–লোক জানলে পরে কী হোত কী? রঘুনাথের কৌতূহল জেগে উঠল।
আরে, কি বোকা বলতো তুই! দশ কান হলে পুলিশ সব জেনে যাবে। এখন সাদা পোশাকের পুলিশ গাঁয়ে-গঞ্জে ঘুরছে। ওরা যদি জানতে পারে তাহলে আর রুদ্রদার নিস্তার নেই। পুলিশের জিপ এসে তুলে নিয়ে গিয়ে কৃষ্ণনগরের জেলে পাঠিয়ে দেবে। রুদ্রদা বলছিল–ওর চারজন বন্ধুকে পুলিশ গুলি করে মেরে দিয়েছে। সূর্যাক্ষর গলা ভার হয়ে এল, সেদিক থেকে আমাদের কালীগঞ্জ থানা অনেক ভালো। এখানকার পুলিশ বাড়াবাড়ি করে না। ওরা শুধু ডাকাত ধরে বেড়ায়, ছাত্রদের গায়ে হাত তোলে না।
কুশল মাস্টারের সঙ্গে সে রাতে অনেকটা পথ হেঁটে গিয়েছিল রঘুনাথ। বেলগাছটার কাছে আসতেই সে দেখতে পেল অন্ধকার কুঁড়ে ঝোপের ভেতর থেকে উঠে এল রুদ্রাক্ষ। হাত উঁচিয়ে অদ্ভুত কায়দায় শরীর ঝাঁকিয়ে সে বলল, কমরেড, লাল সেলাম।
কুশল মাস্টারও হাত উঁচিয়ে একই কায়দায় বললেন, লাল সেলাম। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
রঘুনাথ ফিরে যেতে চাইলে রুদ্রাক্ষই বলল, ফিরে যাবে কেন, আমাদের মিটিংয়ে চলল। ঘাসুরিডাঙা, কামারী, কুলবেড়িয়া, কালীগঞ্জ, শেরপুর থেকে আরও কমরেডরা আসবেন। আজ আমরা পার্টির ভবিষ্যৎ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করব। সেই সঙ্গে আমাদের পার্টির ভবিষ্যৎ কর্মসূচী গঠিত হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য তৈরি হয়ে যাবো। শ্রমিক এবং মেহনতী মানুষের জন্য আমরা পুঁজিপতি শ্রেণীর বিনাশ চাইছি, সেই সঙ্গে চাইব-দুনিয়ার শ্রমিক-কৃষক এক হোক।
রঘুনাথের যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না তবু রুদ্রাক্ষর মুখের উপর সে না বলতে পারল না। নীলাক্ষবাবুর এই ছেলেটি পড়াশোনায় বরাবর ফার্স্ট। তার এই জনদরদী মনের কথা জানত না রঘুনাথ। শুধু কপোতাক্ষবাবু নয় রুদ্রাক্ষও মানুষের সেবায় নেমেছে। তবে সূর্যাক্ষর ভাষায়, কাকা ভাইপোর পথ ও মত সবই আলাদা। ওদেরও নিজেদের মধ্যে লড়াই আছে, সে লড়াই আদর্শের লড়াই। সে লড়াই কোনোদিন মিটবে বলে মনে হয় না।
কুশল মাস্টারের নেতৃত্বে জনা ত্রিশেক মানুষ চাপা গলায় স্লোগান দিল–দুনিয়ার কৃষক এক হও। দুনিয়ার শ্রমিক এক হও। দুনিয়ার মজদুর এক হও। প্রশাসনের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। একনায়কতন্ত্রী স্বৈরাচারী এই সরকার আমরা মানছি না, মানব না। দুনিয়ার কমরেড এক হও। বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র ধ্বংস হোক।
সভায় সিদ্ধান্ত হল আজ রাত থেকেই কালীগঞ্জ বাজারে পোস্টার আর স্লোগানে ভরিয়ে দেওয়া হবে। সেইসঙ্গে দেওয়ালে দেওয়ালে আলকাতরা দিয়ে আঁকা হবে মাও সে তুঙ-এর মুখ। গোটা গোটা করে লেখা হবে চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান, মাও সে তুঙ জিন্দাবাদ ইত্যাদি।
