থানা-চত্বরে তিনটে লাশ পৌঁছাতেই ওয়ারলেশে খবরটা ছড়িয়ে গেল চতুদির্কে। এস.পি. এলেন কৃষ্ণনগর থেকে সেই রাতে, সঙ্গে বিশাল পুলিশ বাহিনী। একটা আতঙ্কের পরিবেশ চারদিক জুড়ে।
গুজবের হাজার ডানা।
বাজারে রাষ্ট্র হল মন্ত্রী আসছেন কলকাতা থেকে। খবরটা শোনার পর শিবনাথবাবুর মনের অবস্থা ভালো নেই। একটা ভয় তার ভেতরে কুয়াশার মতো জমতে শুরু করেছে। সেই ভয়ের কথা তিনি মুখফুটিয়ে কাউকে বলতে পারেন না, ভয়টা মাথার ভেতর ঘুঘরো পোকার মতো ঘুরছে। চোখ বুজলেই বিদুর আর কপোতাক্ষবাবুর মুখটা ভেসে উঠছে। ওরা রাহু-কেতুর মতো তার মনের অনেকটা জায়গা জুড়ে বসে আছে। যদি কোনো বিপদ আসে এদের কাছ থেকেই আসবে। এখন তার মনে হয় অমলকান্তিবাবুকে জেলে পাঠিয়ে তার কোনো ভালো হয়নি, বরং মৃত্যুভয় সর্বদা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কে বলতে পারে দারোগাবাবুর মৃত্যুর পিছনে অমলকান্তিবাবুর কোনো হাত নেই।
এই গ্রামকে তিনি কি আগে চিনতেন? ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠলেন শিবনাথবাবু। গলা শুকিয়ে এল তার। হাওয়া বদলের গন্ধটা তিনি টের পাচ্ছেন। এই গ্রামে যদি তাকে টিকে থাকতে হয় তাহলে তার হাবভাব স্বভাব এমন কী কথা বলার ধরন তাকে পাল্টাতে হবে। নাহলে সমূহ বিপদ।
তিনটে ফুলের মালা অসময়ে জোগাড় করতে হিমসিম খেয়ে গেলেন শিবনাথবাবু। বড়োবাবু তার নিকট আত্মীয়র মতো ছিলেন। দায়ে-অদায়ে তার কাছে ছুটে গেলে তিনি খালি হাতে ফেরাতেন না। বড়োবাবুর দাপটের জোরে আজ শিবনাথ বাবুর এত রমরমা।
মন্ত্রী আসার খবরটা চাউর হয়ে গিয়েছে পুরো গ্রামে। থানার মাঠে ঢল নেমেছে মানুষের, ঠিক যেন চড়কমেলার অবস্থা। সবুজ আর শুভর হাসপাতালে মন ধরল না। অবনীর সঙ্গে ওরাও চলেছে মন্ত্রী দেখতে।
মাধুরী হাসপাতালের গেটের কাছে বলল, তোরা ছেলে। তোরা কত স্বাধীন। বাবা আমাকে যেতেই দিল না। যা রাগ হচ্ছে না বাবার উপর।
শুভ মন খারাপ করে বলল, মন্ত্রী তো রাস্তা দিয়ে যাবে, তখন তুই দেখে নিবি। আমরা ভাষণ শুনে আসব। এসে তোকে সব বলব।
মাধুরী মিষ্টি করে হাসল, সেই ভালো। তোরা তাড়াতাড়ি যা। না হলে দাঁড়াবার জায়গা পাবি না।
সবুজ কষ্ট পাওয়া থেকে বলল, বড় দারোগার ছেলেটা আমাদের ক্লাসে পড়ে। ভাব তো ওর আজ কী হচ্ছে। এ সময় ওর পাশে আমাদের দাঁড়ানো দরকার।
সবুজ ঘাড় নাড়ল। মাধুরী বলল, বিপদের দিনে কেউ পাশে দাঁড়ালে বিপদ অনেকটা হালকা হয়ে যায়। তবে এ তো তুলোচাপা বিপদ নয়, এ হলো পাথরচাপা বিপদ।
-মানুষ নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনে। সবুজ বিজ্ঞের গলায় বলল, বাজারের লোকে বলে বড়োবাবুর মেজাজ ভালো ছিল না। সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। খারাপ মানুষরা বেশি দিন বাঁচে না, তাই না?
