শিবনাথবাবু অনেক ভেবে দ্বিধার সঙ্গে বললেন, একটু চমকে দিলে হয় না? বড্ড উড়ছে, একটু ডানাটা মুচড়ে দেওয়া আর কি…
–ডানা মুচড়াব কেন, দরকার হলে ডানা ভেঙে দেব। সুপ্রিয়বাবুর গলা পুলিশী কায়দায় ঝ্যানঝেনিয়ে উঠল।
শিবনাথবাবু বললেন, যাই হোক কিছু একটা করুন। জানেন ও আমার হাত ভেঙে দিতে চেয়েছিল, তা-ও আবার ইস্কুলে।
–তাহলে এফ. আই. আর করছেন না কেন? একবার থানার খাতায় কমপ্লেন লেখান, তারপর দেখুন ওর অবস্থা কি করি? চোখ কটমট করে সুপ্রিয়বাবু ফুঁসছিলেন।
শিবনাথবাবু তাকে শান্ত করলেন, লঘু পাপে গুরুদণ্ড দিতে আমি চাই না।
–আপনাকে নিয়ে মশাই আর পারা গেল না। শরীরে এত দয়া পুষে রাখলে চলবে? আপনি মশাই বড়ো আজব মানুষ! আপনার ডান দিকে মহাত্মা গান্ধী, বাঁ-দিকে সুভাষচন্দ্র। দেখুন, যেটা ভালো হয় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে বলুন। আমি প্রশাসনের লোক। কীভাবে দুষ্টকে শাসনে রাখতে হয় তার ট্রেনিং আমার নেওয়া আছে। সুপ্রিয়বাবু গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে উড়িয়ে দিলেন ঘরের ভেতর।
ইতিমধ্যে চা-বিস্কুট এসে গিয়েছে শিবনাথবাবুর জন্য। চায়ে চুমুক দিয়ে সুপ্রিয়বাবু বললেন, আপনি বাড়ি যান। কোনো চিন্তা করবেন না। অমলকান্তি আপনার হাত ধরে ভালো কাজ করেনি। আমার এলাকায় কেউ খারাপ কাজ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে, দু-দিন আগে আর পরে।
–সে আমি জানি। সেইজন্য তো ছুটে আসা। শিবনাথবাবু গায়েপড়া হাসি হেসে উঠলেন, তাহলে এবার আমি যাই। আপনার জন্য গরীবের দরজা খোলা রইল। যেদিন মন হবে সেদিন নিজের মনে করে বিনাসংকোচে চলে আসবেন, প্লিজ।
.
কৃষ্ণনগর থেকে কুশলবাবু এসেছিলেন পরশু। উনি বেশিরভাগ সময় রাতের বাসে আসেন, ব্রহ্মাণীতলায় নেমে কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে যান–এ সংবাদ কেউ রাখে না। মাঝে বেশ কয়েকবার রঘুনাথ তাকে মানিকডিহির দিকে যেতে দেখেছে। মানুষটার কোনো ভয় ডর নেই প্রাণে।
একদিন রঘুনাথ ঘুরঘুট্টি আঁধারে তাকে বাঁধের উপর আটকালো। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, মাস্টর, কবে এলে গো?
প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি কুশলমাস্টার, তারপর টর্চের সুইচ টিপে রঘুনাথের মুখর উপর ফেলে বললেন, আরে, তুমি?
–আমি তো ইখানেই থাকি মাস্টর।
–ওঃ,বেশ ভালো কথা। তা তোমাদের পাড়াটার নাম কি?
–আজ্ঞে, হলদিপোঁতা ধাওড়া।
–বাঃ, বেশ ভালো নাম তো!
