কাঁথা নামাতে গিয়ে বেকায়দায় হাত থেকে খসে পড়ল ইটের চেয়েও শক্ত তেলচিটে বালিশটা। দুর্গামণি ছেলের চিন্তায় ঘুমায়নি, তার তন্দ্রামতো এসে ছিল, বালিশ পড়ার শব্দে সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়, কে, কে? কে উখানে?
–আমি রঘু গো মা।
–সারারাত কুথায় ছিলি রে?
–মাঝের গাঁয়ে যাত্রা দেখতে গেছিলাম।
–যাত্রা! দুর্গামণির চোখে বিস্ময়, এখুন আবার কিসের যাত্রা? কেনে মিচে কতা বলছিস বাপ। তুকে না হাজারবার মানা করেচি, কমলার কাছে যাবিনে। ওর দাদাটা এট্টা আক্ষস। ওর বাপ এট্টা চামার। দেখে ফেললে তুর চোখের ডিমা উপড়ে লিবে।
কেনে মিচিমিচি ভাবচো বল তো? রঘুনাথ বিরক্ত হল, আচ নিয়ে মেলা দিন হলো কমলার সাথে আমার দেকা নেই গো তাকে তো মামার ঘর পেঠিয়ে দিয়েছে ওর বাপ-মা। আমার কথা বিশ্বেস না হলে দিনমানে খোঁজ লিও।
এবার মন কিছু নরম হয় দুর্গামণির, তা গেলি যখন খেয়ে যাবি না? এত বড়ো রাত, না খেয়ে থাকলে কী হয় জানিসনে বুঝি? কেনে বলে গেলে আমি কি তুকে এটকুতাম। দুর্গামণি ছেলের কাছে সরে এল, তুর ভোখ লাগেনি, কিছু খাবি?
–খেয়ে এসেচি মা।
-হুঁ, খেয়ে এয়েচি? দুর্গামণি ভেংচে উঠল, বলি,কে তুর জন্যি ভাত রেধে পাখার বাতাস করছিল শুনি?
–তুমি জানো না, সূর্যর মা আমাকে কত ভালো পায়।
অঃ। মন উদাস হয়ে গেল দুর্গামণির, বড়ো গাছে ঢিলি বাঁধা ভাল, তবে দেখিস বাবা-সেই ঢিলি যেন ফুটা না হয়ে যায়। আমার বড়ো ভয় হয় রে! এ জীবনে বড়ো মানুষের কত্তো ছোট কাজ দেখেছি।
সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায় রঘুনাথের, দুর্গামণি তাকে ঠেলা মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলে, আর কত্তো শুবি রে বাপ? রোদ চড়ে গেল মাথার উপর। ইবার চোখে-মুখে জল দিয়ে টুকে বাজারে যা। মনে নেই তুর, আজ সোমবার, হাটবার।
মায়ের কথাগুলো বুকে ঢেঁকির পাড় দেয় রঘুনাথের। কালীগঞ্জ বাজারে আজ না যাওয়া ঢের ভালো। রুদ্রাক্ষ বারবার নিষেধ করেছে। বিপদ কোথায়, কখন ওৎ পেতে থাকে বোঝা যায় না। তাছাড়া শিবনাথবাবুর শকুনের চোখ। বাজারের লোকে বলে, মানুষটা সুদ খেয়ে খেয়ে রাজশকুন হয়ে গিয়েছে। মানুষের চোখের চামড়া যে গণ্ডারের চামড়া হয় কে জানত।
অনেকে শিবনাথবাবুকে বলে, বাঘের ফেউ, বড়বাবুর লেজুড়। এই মানুষটা থানা বগলদাবা করে জলে আগুন লাগিয়ে দেবে। এর কথায় মধু নেই, শুধু বিষ আছে।
তবু মায়ের কথাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না রঘুনাথ। চটের থলিটা নিয়ে সে উঠে আসে বাঁধে। সামান্য হলেও তার পা কেঁপে ওঠে। মনের ভেতর ভয় সুষনিপাতার মতো কাঁপতে থাকে।
থানায় খবরটা পৌঁছে দেয় শিবনাথবাবু নিজে। রাগে তার সারা শরীর রি-রি করে উঠছিল। তিনি কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। এমন কান্ড কে ঘটাতে পারে, কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে?
