পুলিশের জুলুমবাজি সইব না, সইব না।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
প্রশাসনের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।
ভিড়ের মধ্যে থানায় ঢুকলেন কপোতাক্ষ। বড়বাবুর ঘরে শিবনাথকে দেখে তার মাথায় যেন বিছে কামড়ে দিল। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ছুঁড়ে দিলেন শূন্যে, চোয়াল নাড়িয়ে বললেন, কমরেড বিদুর রাজোয়ার জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
বড়োবাবুর ঘরে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চলল ওদের। শেষ পর্যন্ত কোন ক্লু না পেয়ে ওদের নিঃশর্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন বড়োবাবু।
থানার ছোট দারোগা চন্দবাবু বললেন, স্যার, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।
বলব? বড়োবাবু ওর দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালেন, বলে ফেলো। দেরি করছ কেন?
ছোটবাবু বললেন, স্যার, কালীগঞ্জে সব মিলিয়ে দুটো লোহা-লক্কড়ের দোকান। ওই দুটো হার্ডওয়ার্সের মালিকদের ডেকে পাঠালে কেমন হয়। কাল কারা ওদের দোকান থেকে আলকাতরা কিনেছে তাদের নাম জেনে নিলে ইনকুয়ারির সুবিধা হবে।
-ইটস অ্যা গুড আইডিয়া। ইমিডিয়েট জিপ নিয়ে চলে যাও।
বড়বাবুর নির্দেশে ছোটদারোগা জিপ নিয়ে চলে গেলেন। ফিরে এলেন হাসি-হাসি মুখ করে।
বড়োবাবু জিজ্ঞেস করলেন, শেষ পর্যন্ত কি হলো?
-কেস সলভ করে ফেলেছি, স্যার। কাল মোট দুজন আলকাতরা কিনেছে। একজন কুলবেড়িয়ার, একজন মানিকডিহির। ওদের একজনের বয়স আনুমানিক আটান্ন, অন্যজনের বয়স বাইশ। তবে যার বাইশ বছর বয়স তার নাম দোকানদার বলতে পারল না। শুধু বলল মুখ চেনা। দেখলে চিনতে পারবে।
–ওয়েল। তাহলে আর দেরি করে লাভ নেই। এক্ষুনি গাড়ি নিয়ে মানিকডিহি চলে যাও। ওরা সতর্ক হওয়ার আগে ফাঁদ পেতে ওদের ধরে ফেল। বড়োবাবু প্রাপ্তির উত্তেজনায় ফুটছিলেন।
রঘুনাথের কানে খবরটা পৌঁছাতে সে আর দেরি করল না। বাজার না করে সে ঘুরপথে ছুটল মানিকডিহির দিকে। থানার গাড়ি পৌঁছনোর আগে সে পৌঁছে গেল রুদ্রাক্ষর কাছে। হড়বড় করে বলল, দাদা গো, পালাও। তুমাকে ধরতে পুলিশ আসছে। দোকানদার তুমার নাম বলে দিয়েছে। দোকানদারও গাড়িতে আছে।
ঘরে ঢুকে টুকিটাকি কিছু নিয়ে ঝোলা কাঁধে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল রুদ্রাক্ষ। বাঁধ পেরিয়ে সে সোজা চলে গেল বড়গঙ্গার ঘাটে। ঘাট পেরিয়ে নয়াগ্রাম হয়ে সে পৌঁছে গেল সালারের কাছাকাছি। এখানকার গ্রামগুলো তারা চেনা। তবু এসব গ্রামে তার থাকা নিরাপদ নয়। যে কোন মুহূর্তে হামলা হতে পারে পুলিশের।
রুদ্রাক্ষ ভাবলসে আবার কলকাতায় ফিরে যাবে। কোলকাতা ছাড়া নিজেকে লুকোবার তার আর জায়গা নেই। তবে সবার আগে কুশল মাস্টারকে খবর পাঠানোর দরকার। তিনি যদি ধরা পড়ে যান তাহলে পুরো আন্দোলনটাই মুখ থুবড়ে পড়বে তাদের জেলায়। এল. সি. কলেজের ছাত্রদের জাগাবার দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত। এ কাজে তার বিপ্লবী মনোভাব অনেকটা কাজে দিয়েছে। ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠছে আন্দোলন। এবার শুধু জোয়ারের অপেক্ষা। সশস্ত্র বিপ্লবের অপেক্ষা।
মনের জ্বালা মেটাবার এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। শিবনাথবাবু বড়ো দারোগার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, সবাইকে যখন থানার দর্শন দিলেন তাহলে ছোকরা মাস্টারটাই বা বাদ যায় কেন? এই সুযোগ। দেওয়াল লেখার জন্য রাষ্ট্র-বিরোধী কে দিয়ে ফাঁসিয়ে দিন মশাই। সবই তো আপনার হাতে।
ভ্রূ-কুঁচকে সুপ্রিয়বাবু বললেন, ভালো কথা বলেছেন। দেখি কী করা যায়।
কলিং বেল টিপতেই একজন পুলিশ এসে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ালো বড়ো দারোগা বললেন, এক্ষুনি মাস্টারদের মেসে যাও। অমলকান্তিবাবুকে থানায় ডেকে আনো। বলবে–আমি ডেকেছি। আরজেন্ট।
পুলিশটা বেরিয়ে যেতেই শিবনাথবাবু আর সময় ব্যয় করলেন না। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, তাহলে স্যার, আসি। আবার দেখা হবে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলেন তিনি, ওঃ, একটা কথা ভুলে গিয়েচিলাম। ছোকরা মাস্টারের ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন। কাল আটটার বাসে যাতে চালান যায় সেই ব্যবস্থা করবেন।
থানা শব্দটায় সামান্য হলেও এলার্জি ছিল অমলকান্তিবাবুর। তবু ইচ্ছে না থাকলেও তাকে আসতে হল থানায়। চৈতন্যর-মা তার থানায় যাওয়ার কথা শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, হেই মা গো, এ আবার কি অলুক্ষুণে কথা! মাস্টার তো ইস্কুলে যাবে, সে আবার কোন দুঃখে থানায় যাবে? কালে কালে আর কত কি যে দেখবো–তা কৃষ্ণ জানে।
বড়ো দারোগা চশমার কাচ মুছে বললেন, বসুন।
অমলকান্তিবাবু তবু বসলেন না, দাঁড়িয়ে থাকলেন।
এবার চোখ পাকিয়ে বড়ো দারোগাবাবু ধমকে উঠলেন, কথাটা কানে গেল না বুঝি? বড়ো বেয়াড়া তো আপনি?
গায়ে পোকা বসার মতো কথাগুলোকে ঝেড়ে দিয়ে অমলকান্তিবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাকে ডেকেছেন কেন?
–বিনা প্রয়োজনে কাউকে কি থানায় ডাকা হয়?
–বলুন কি দরকার?
-এত তাড়াহুড়োর কি আছে। সব জানতে পারবেন। গোঁফ নাচিয়ে হেসে উঠলেন বড় দারোগা, আপনার নামে কমপ্লেন আছে।
–আমার নামে?
-হ্যাঁ, আপনার নামে। বড়ো দারোগাবাবু থামলেন, তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এই যে এত নাটক করলেন ছেলেদের নিয়ে এর কি কোনো প্রয়োজন ছিল?
–কি বলছেন, কিসের নাটক? আমি তো কিছু বুঝতেই পারছি না। বিস্ময়ে অমলকান্তিবাবুর চোখ কুঁকড়ে গেল।
