও জানে না।
নৌকো দুলে ওঠে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ জল-সোহাগের শব্দে। এই শব্দ যেন জাগিয়ে তোলে নীলকণ্ঠবাবুর হাসি। সাহেবমাঠে মাঠবাবু মাজা সোজা করে হেঁটে যাচ্ছেন। জমিতে তার সচলছায়া। সেই ছায়ার ভেতর দুলাল খুঁজতে থাকে নিজেকে।
গত পাঁচমাসে শুধু বুড়িগাঙের জলছাড়া আর সবকিছু যেন বদলে গিয়েছে গুয়ারামের চোখে। সাহেব মাঠের আখগাছগুলো হিলহিল করে নড়ছে, এ বছর আখের চাষ এত বেশি যে টাইম মতো আখ পৌঁছানোর শিপ পাচ্ছে না চাষীরা। গুয়ারামের সব চাইতে ভালো লাগে অশ্বত্থতলায় দাঁড়ালে। খোলা হাওয়ায় অশ্বত্থের ঢ্যাঙ্গা পাতা কোমর দুলিয়ে নাচছে।
ঘরে ফেরার আনন্দটা কাউকে বুঝি বলে বোঝানো যায় না। ঘরের মানুষটাকে দেখার পর মুখভার করে আছে দুর্গামণি। সে তার খুশিটাকে জিইয়ে রেখেছে বুকের ভেতর। চুনারাম তখন থেকেই ফটর ফটর করছে। ওর যেন কথার শেষ নেই। পুরো পাঁচমাসের জমানো কথা একেবারে উগরে দিয়ে নিস্তের পেতে চায়।
দুর্গামণি অনেকক্ষণ পরে লাল চা নিয়ে এল কাচের গ্লাসে, নাও, খেয়ে নাও। চা খেলে গা-হাত-পায়ের বিদনা কমবে।
গুয়ারাম দীর্ঘসময় ধরে বউয়ের দিকে তাকাল, পুরনো বউ তবু মনে হল এই সবে দুর্গামণি বউ হয়ে ঘরে এল। চোখের পাতা জুড়ে গুনগুনিয়ে উঠল ভ্রমর। দুর্গামণি লজ্জা পেল কেননা সে এই চাহনির অর্থ বোঝে। আজ সারারাত মানুষটা তাকে ঘুমোতে দেবে না। এই ভাবনায় সুখের পানসিটা দাঁড় বেয়ে চলে গেল বহু দুরে। দুর্গামণির সারা গা শিরশিরিয়ে উঠল, বুক দুটো যেন কুঁকড়ে কুঁচকে শামুকের মতো লুকাতে চাইল নিজেকে। ভেতরের এই বাঁধ ভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস দুর্গামণি কারোর কাছে প্রকাশ করবে না। এমনিতে তার চাপা স্বভাব। গুয়ারামের তালে তাল মিলিয়ে সে চলতে পারে না।
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বেশ জোরে রসনাতৃপ্তির শব্দ করল গুয়ারাম, তারপর মুখ তুলে মুগ্ধ গলায় শুধোল, ছেলেটা কুথায়, তারে তো দেখচি নে?
-সে কি ঘরে থাকার ছেলে? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল দুর্গামণি, ভূষণীবুড়ির জ্বর যে ছাড়ছে না, তারে লিয়ে হাসপাতালে গিয়েছে।
