-ন্যাকামী করবেন না, আপনি সব জানেন। আমার কাছে রিপোর্ট আছে। টেবিলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন বড়ো-দারোগা, কাজটা ভালো করেন নি। মানুষ খেপিয়ে আপনার কি লাভ হল মশাই। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। চলুন
-কোথায়?
-শ্রীঘরে। বড়ো দারোগা মুখ বিকৃত করে হেসে উঠলেন, ছিঃছিঃ, আপনাকে মাস্টার বলে ভাবতে আমার ঘৃণা হচ্ছে। যখন ভেবেছেন জঙ্গি আন্দোলন করবেন, তখন দেশসেবায় এলেন কেন? এসেছেন যখন তখন এর পুরস্কার তো আপনাকে নিতেই হবে, মশাই। গলা ধাক্কা দিয়ে অমলকান্তিবাবুকে ঠেলে ফেলে দিলেন বড়ো দারোগা, টাল সামলাতে না পেরে কঠিন দেওয়ালে মাথা ঠুকে গেল তার।
অসহায় চোখে অমলকান্তিবাবু তাকালেন, আমার অপরাধটা কি জানতে পারি?
-দেওয়ালগুলো আলকাতরা দিয়ে ভরালেন তখন মনে ছিল না? যান কদিন জেলের ভাত খেয়ে আসুন, তখন ঠিক মনে পড়ে যাবে। বড়ো দারোগা হাজতঘরের চাবির বান্ডিলটা একটা পুলিশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন, রায়, এটাকে ঢুকিয়ে দাও। মেজবাবুকে বলো পেপার রেডি করতে। কাল যেন সদরে চালান করে দেয়।
ইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা থানা ঘেরাও করেও কোনো ফল হল না। হেডমাস্টারমশাই নিজে এলেন বড়োবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। বড়ো বাবু দক্ষ রাজনীতিবিদের মতো বললেন, সরি মাস্টারমশাই, কিছু করা যাবে না। এরা চিনের চেয়ারম্যানকে নিজের চেয়ারম্যান বানিয়ে দিচ্ছে, এদের হয়ে আপনি আর ওকালতি করবেন না। তাছাড়া আমারও চাকরির রিস্ক হয়ে যাবে। ওপরওলার নির্দেশ, আমি তো অমান্য করতে পারি না।
.
২৪.
পরের দিন সকাল আটটার বাসে চালান গেলেন অমলকান্তিবাবু।
খবরটা শুনে সূর্য এসেছিল বাসস্ট্যান্ডে। তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে রঘুনাথ ফিসফিসিয়ে বলল, হায় ভগমান, কার দোষে কে জেল যায় দেখোদিনি। সূর্যাক্ষ চমকে উঠেছিল কথা শুনে, তুই কি বলতে চাইছিস?
রঘুনাথ হাসল, মুহূর্তে টানটান হয়ে দাঁড়াল, ডান হাতের আঙুলগুলো সুর্যাক্ষের সামনে মেলে ধরে বলল, এই দেখ, আমার নখের ভেতর এখুনো আলকাতরার রঙ লেগে আচে। ব্রেতের বেলায় কুশল মাস্টুরের কথা মতন ফটোর মাথাগুলোয় আমি লিজের হাতে আলকাতরা বুলিয়েচি। হা দেখ, ভালো করে দেখ, এখনও শুঁকলে ঘেরাণ পাবি।
সূর্যাক্ষের মুখে কোনো কথা নেই, রঘুনাথের হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল চুনারীদের কয়লা-ডিপোর বেড়ার কাছে, চুপ কর। মরবি নাকি? এখানেও টিকটিকি ঘুরছে।
-টিকটিকি? রঘুনাথ নির্বোধ চোখে তাকাল।
সূর্যাক্ষ তাকে সাবধান করে বলল, যা বলেছিস, আর যেন কোনোদিন না শুনতে পাই। এসব কথা বলা মানে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা। জানিস, রুদ্রদা পালিয়েছে। জেঠিমা কত কাঁদছিল। জেঠুকে আমি কোনোদিন এত গম্ভীর দেখিনি।
-তুর দাদা কুথায় গিয়েচে আমি জানি। কথাগুলো বলে রঘুনাথ বোকার মতো হাসল, তুর দাদা গাঙ পেরিয়ে সালারপানে চলে গিয়েছে। যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা হয়েছিল।
সূর্যাক্ষর মাথাটা যেন কাজ করছিল না এমন ভাবে তাকাল, সেকি রে এর আগে আমাকে তো এসব কথা বলিসনি তুই!
