মানুষের কাছে গেলে মানুষের মন চওড়া হয়। গাছের ছায়ায় গাছের বাড়বাড়ন্ত না হলেও মানুষের ছায়া ভিন্ন মানুষের উন্নতি কোনোদিন সম্ভব নয়। অমলকান্তিবাবুকে লাখুরিয়া হাইস্কুলের সবাই ভালোবাসে। শিবনাথবাবু চলে যাবার পর ছাত্র-শিক্ষক সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল। সবার উদ্বেগ তাকে ঘিরে।
কেউ বললেন, কাজটা ঠিক হল না মাস্টারমশাই। জাতসাপের লেজে পা দেওয়া মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।
হেড-স্যার বললেন, যা হবার তা তো হয়েছে। এখন গবেষণা করে কোনো লাভ আছে কি? আপনারা যে যার কাজে যান। ওকে একটু বিশ্রাম নিতে দিন।
সহ-শিক্ষকরা টিচার্স রুমে ফিরে গেলেন। দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে বাঁধের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অমলকান্তিবাবু। সবুজ অনেক সময় মনের অস্থিরতায় সর ফেলে দেয়। সর পড়া দুধের মতো মনকে স্থিতু হতে সাহায্য করে। একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে ভুলবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন তিনি। হয়ত ভুলেও যেতেন কিন্তু দ্বীপী, সূর্য, মাধুরী, শুভ আর সবুজ তার প্রতিবাদী মনটাকে জিইয়ে রাখল অনেকক্ষণ।
সবার আগে সবুজ বলল, স্যার, আজ আপনি যা করলেন তা ইতিহাস হয়ে যাবে। যে মানুষটাকে সবাই ভয় পেত আপনি আজ তাকে ভয় পাইয়ে দিলেন।
অনেকক্ষণ পরে অমলকান্তিবাবু বললেন, কাউকে ভয় দেখানো আমার উদ্দেশ্য নয়। উনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছিলেন, আমি শুধু ওকে থামিয়েছি।
–এটাই বা ক’জন মানুষ করে? শুভর প্রশ্নে অমলকান্তিবাবু স্মিত হাসলেন, তোমরা নিজেদের এইভাবে তৈরি করার চেষ্টা করো। যেখানে অন্যায় দেখবে সেখানেই প্রতিবাদ করবে। প্রতিবাদ না হলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। শুধু তত্ত্বের কচকচানি দিয়ে জীবনটাকে ভরিয়ে দিও না। তাতে জীবনের সমস্যা বাড়ে, জীবন সঠিক পথ খুঁজে পায় না।
সূর্য কিছু বলতে যাচ্ছিল তাকে থামিয়ে দিল মাধুরী, সূর্যদা, স্যার যেটা বলেছেন সেটা সবার আগে আমাদের বোঝার দরকার। আমাদের এই গ্রামে এখনও সুফল ওঝা, চৈতন্যর মা কিংবা শিবনাথবাবুর মতো মানুষ আছে। তাদের সাথে পেরে ওঠা কোনো মানুষের একার কাজ নয়। স্যার কাজটা শুরু করেছেন। তার পাশে আমাদের থাকার দরকার।
মাধুরী কপাল কুঁচকে বলল, সব মানুষের মধ্যে শিবনাথবাবুর মতো একটা মন লুকিয়ে থাকে। আমরা সবাই ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব চাই। হিসাব এক চুল না মিললে আমরা বিদ্রোহী হয়ে উঠি। যেন তেন প্রকারেণ কাজটা হাসিল করার জন্য লেগে পড়ি। কথার যোত অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছিল। শুভ খুব সতর্ক হয়ে বলল, স্যারের মতো সবাই কি হতে পারে? আমড়াগাছে খেজুর ফলবে আমরা কেউ আশা করি না। প্রতিবাদ আমাদের সবার মধ্যেই আছে কিন্তু আমরা অনেকেই তার প্রয়োগ করতে দ্বিধা করি। অবশ্য এর মধ্যে অনেক কারণ থাকে। ভয় তার মধ্যে একটা।