কোনো উত্তর না দিয়ে মাধুরী ঘাসের দিকে তাকাল।
.
সালার থেকে নতুনগ্রাম পৌঁছাতে বেলা গড়ে গেল। তবু ধানমাঠে চুপ করে বসে ছিল একটা হাঁড়িচাঁচা পাখি। ওর জুড়িটাকে আশেপাশে দেখতে পেল না গুয়ারাম। মন খারাপ হয়ে গেল তার। পথ যত ছোট হচ্ছে ততই দুর্গামণির জন্য মনটা টনটনিয়ে উঠছে তার। ছেলের কথা মনে পড়ছে, বাপের কথা মাঝে মাঝে ঝিলিক মেরে উঠলেও দুর্গামণি যেন মাঝ গঙ্গায় ভেসে ওঠা শুশুক। ওই মুখটা মনে পড়লেই গুয়ারামের হাঁটার গতি ঢিমে হয়ে আসে আপসেই।
ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল, কচার বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে যে শুধোল, গুয়াদা, কী হলো গো তুমার, পায়ে বুঝি বিদনা লাগে?
গুয়ারাম অপ্রস্তুত হাসল, না রে ভাই, পায়ের বিদনা-ফিদনা কিছু না। সত্যি কতা বলতে কি ভাই–আজ তুর বউদির কতা বড্ড মনে পড়ছে। ভাব তো কৎদিন পরে আচ তুর বউদির পাশে গিয়ে শুবো।
-ওঃ! দুলাল হাসতে গিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, তা বটে। উপোসী শরীল বড়ো গঙ্গার বান গো। সব ভেসিয়ে লিয়ে যাবে। তা দাদা, রয়ে-সয়ে খেও। গলায় গাবের বিচি এটকে গেলে বিপদে পড়বে।
–না রে ভাই, সেদিন কি আর আচে? গুয়ারাম রসিকতা করে বলল, কাঠের আগুন এখুন। ধিকিধিকি তুষের আগুন। শরীল যে তেজ দেখাবে তেমন খাদ্যখাবার জোটে কুথায়? শুধু মনের জোরে এ সব কাজ হয় না রে, এর জন্য জোর চাই।
-তা যা বলেচো! দুলাল এগিয়ে এসে বিড়ির ডিবা খুলে গুয়ারামকে একটা বিড়ি আর দেশলাই বাকস এগিয়ে দিল, নাও, বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দাও। বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া না দিলে মনে তুমার স্ফুর্তি আসবে কোথা থেকে। তা দাদা, বউদি রে বলো-আজ রাতে যেন মুরগি মারে।
গুয়ারাম এবার বিড়ি খাওয়া দাঁত বের করে হাসল। বাবলা গাছের হলুদফুলগুলো তার চোখে মনে হল হলুদগোলাপ। সত্যি, কতদিন পরে আজ দুর্গামণির সঙ্গে তার দেখা হবে। ছেলেটা বড়ো হয়েছে, এখন কি আর এত রঙ্গরস মানাবে তাকে? চুনারামের পাতলা ঘুম। খুট করে শব্দ হলে জেগে ওঠে। গলা খেঁকারি দেয়। তার গলা খেঁকারি জোরে ঘরের কেন পাড়ার লোকেও জেগে ওঠে।
পুরো বিশ জনের দলটা আলপথ ধরে ফেরিঘাটের দিকে চলেছে। আর একটু দেরি হলে মাঝি-মল্লাররা গাঁয়ে ঢুকে যাবে। ডাকাডাকি না করলে তারা আর গঙ্গার ঘাটে ফিরবে না। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে তারা বিধ্বস্ত, ক্লান্ত।
দুলাল এসব কাজে দলের সেরা। পুরো দলটা তার নির্দেশমত পাঁচ মাস চলেছে। যাওয়ার আগে ভূষণীবুড়ি তাকে বলে দিয়েছিল, মিলে জ্বলে থাকবি। বিদেশে পরকে আপন না ভাবলে জান বাঁচে না। বিদেশের ছোট বিপদ ফেঁড়া নয় রে বাপ, কারবল। সামলে না চললে সেই বিপদ তুর মাথায় চড়ে বসবে।