-বলব কী করে? রঘুনাথ প্রশ্নভরা চোখে তাকাল, সেদিন রাত থেকে আমারও কী ছাই মাথার ঠিক আচে? আমিও তো পেলিয়ে পেলিয়ে বেড়াচ্চি। বলা যায় না কখুন কী হয়। এমনিতে কাকার জন্যি আমাদের কতো বদনাম। শেষে আমার জন্যি বদনাম হলে আর কিছু না হোক মা তো গলায় ফাঁস নেবেই নেবে। মাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না বলে দিচ্চি।
সূর্যাক্ষের সাইকেলের পেছনে বসে হলদিপোঁতা অব্দি বাঁধে বাঁধে চলে এল রঘুনাথ। অশোথতলায় এসে সে সূর্যাকে বলল, তোকে যা বললাম-এসব কথা কাউকে যেন বলবি নে ভুল করে। তবে এট্টা কথা সূর্য, তুর দাদাকে আমার বড়ো ভালো লেগেছে। কত জ্ঞানবুদ্ধি ওর। এক এট্টা কথা বলে হাঁ করে তেকিয়ে থাকতে মন চায়। ওর সব কথায় আগুনপোরা।
-রুদ্রদা আর আসবে না। জেঠিমা বলছিল ধরা পড়লে পুলিশ নাকি তাকে গুলি করে মেরে ফেলবে। সূর্যাক্ষের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল।
রঘুনাথ কি বুঝে বলল, এ হতেই পারে না। এটা কি মগের মুলুক নাকি?
-আমি জানি না, তবে সূর্যাক্ষ কথা বলতে পারছিল না। তার দু-চোখ ভরে উঠল জলে, জানিস, অমলকান্তি স্যারের জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। স্যারকে থানায় খুব মেরেছে। দেখলি না কেমন চোখ-মুখ ফুলে গিয়েছে। খবরটা শুনে দ্বীপী তো শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। সামনে আমাদের পরীক্ষা। কী ক্ষতি হয়ে গেল বল তো।
–মাস্টুরকে ওরা ধরল কেনে? মাস্টুর তো ওসব দলে ছিলো নি।
–তাহলেই বোঝ, কেমন বিচার। সূর্যাক্ষ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
রঘুনাথ ওর হাত আঁকড়ে ধরে বলল, তুই বললে আমি এর বদলা নিয়ে ছাড়ব। আমি কাউকে ডরাই না।
-কী করতে পারবি তুই? ভয়ে শুধোল সূর্যাক্ষে।
-খুন করে দিব। রঘুনাথের চোখের তারা কেঁপে উঠল, ভালো মানুষের জন্যি এট্টা-দুটা খুন করতে আমার হাত কাপবে না। তবে খুন করলে জেলে যেতে হবে। মা’টা বড়ো একা হয়ে যাবে। দিনরাত কেনদে কেনদে আমার মাটা মরে যাবে।
পনের দিনের মাথায় পুলিশের জিপ গিয়েছিল কুলবেড়িয়ায়। বড়োবাবুর সঙ্গে ছিল রাইফেলধারী আরও দু-জন পুলিশ। কেসের তদন্ত সেরে ফেরার সময় অঘটনটা ঘটে গেল। মাঝ পথে গাছের গুঁড়ি ফেলে জিপ থামাল কারা। ঝোপের আড়াল থেকে আচমকা শুরু হল গুলির বৃষ্টি। প্রতিরোধের কোনও সময় পেলেন না বড়ো দারোগ। পর পর চারটে গুলি তার ইউনিফর্ম ভেদ করে বুক ফুড়ে বেরিয়ে গেল। সঙ্গের পুলিশ দুটো গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল ঘাসে। প্রতিরোধের সব চেষ্টাই বিফলে গেল হামলাকারীদের অতর্কিত আক্রমণে। দুটো রাইফেল আরে সার্ভিস রিভলভার নিয়ে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গেল ওরা।