সেইমতো আলকাতরা কেনার জন্য রুদ্রাক্ষ রঘুনাথকে সাইকেলের পেছনে চাপিয়ে নিয়ে গেল কালীগঞ্জের বাজারে। দোকান আর একটু হলে বন্ধ হয়ে যেত। গণেশ বিশ্বাস বিরক্ত হয়ে বলল, বাবু, আলকাতরা নেবে তো, দিনের বেলায় এলে না কেন? রাতের বেলায় কি রঙের কাজ হয়? ঠিক আছে–এসেছ যখন দিয়ে দিচ্ছি। আর কিন্তু এসময় এসো না।
-ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করো। আবার ফিরতে হবে তো–রুদ্রাক্ষ ব্যস্ত হয়ে বলল।
সারারাত ধরে চলল তাণ্ডব। খবরের কাগজে লেখা হল স্লোগান। ছাঁচে আলকাতরা বুলিয়ে ফুটিয়ে তোলা হল মাও সেতুঙের মাথা। সাদা দেওয়াল ভরিয়ে দেওয়া হল কালো অক্ষরে। শিবনাথবাবুর দোকানের তালায় কাঠিতে বিষ্ঠা নিয়ে এসে ভরিয়ে দিল। শুধু শিবনাথবাবুর তালা নয় যারা যারা অত্যাচারী, হৃদয়হীন বলে ইতিমধ্যে কুখ্যাতির অংশীদার হয়েছেন তাদের একটা তালাও অক্ষত রইল না। বহু সময় ধরে ব্যস্ত শিল্পের ছাপ রেখে বাঁধের ধারে ফিরে গেল ওরা। আখখেতের পাশ দিয়ে দিঘিতে যাওয়ার পথ।
দিঘির পাড়ে এসে ওরা শরীর এলিয়ে দিল ঘাসের বিছানায়।
কুশল মাস্টারের সারারাত খাওয়া হল না। রুদ্রাক্ষ সবার জন্য পাঁউরুটিও এনেছে থলি ভরে। দিঘির জলে হাত ধুয়ে ওরা যখন খেতে বসল তখন শেষরাত। মরা চাঁদ ঝিমুচ্ছে আকাশে। বাবলাগাছের ফুলের মতো হলুদ হয়ে এসেছে তার দৃষ্টি। সেই চাঁদের দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে আছে একটা হুতোমপ্যাঁচা।
পাউরুটির কাগজগুলো এক জায়গায় রাখতে বলে রুদ্রাক্ষ বলল, আমাদের আজকের এই অপারেশনের কথা কেউ যেন জানতে না পারে। কুশলদা ভোরের বাসে কৃষ্ণনগর চলে যাবেন। এখানে থাকা ওর পক্ষে রিস্ক হয়ে যাবে। কাল কি রিঅ্যাকশন হবে এখন ঠিক বোঝা যাবে না। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শিবনাথবাবু আমাদের টার্গেট। ও বুর্জোয়া। সুদখোর, মানববিদ্বেষী। আমাদের এই মহান বিপ্লবের শত্রু। গ্রামে গ্রামে এদের চিহ্নিত করতে হবে। তারপর হাইকমান্ডের নির্দেশমতো সাফাই অভিযান চালাতে হবে। পুঁজিপতি শ্রেণীর বিনাশ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই সশস্ত্র রক্তাক্ত বিপ্লব চলবে।
রঘুনাথের জীবনে এ এক অন্য অভিজ্ঞতা, দিঘির জলে আলকাতরার দাগ মুছে সে ফিরে এসেছে ঘরে। তখনও আলো ফোটেনি, পোকরাতারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। রঘুনাথ ভেবেছিল চুপচাপ ঘরে এসে শুয়ে পড়বে তালাইপেতে। কিন্তু শীতকাল বলে যত ঝামেলা। শুধু তালাইয়ে শীত যাবে না, ভোরের দিকে শীতের দাঁত উঁচলো হয়ে ওঠে, কাঁথা-কম্বল ছাড়া এ শীত সহজে যাবার নয়।
