শুভ সেদিন দেখেছিল সরলামাসীর ফণা তোলা মাথা কাজ হারানোর ভয়ে ঝুঁকে গিয়েছে মাটির দিকে, তার মুখে টুঁ শব্দটিও নেই। সরলামাসীর ছেলে চৈতন্য শুভদের সঙ্গে পড়ে। কিন্তু বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও চৈতন্য কোনোদিন ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়নি। কেন নিয়ে যায়নি, কারণটা খুবই স্পষ্ট। শুভ গেলে ওদের কুঁড়েঘরের পবিত্রতা নষ্ট হবে। ছোঁয়াছুঁয়িতে খোয়া যাবে ওদের এতদিনের আগলেরাখা জাত্যাভিমান। তাই বন্ধু হয়েও শুভ এখন ওদের বন্ধু নয়।
বিজয়া দশমীর দিন চৈতন্য ঠোঙ্গায় করে নাড়ু নিয়ে আসে। বন্ধুদের দেয়। শুভ সেই নারকেলের নাড়ু ছুঁয়েও দেখে না। কেন ছোঁবে সে? যারা তাকে ঘৃণা করে তাদেরও সে ঘৃণা করবে। মারের বদলে সে ফিরিয়ে দেবে মার। কারোর দয়া নিয়ে বাঁচবে না। এ ব্যাপারে সে দলে পেয়েছে সবুজ আর রঘুনাথকে। ওই দু’জন তার পাশে থাকলে সে শিবনাথবাবু কেন যে কোন বাবুকেই রুখে দেবে।
প্রতিবাদ সবার দ্বারা হয় না। প্রতিবাদ রক্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিলিমাছ। আর তা যদি না হত তাহলে শুধু অমলকান্তিবাবু কেন সেদিন তার বন্ধুরা রুখে দাঁড়াতে পারত সরলামাসীর বিরুদ্ধে। ওরা কেউ ত করেনি, করার প্রয়োজনও বোধ করেনি।
.
শিবনাথবাবুর মোটর সাইকেলটা সোজা এসে থামল থানার নিমগাছটার গোড়ায়। অন-ডিউটি পুলিশটা তাকে স্যালুট করে বলল, স্যার চেম্বারেই আছেন। যান দেখা হয়ে যাবে।
থানার সঙ্গে শিবনাথবাবুর সম্পর্ক অনেকটা মামা আর ভাগ্নের মতো। থানার বড়োবাবু সুপ্রিয় চাকলাদার প্রায়ই শিবনাথবাবুর বাগানবাড়িতে গিয়ে নৈশভোজ সেরে আসেন। সেই ভোজে মাছমাংস ছাড়াও থাকে তরল পানীয়। দেশী তরলে এখন মন ভরে না সুপ্রিয়বাবুর। তার জন্য কৃষ্ণনগর থেকে গাড়ি পাঠিয়ে বিদেশী ছাপ্পার পানীয় আনতে হয় শিবনাথবাবুকে। এমন সেবা করার সুযোগ পেয়ে তিনি ধন্য। কেননা বেআইনী সুদের কারবার চালাতে গেলে থানার সঙ্গে হাত রাখার প্রয়োজন। এসব ব্যবসায় সোজা আঙুলে কারবার বাঁচে না, প্রায়ই আঙুল বেঁকিয়ে ঘি তুলতে হয়। লাঠালাঠির চাইতে থানার শাসানীটা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। সহজে কেউ শিবনাথবাবুকে ঘাঁটাতে চায় না। গ্রামের সবাই জেনে গেছে থানা মানে বাঘের গুহা। আর বাঘের ছোঁয়া মানে আঠারো আঁচড়, আঠারো ঘা।
