এই ইস্কুলের মাস্টার হয়ে আপনি এসব প্রচার করতে পারেন না। শিবনাথবাবু গলা চড়ালেন, মনে রাখবেন আপনি একজন শিক্ষক। একজন শিক্ষকের এই সমাজের উপর অনেক দায়িত্ব থাকে।
–আমি আমার সেই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছি।
-ঘোড়ার ডিম করছেন। শিবনাথবাবু দাঁত খিঁচিয়ে উঠলেন, আপনি যা করছেন সেটা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। গ্রামের মানুষ আপনার উপরে অসন্তুষ্ট। সেইজন্যই ওরা আপনাকে পণ্ডিত বিলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। নিশ্চয়ই ভুলে যান নি
-ভুলব কেন? মানুষকে বিজ্ঞান-সচেতনতার আলো দিতে চাই। তার বিনিময়ে এরকম কিছু তো আশা করা যেতে পারে। সবাই তো মানুষ হয় না। মানুষের মাঝখানে অনেক ভদ্রবেশী পশুও থাকে। অমলকান্তিবাবু কথা শেষ করে শিবনাথবাবুর দিকে তাকালেন।
রাগে ফেটে পড়লেন শিবনাথবাবু, আপনি আমাকে আকারে-ইঙ্গিতে পশু বললেন, আপনার সাহস তো কম নয়।
-আপনাকে পশু বলার আমি কে? দয়া করে ভুল বুঝবেন না!
-কলকাতার প্যাঁচ মারছেন? আপনাদের বিজ্ঞান মঞ্চ এখানে আর বাঁধার চেষ্টা করবেন না। শিবনাথবাবু হুঁশিয়ার করলেন, বিজ্ঞানের জয়গান করতে সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের বদনাম করবেন না। এখনও গায়ে-গঞ্জে মানুষকে ভূত-প্রেত ধরে। এখনও মানুষ পেতলের ঘড়া ভর্তি জল দাঁতে করে নিয়ে ছুটতে পারে।
–এরও বিজ্ঞান নির্ভর ব্যাখ্যা আছে। আসলে ভূতে ধরাটা একটা সাইকো-ডিজিজ। অমলকান্তিবাবু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, শিবনাথবাবু বাঘের মতো হুঙ্কার ছেড়ে তাকে আচমকা থামিয়ে দিলেন, চুপ করুন, আর বেশি বাড়বেন না। অনেক হয়েছে, এবার হিরোগিরিটা একটু কমান। এখানকার মানুষদের তো চেনেন না।
–এখানকার মানুষদের আমি চিনি। শুধু আপনাকেই আমি চিনতে পারিনি।
–তার মানে?
–মানেটা সহজ। সাপকে চেনা যায়, কেননা খোলস ছাড়ালেও সে সাপ থাকে। কিন্তু আপনি? অমলকান্তিবাবুর ঠোঁট জুড়ে বিদ্রুপের হাসি খেলে গেল। রাগে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হল শিবনাথবাবুর, ডান হাত উঠিয়ে তীব্র গতিতে তিনি থাপ্পড় কসিয়ে দিতে চাইলেন অমলকান্তিবাবুর গালে।
এমনটা আগে থেকেই আঁচ পেয়েছিলেন অমলকান্তিবাবু, তিনি হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেললেন লোমশ ভারী হাতটা। সজোরে মুচড়ে দিয়ে বললেন, এখন যদি এই হাতটা আমি মুচড়ে ভেঙে দিই তাহলে তিনমাস ছুটি লাগবে আপনার। কিন্তু আমি তা করব না। বরং সাবান দিয়ে আমার এই হাতটা ধুয়ে ফেলব কেননা এর আগে এমন ভয়ঙ্কর পাপী মানুষের হাত আমি কখনো ধরিনি।
কিছুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েন্স সেকশনের ছাত্র-ছাত্রীরা অমলকান্তিবাবুর দুঃসাহস দেখে হাততালি দিয়ে উঠল সজোরে। সেই হাততালির শব্দ কানে এল শিবনাথবাবুর। তার মনে হল এগুলো কোন শব্দ নয় যেন পাহাড়ী মৌমাছির আক্রমণের শব্দ। শুভ, মাধুরী লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিল, ওরা থেমে গিয়ে উত্তেজিত অমলকান্তিবাবুর মুখের দিকে তাকাল, পরিস্থিতির ভয়াবহতার আঁচ করে মাধুরী নীচু স্বরে শুভকে বলল, এই, চল, এখান থেকে সরে যাই। যা ঝামেলা হচ্ছে-এক্ষুনি হেড-স্যার এসে পড়বেন। আমাদের একসঙ্গে দেখলে খুব বকবেন।
দেখতে-দেখতে ভিড় জমে গেল চারপাশে। একটা চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে গেল সমস্ত ইস্কুলে। বিজ্ঞানের স্যার অমলকান্তিবাবু শিবনাথবাবুর হাত মুচড়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার আক্ষেপ করে বলল, মুচড়ে না দিয়ে যদি ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো হাতটা খুলে দিত তাহলে ভীষণ ভালো হোত।
সবুজ অনেক জানে বলে সবাই তাকে নিউটন বলে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল ছাদের উপর, শুভকে দেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, আজ যা হলো না ফার্স্ট ক্লাস। ওই বদমাশটা আমার বাবার গায়ে হাত তুলে ছিল। অথচ জানিস বাবার কোন দোষ ছিল না। লোকটার টাকা আছে বলে নিজেকে ভাবে শেরশাহ। আজ বুঝতে পারল বাবারও বাবা থাকে।
সবুজ কচি গোঁফের ঘাম মুছে নিয়ে শুভর দিকে তাকাল, জানিস শুভ, ভগবান ওকে ক্ষমা করে দিলেও আমি ওকে কোনোদিনও ক্ষমা করতাম না। আমি ভেবে রেখেছিলাম– চাকরি পেয়ে যে জিনিসটা প্রথমে কিনব তার নাম রিভলভার। আর সেই রিভলভার দিয়ে প্রথম যে গুলিটা বেরত সেটা শিবনাথবাবুর বুক এফোঁড় ওফোড় করে দিত। যাক আজ আমার রাগটা কিছুটা হলেও শান্ত হলো।
টিচার্স-রুম থেকে একে একে সবাই এসে দাঁড়িয়ে পড়েছেন দোতলার করিডোরে। ঘটনার আকস্মিকতার তারা সবাই হতভম্ব। শুধু বিস্মিত নয় শিবনাথবাবু, তিনি ধুতির কোঁচা সামলে দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, অমলকান্তিবাবু, ইস্কুল প্রেমিসেসে আপনি আমার হাতটা ধরে ভালো করলেন না। এর ফল দেরিতে হলেও আপনাকে পেতে হবে। আমি টাকা-পয়সা সোনাদানার লেন-দেন সব ভুলে যাই কিন্তু অপমানের বদলা নিতে ভুলি না।
মাঠের একপাশে রাখা ছিল শিবনাথবাবু কালো রঙের রাজদূত মোটর সাইকেল। এলোমেলো লাথি মেরে মোটর সাইকেলটা স্টার্ট দিলেন তিনি। পোড়া ধোঁয়ায় ভরে গেল সবুজমহল।
ধুলো আর ধুঁয়ো উড়িয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন অপমানিত শিবনাথ।
.
২৩.
স্কুলের উল্টো পিঠে জগতখালির বাঁধ, পোদ্দারদের আখের ভুঁই পেরলে শুরু হবে চর সুজাপুর-দোয়েম। গুয়েবাবলা গাছের মতো বাঁধের উল্টোদিকের গ্রামগুলো ম্যাড়মেড়ে ছড়ানো ছিটানো। নিত্য অভাব গিলে নিয়েছে ওদের আভিজাত্যের রসদ। তবু এই খাপছাড়া সৌন্দর্যের মধ্যে বিশাল প্রাণ শক্তি খুঁজে পান অমলকান্তিবাবু। প্রায়দিনই অবসর সময়ে তিনি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গ্রামের ধুলোয়।