–ভালো-মন্দ বুঝি নে বাবু তবে এ গাঁয়ে আমার বাপও জন্মেছিল।
ওঃ, তাই বুঝি? কুশলমাস্টারের আগ্রহ বাড়ছিল ক্রমশ। এই ছেলেটাকে পার্টির কাজে লাগানো যায়। এদের বিদ্যে-বুদ্ধি নেই। একেবারে প্রলেতারিয়েত শ্রেণীভুক্ত শ্রমজীবী মানুষের একজন প্রতিনিধি এই রঘুনাথ। বার চারেক এর সঙ্গে দেখা হয়েছে কুশল মাস্টারের।
রঘুনাথ প্রথম দিকে বুঝত না এরা কি চায়, এদের গ্রামে আসার কী উদ্দেশ্য।
সূর্যাক্ষ তাকে বুঝিয়ে দেয়, জানিস রঘু, এরা হলে গিয়ে এসময়ের বিপ্লবী।
তার মানে? রঘুনাথের সবিস্ময় প্রশ্নে ঘাবড়ে যায় সূর্যাক্ষ, বিপ্লবী মানে বুঝলি না? আরে যারা যুদ্ধ করে। ধুর, যুদ্ধ নয়…যারা লড়াই করে। আরে, ওই যে ক্ষুদিরাম, ক্ষুদিরাম বসু। তুই সেই গানটা শুনিসনি বুঝি? হাসি হাসি…একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়লে সূর্যাক্ষ খুশি হয়, ওই যে যারা দেশের জন্য গলায় ফাঁসি ঝুলিয়ে নিয়েছিল স্বেচ্ছায়। এরাও তাদের মতন। এরা বুর্জোয়াদের খতম করে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে বিপ্লবী রাষ্ট্রযন্ত্রকে তুলে দেবে। এরা সর্বহারাদের সরকার গড়বে-বুঝলি?
রঘুনাথের মুখ আরও বিস্ফারিত হয়, তার কানের পাশ দিয়ে শব্দগুলো ঝাঁ-ঝাঁ করে উড়ে যায়।
সূর্যাক্ষ হার মেনে বলে, তোকে বোঝানো বড় কঠিন। আচ্ছা বলতো ইন্দিরা গান্ধী কে? তুই ওর নাম শুনেছিস?
রঘুনাথ এবার আকাশ থেকে পড়ল। সে তার ঠাকুরমার নামটা কদিন আগে শুনেছে। লাজবতী। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী নামটা তো শোনেনি। কমলার সঙ্গে দেখা হলে তাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখবে। কমলা অনেক খোঁজখবর রাখে। কাশীনাথ ম্যাট্রিক ফেল। সে নিশ্চয়ই ইন্দিরা গান্ধীর নাম শুনেছে।
সূর্যাক্ষ বলল, জানিস রঘু, কুশল মাস্টারের কাছে সব সময় চেম্বার থাকে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেদিন চান করতে বাথরুমে গিয়েছিল, হঠাৎ দেখি প্যান্টের পকেট থেকে কালো মতো কী একটা টুকি মারছে। হাত দিয়ে দেখি কী শক্ত। আর ঠিক তখনই আমার জ্যাঠার ছেলে রুদ্রদা এসে আমাকে ওই অবস্থায় দেখে ফেলে। রেখে দে-বলে কী ধমক দিল। আমার পিলে চমকে গিয়েছিল। ওই দিন রুদ্রদাই বলল-এটাকে চেম্বার বলে। নিজের সেফটির জন্য কুশল মাস্টার ওটা সব সময় কাছে রাখেন। বলা যায় না কোথায় কখন পুলিশের লোকের সাথে দেখা হয়ে যায়।
-ওটা দিয়ে বন্দুকের মতো মানুষ মারা যায়? রঘুনাথ বোকার মতো শুধোল।
সূর্যাক্ষ হা-হা করে হাসল, মানুষ কেন রে, বাঘও মারা যাবে।
–অমনটা আমাকে একটা যোগাড় করে দিবি?
–ওটা দিয়ে তোর কি হবে?
রঘুনাথ উত্তেজিত হয়ে বলল, আগে কাশীকে ধসিয়ে দেব। ও ব্যাটা সবসময় আমার পিছে লেগে আচে। আমার এক নাম্বার শত্তুর।
-মাথা গরম করিস নে, শোন। সূর্যাক্ষ গলা নামিয়ে বলল, দেশের সময় এখন ভাল নয়। রুদ্রদা কলেজ থেকে চলে এসেছে। আর কলকাতায় যাবে না। ওখানে নাকি পুলিশ হোস্টেল ঘিরে রাতেরবেলায় ছেলেদের তুলে নিয়ে গিয়ে আলিপুরের জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সেই ভয়ে সেন্ট-জেভিয়ার্স থেকে পালিয়ে এসেছে রুদ্রদা। একথা গাঁয়ের কেউ জানে না। তোকে শুধু বললাম।