অপমানটা মাথার ভেতর বিষপোকার মতো কুটকুট করে কামড়াচ্ছিল, আর তার দংশনে দগ্ধে-দগ্ধে মরছিলেন শিবনাথবাবু, যার কবল থেকে পরিপূর্ণভাবে নিষ্কৃতি পাওয়া মুখের কথা নয়। অমলকান্তি সেদিনের ছোকরা। এম. এস. সি. পাশ করে তার নিশ্চয়ই ডানা গজায়নি। তা যদি না হয় তাহলে সবার সামনে এমন ঔদ্ধত্য তিনি দেখালেন কোন সাহসে? তবে কি পিঁপড়ের পাখা গজায় মরবার জন্য? হতে পারে। প্রচণ্ড রাগে মাথা ঝাঁকালেন শিবনাথবাবু। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে হালকাবোধ করতে চাইলেন তিনি। সব হালকা হয় কিন্তু অপমানের তীরটা নোঙরের ধাতব ফ্যাকড়ার মতো মনের নরম জমিতে গিঁথে থাকে। অতি বাড় বেড়েছে মাস্টারটার। ওর বাড়বাড়ন্ত একটু ছেঁটে দিতে হবে। তবে এ কাজ নিজের হাতে করবেন না শিবনাথ। সুপ্রিয়বাবুই তার হয়ে বাকি কাজটা করে দেবেন। এতদিন পুকুরের মাছ, গাছের কচি ডাব খাইয়েছেন, এখন তার বিনিময়ে নিশ্চয়ই এটুকু আশা করা যেতেই পারে। এ তো এমন কিছু বেশি চাওয়া নয়, এতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।
ভারী পর্দা হাওয়ায় অল্প-অল্প নড়ছিল, এই পদাও শিবনাথবাবুর কিনে দেওয়া। নিজের কিনে দেওয়া পর্দা সরিয়ে বড়বাবুর চেম্বারে ঢুকে এলেন তিনি। তাকে দেখে সুপ্রিয়বাবু ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি বুলিয়ে বললেন, আরে কি সৌভাগ্য! এ যে দেখছি মেঘ না চাইতে জল।
শিবনাথবাবু দাঁত ঠেলে বেরিয়ে এল হাসি, দায়ে না পড়লে কেউ কি থানায় আসে, স্যার?
-আরে বসুন, বসুন। কথা পরে হবে। আগে বসুন তো শিবনাথবাবু তার বিশাল চেহারা নিয়ে একটা চেয়ার জুড়ে বসলেন, তারপর দু-দিকে দুই হাত ছড়িয়ে কাতলা মাছের মতো দম নিয়ে বললেন, আপনি তো আমার বাগানবাড়ির রাস্তাটা ভুলে গেছেন। তা আপনার দৌলতে মাঝে মাঝে আমারও ঢুকুঢুকু হোত, গলা ভিজত, আপনার দয়ায় প্রায় মাসের উপর সেটাও বন্ধ।
-হ্যাঁ, একদম টাইম বের করতে পারছি না। জানেনই তো আমাদের বারো মাসে তের পার্বণ লেগে আছে। সুপ্রিয়বাবু টেবিলের কাচে ভর দিয়ে তাকালেন, তা বলুন, আপনার কি সমস্যা। কাউকে ওঠাতে হবে বুঝি?
শিবনাথবাবু আভিজাত্যে ভরা সিগারেটের পেকেটটা এগিয়ে দিলেন বড়ো-দারোগার দিকে, অমলকান্তি মাস্টারকে চেনেন মনে হয়?
–কে অমলকান্তি? সুপ্রিয়বাবু চোখ কুঁচকালেন, এনি প্রবলেম?
-হ্যাঁ, প্রবলেম একটু আছে বইকি। কলকাতার চ্যাংড়া, গ্রামে এসে বড়ো বেশি ফুটুর ফুটুর করছে।
-ওঃ, এই কথা! যে ফুটুরফুটুর করছে, তাকে ফুটুরডুম করে দিলেই হলো। সুপ্রিয়বাবু বিশ্রী গলায় হেসে উঠে নোংরা চোখে তাকালেন, ওকে চেষ্টা করে মেয়েছেলে কেসে ফাঁসিয়ে দিন। তারপর বলটা আমার কোর্টে ছেড়ে দিলে ঘুঘুকে ধান খাইয়ে কেসনগর কোর্টে চালান করে দিতে আমার কোনো ঝামেলাই হবে না।
-মেয়েছেলে কেস ছাড়া আর অন্য কোনো কেসে ফাঁসানো যায় না?
–যায়। তবে এটা সব চাইতে সহজ মেথড। সুপ্রিয়বাবু হাসলেন।
