দুলালের বিচার-বুদ্ধি মন্দ নয়। মন্দ না হবারই কথা। দুলাল যে নীলকণ্ঠবাবুর ছেলে একথা কারোর জানতে আজ আর বাকি নেই। তার যে বিচার-বুদ্ধি নজরকাড়া, হৃদয়স্পর্শী হবে এ নিয়ে কারোর কোনো দ্বিমত নেই। এবার চাষের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বৃষ্টি। দুলাল দলের প্রত্যেককে বুঝিয়ে বলেছে, বাবুদের খুশি করা হলো আমাদের কাজ। একাজ তো একদিনের নয়, বাবুদের মন জুগিয়ে চললে একাজ আমরা ফি-বছর পেয়ে যাবো। একটা কথা মনে রেখো-মানুষ থাকে না কিন্তু মানুষের কাজটা থেকে যায় বছরের পর বছর। ফলে তোমাদের উপর হলদিপোঁতা ধাওড়ার সুনাম নির্ভর করছে।
ইন্দুবালার সঙ্গে পুকুয়াড়িতে কুঁড়ে বেঁধে ছিল দুলাল। রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে দিনের আলো ফুটলে চলে যেতে হোত খেতে। মাটি কাজে শরীর মাটি না হলে সোনার ফসল ফলে না।
সত্যসাধনবাবুর ঘরদোর বেশ ছিমছাম এবং গোছানো। এ বাড়ির গিন্নি যে লক্ষ্মীময়ী এ ব্যাপারে কারোর মনে কোন দ্বিধা বা জড়তা নেই। মুনিষদের সঙ্গেও গৃহকর্ত্রীর যোগাযোগ ছিল সব সময়। অন্য জেলা থেকে খাটতে আসা মানুষগুলোর উপর তার টান কিছু মাত্রায় কম ছিল না। প্রায়ই ইন্দুকে ডেকে এটা-সেটা বাড়তি অনেক কিছু ধরিয়ে দিতেন তিনি। নিকট-আত্মীয়ের মতো বলতেন, কিছু দরকার হলে চেয়ে নিও। আমি সব দিন হয়ত খোঁজ নেওয়ার সময় পাব না, তুমি প্রতিদিন এসে তোমাদের ভালো-মন্দ শুনিয়ে যেও।
গরীবদের উপর যার এত টান তার উপর শ্রদ্ধা যে প্রগাঢ় হবে এই তো জানা কথা। একদিন বিকেলবেলায় ঝমঝমিয়ে শুরু হল বৃষ্টি। সত্যসাধনবাবু তখন ঘরে নেই ব্যবসার কাজে গিয়েছেন সালার বাজারে। কালো রঙের মোটর সাইকেলটা তার নিত্যসঙ্গী।
এমন সময় গৃহকর্ত্রী ডেকে পাঠালেন দুলালকে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারলেন তিনি। এ কী দেখছেন অবেলায়? মাঠবাবুর জলজ্যান্ত ছবিটা যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এ কী চোখের ভুল না কি আলেয়া ধাঁধা? তবু সাহস করে সেই প্রবীণা শুধোলেন, কী নাম গো তোমার?
–আজ্ঞে মা, আমার নাম শ্রী দুলাল চন্দ্র রাজোয়ার।
–কোথায় বাড়ি?