শিবনাথবাবু কাঁপতে কাঁপতে বললেন, আপনি কিছু ব্যবস্থা করুন বড়োবাবু, নাহলে আমাদের এই শান্তির গ্রাম কৃষ্ণনগর রানাঘাট হয়ে যাবে। আগুন একবার জ্বলে উঠলে সহজে তা নেভানো যাবে না। এ দেশটা আলসের দেশ। আখের আলসেয় একবার আগুন লাগলে সহজে তা নিভতে চায় না। কথাটা মাথায় রাখলে সবার মঙ্গল হবে।
আপনি প্রেসারের রুগি। এসব নিয়ে ভাববেন না। সুপ্রিয়বাবু নাক খুঁটতে খুটতে বললেন, যে-ই করে থাকুক, তাকে আমরা ধরবই। পেছনে হুড়কো দিয়ে ওর বাপের নাম ভুলিয়ে ছেড়ে দেব।
-যা করার আড়াতাড়ি করুন। পাখি উড়ে গেলে তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। শিবনাথবাবুর কণ্ঠস্বরে উদ্বিগ্নতার ছাপ।
বড়বাবু সিগ্রেট ধরিয়ে বললেন, আপনার কাকে সন্দেহ হয়?
–বিদুর রাজোয়ারকে চাঁদা দিইনি। ও করলেও করতে পারে।
–ওর অত সাহস হবে? বড়োবাবুর যেন কথাটা বিশ্বাস হলো না। আড়চোখে তাকিয়ে শিবনাথবাবু বললেন, এছাড়া মানিকডিহির কপোতাক্ষর নামটাও আমার মনে আসছে। ওরা গ্রামটাকে নষ্ট করার চক্রান্তে লেগে পড়েছে। আমি সহজে তা হতে দেব না। ওরা যতই লাফাক, ঝাঁপাক, আমি আমার আদর্শে স্থির থাকব।
-স্থির থাকলে হবে মশাই, যুগ পাল্টাচ্ছে। তিক্ত গলায় বলল বড়োবাবু, জানেন গোয়াড়ী বাজারের কাছে একজন ও.সির পেটে ভোজালি ঢুকিয়ে দিয়েছে। শক্তিনগর সদর হাসপাতালে ভর্তি আছে। খুব সিরিয়াস। ওয়ারলেসে ম্যাসেজটা পেলাম। আমাদেরও এলার্ট থাকা দরকার। কখন কি হয় বলা যায় না তো?
–তা তো বটে। শিবনাথবাবু জোর করে হাসলেন, ওরা আমাকেও শাসিয়েছে। বুর্জোয়া বলে গাল দিয়েছে। মনে হচ্ছে আমি ওদের নেক্সট টার্গেট।
সেই ছোকরা মাস্টারকে সন্দেহ হয় না? বড়ো দারোগার কথায় নড়েচড়ে বসলেন শিবনাথবাবু।
–ও হারামিটাকে জীবনে আমি কোনদিন ভুলব না। জানেন মশাই আজ অব্দি কেউ আমার হাত ধরার সাহস পায়নি, ও শালা আমার হাত ধরে মুচড়ে দিল। সবাই না এগিয়ে এলে হয়ত ভেঙে দিত। শিবনাথবাবুর গলা শুকিয়ে গেল। অভিযোগের আঙুল তুলে তিনি বললেন, এই সুযোগ বড়োবাবু, এবার ছোকরা মাস্টারকে হাজত ঘরে পাঠাবাব ব্যবস্থা করুন। এমন কেস দিন যাতে জেল থেকে বেরতে দাড়ি পেকে যায়।
-চুপ করে বসুন। দেখছি আমি কী করা যায়।
বড়োবাবুর নির্দেশে চারজন পুলিশ ছুটল চারদিকে।
কদবেল তলা থেকে ধরে আনা হল বিদুর রাজোয়ারকে। লাবণি এল তার পেছন পেছন। সঙ্গে এল হরিনাথপুর আর দাসপাড়া সাধারণ মানুষ। তারা থানায় গিয়ে নিমগাছের তলায় স্লোগান দিতে লাগল। তাদের পুরোভাগে লাবণি।