শুধু ভয় নয় সংকোচও অনেক সময় প্রতিবাদের মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়। শুভর মনে পড়ে বছর খানিকের আগেকার কথা। সময়টা শীতকাল। শুভর গায়ে তুষের চাদর। অবনী তাকে সোয়েটার কিনে দেবে বলেও কিনে দিতে পারেনি। অভাব তার সেই ইচ্ছেটাকে গিলে নিয়েছে।
মাস্টারদের মেসে টিউশনি পড়তে এসে শুভর চাদরের কোণাটা সরলামাসীর গায়ে লেগে যায়। এই সরলামাসী মাস্টারদের মেসে কাজ করত। বাসনমাজা থেকে রামা অবধি সব কাজ করতে হত তাকে। ব্যক্তিগত জীবনযাত্রায় সরলামাসী নোংরা থাকতে পছন্দ করত। ফলে তার পরিধানের কাপড়চোপড় আধময়লা, নোংরা ছেঁড়াফাটা। সেই সরলামাসী শুভর চাদরের কোণা লাগাটাকে মেনে নিতে পারে না। জাত চলে যাবার ভয়ে গর্জে ওঠে সে, দিলি তো আমাকে ছুঁয়ে, যত্তো সব।
শুভর সপ্রতিভ মুখ তখন আঁধার ঢাকা। অপমানের শব্দওলোয় সব সময় সুঁচ লুকিয়ে থাকে। দাঁতে দাঁত টিপে মুখ নামিয়ে নেয় শুভ মাটির দিকে। সকালবেলায় তার পৃথিবীটা আঁধার হয়ে আসে হঠাৎ।
সরলামাসী একই কথা বারবার আউড়ে গজগজ করতে করতে চলে যাচ্ছিল। অমলকান্তিবাবু ওই অত জনের মাঝখানে তাকে থামালেন, মাসী, তোমার কিন্তু এটা উচিত হল না। শুভকে তুমি বকলে, ও কি দোষ করেছে?
কী করেনি বলো? সরলামাসী দোক্তা খাওয়া দাঁত দেখিয়ে বলল, সাত সকালে দিলো তো ছুঁয়ে, এই শীতে আমি ঘাটে যাবো কি করে? এটা অত্যাচার নয়?
–যাকে তুমি অত্যাচার বলছে সেটা তোমার পাপ মনের পরিচয়। অমলকান্তিবাবুর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, মানুষকে ছুঁলে মানুষকে যদি স্নান করতে হয় তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কি হতে পারে!
–ও তুমি সব বুঝবে না বাবা, পরে আমি সব তোমাকে বুঝিয়ে বলব। সরলামাসীর গলার স্বর নীচু হয়ে এল, আসলে জানো কী বাবা, ওই…তোমাদের ওই শুভ…মানে ওর বাবা..এই হাসপাতালের…।
-চুপ করো মাসী, আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। তবে একটা কথা শুনে রাখো…মানুষকে ছুঁলে মানুষের কোনদিন জাত চলে যায় না।
-তুমি বিদ্বান ছেলে, মাস্টার হয়েছে, এ তোমার কেমন কথা?
–এটাই আমার মনের কথা।
-তাবলে হাঁড়ি মুচি মেথর যে পারে সে আসবে? সরলামাসীর বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন জেগে উঠল।
-হ্যাঁ, হ্যাঁ সবাই আসবে। শুধু ব্রাহ্মণদের ছেলে-মেয়েরা আমার ছাত্র নয়, আমার ছাত্র সবাই। সবাই আমাকে ভালোবাসে। শ্রদ্ধা করে। অমলকান্তিবাবু থামলেন, ঢোক গিলে বললেন, তোমার যদি কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে তুমি কাজে আসবে না। কাল থেকে আমি আলাদা লোক দেখে নেব