দুলাল নিঃসংকোচে বলল, হলদিপোঁতা ধাওড়ার নাম শুনেছেন, সেখানে। ইটা কালীগঞ্জ থানার মধ্যে।
প্রবীণার চোখের পাতা পড়তে চায় না। শরীর কাঁপছে ঝনঝনিয়ে। ঈশ্বরের কী অপূর্ব লীলা বোঝ দায়। ত্রিশ বছর আগের ঘটনা হুবহু দেখতে পান সুবর্ণা। তখন নীলকণ্ঠবাবুর কণ্ঠলগ্ন ছিলেন তিনি। সুন্দরী হিসাবে মাটিতে পা পড়ত না তার। আর নীলকণ্ঠবাবুও তাকে ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্য বাইরে গিয়ে শান্তি পেতেন না।
সাহেব মাঠে ভূষণীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল নীলকণ্ঠবাবুর। ভূষণী সেদিন থেকে তার নিজের মেঠো-রূপটাকে নীলকণ্ঠবাবুর চোখের ভেতর প্রেম-সোহাগে যত্ন নিয়ে এঁকে দেয়। ছবি আঁকা শেষ হলে ভূষণীর জোয়ার আসা বুকে ঢেউ ভাঙে প্রেমকাতর নীলকণ্ঠবাবু। দয়াল তাকে যা দেয়নি, সেই অমৃতসুখ তার শরীরে রোপণ করে দিলেন নীলকণ্ঠবাবু।
সুবর্ণার এখন পড়ন্ত বেলা। তবু পশ্চিমের রোদ্দুর তাকে উদ্ভাসিত করে তোলে আজও। অস্তমিত যৌবনের অন্তিমচ্ছটা তাকে আলোকিত করে কখনো-সখনো। এখন তার কণ্ঠস্বরে সেই উন্মাদনা নেই, ঢিলেঢালা শরীরে বার্ধক্যের শেকড় ঢুকে গিয়েছে। স্থিতু হওয়া মনটা এখন পিছন ফিরে তাকায় বারবার।
সত্যসাধনবাবুকে তখন ব্যবসার কাজে প্রায় যেতে হত কৃষ্ণনগরে। সুবর্ণার দাদাদের সঙ্গে ছিল তার ব্যবসায়িক আত্মীয়তা। বাজার থেকে সম্পর্কটা একদিন ঘরে এসে নোঙর করল।
কথায় কথায় সুবর্ণা জানতে পারলেন প্রায় দু-বছর অতিক্রান্ত হয়েছে সত্যসাধনবাবুর পত্নীবিয়োগ। প্রসবের সময় চিকিৎসা বিভ্রাটের জন্য স্ত্রী এবং তার পেটের সন্তানকে হারালেন সত্যসাধনবাবু। চলতি ব্যবসা মাথায় উঠল শোকে। সেই শোক কাটাতে দু’বছর কোথা দিয়ে যে পালিয়ে গেল! সত্যসাধনবাবুকে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল সুবর্ণার। তার পুরুষালী চেহারার মাদকীয় আকর্ষণ পুরুষ্টো সেগুনকাঠের চেয়েও আভিজাত্যময়। নীলকণ্ঠবাবু তখনও ফেরার, তিনি যে আর ফিরবেন না এ বিষয়ে একরকম নিশ্চিত ছিল সুবর্ণা।
দাদাদের অনুমতি নিয়ে তাদের ভাঙা জীবন আবার বিয়ের পিঁড়িতে পূর্ণতার আস্বাদন পেল। বিগত বত্রিশ বছর সালারের এই বাড়িটাতে আগলে কিসের মোহে পড়ে আছেন তিনি। সত্যসাধনবাবু তার কোন সুখের অভাব রাখেননি, শুধু সন্তানসুখ ছাড়া আর সব কিছু কানায় কানায় ভরিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখন সুবর্ণা বয়স্কাদের দলে। তবু তার মনটা সেই প্রথম যৌবনের কথা ভেবে প্রায়ই কঁকিয়ে ওঠে।
সময় চলে যায় কিন্তু স্মৃতি কেন পিছু ছাড়ে না! নীলকণ্ঠবাবুকে আজও, এই বয়সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পান তিনি। ভূষণীর সঙ্গে তার শুধু একবার মাত্র দেখা হয়েছিল। সেদিনের সেই ভূষণীর মুখটা এখনও কি দেখতে পাচ্ছেন তিনি? সুবর্ণার চোখের তারা কেঁপে উঠল। চোখের উঠোন জলবাহী মেঘের হঠাৎ বৃষ্টিতে স্নাত হলো যেন।
দুলালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন তিনি। তার মাথা টলছে, হারিয়ে যাচ্ছে পায়ের জোর। আর একটু হলে গোড়াকাটা গাছের মতো লুটিয়ে পড়তেন তিনি, দুলাল গিয়ে তাকে দু-হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল।
