হেডমাস্টারমশাইয়ের কথা বলার ক্ষমতা ছিল না, তিনি ক্ষুব্ধ, অপমানিত। শিবনাথের ব্যবহার তাকে পীড়া দিয়েছে। গায়ে গতরে বড়ো হয়ে শিবনাথ নিজেকে ভাবছেটা কি?
শিবনাথ সেদিনের মতো চলে গেলেও আবার ফিরে এলেন এক সপ্তাহ পরে। প্রথমে স্কুলের নাইট-গার্ডকে দেখতে পেয়ে মুখে যা না আসে তাই বলে অপমান করলেন। নাইট-গার্ড রামদুলাল তার সামনে থেকে চলে যেতে চাইলে শিবনাথ তাকে বজ্রগলায় ধমকে উঠলেন, দাঁড়াও। পালাচ্ছো কোথায়? আচ্ছা রামদুলাল, তুমি কি ভেবেছ বল তো? স্কুলটা কি তোমার মামার বাড়ি?
–এসব কথা কেন বলছেন বাবু? রামদুলাল বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল।
শিবনাথবাবু আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, তুমি এই ইস্কুলের নাইটগার্ড। রাতে ঘুমিয়ে দিনের বেলায় নিজের কাজ করে বেড়াচ্ছো! বাঃ, তুমি তো দেখছি মহা ধূর্ত মানুষ।
শিবনাথ রামদুলালকে সতর্ক করল, এভাবে ফাঁকি দিলে আমি তোমাকে কাজে রাখতে পারব বলে দিচ্ছি। নাইট গার্ডের কাজ শুয়ে-বসে কাটানোর জন্য নয়। তুমি যদি মনে করো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মাইনে নিয়ে চলে যাবে–তাহলে মস্ত বড় ভুল করবে। আমার নজর সবখানে। আমার চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না।
দ্বীপী আর সূর্যাক্ষ নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। সূর্যাক্ষ দূর থেকে শিবনাথবাবুর গলা পেয়ে দ্বীপীকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে বলল, এই রে, শেয়ালটা আজ আবার ইস্কুলে এসেছে। আজ আবার হেড স্যারের ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাবে।
দ্বীপী হাসল না, কেমন গম্ভীর চোখে তাকাল, এসব মানুষ আমার পাল্লায় পড়লে আমি একেবারে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিতাম।
সূর্যাক্ষ বলল, মানুষ এত শয়তান হয় কী করে বলত? এত সুন্দর মাথায় মানুষ গু-গোবর ভরে নিয়ে কি করে হাঁটা চলা করে বলত?
দ্বীপী আশ্চর্য হল না, এরা হল জন্ম শয়তান। জানিস সূর্য, আমাদের এই সেক্রেটারি হেড-স্যারের ছাত্র ছিলেন। এখন এমন ব্যবহার করেন যে চেনেন না!
–যাদের চোখের পাতা থাকে না কেবল তারাই এমন ব্যবহার করতে পারে। সূর্যাক্ষ বলল।
দ্বীপী ভাবল, কোন জীবের চোখে পাতা নেই বলতো?
-কেন তিমি মাছ। যে সব মাছকে খায়। রাক্ষস! সূর্যাক্ষর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দ্বীপী এবার আর হাসল না, ঠোঁট কঠিন হয়ে উঠল ওর, তিমিমাছ শুধু মাছই খায় না, মানুষও খায়। ওদের থেকে সাবধান থাকা দরকার। চল, আমরা কেটে পড়ি।
দোতলার করিডোর লাগোয়া সায়েন্স ল্যাব। অমলকান্তিবাবু ব্যস্ত হয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসছিলেন হাতে একটা অ্যাপারাটাস নিয়ে। শিবনাথবাবু দোতলা বেয়ে তরতরিয়ে উঠে এসে অমলকান্তিবাবুকে দেখে হাত উঁচিয়ে ডেকে উঠলেন, এই যে মাস্টারমশাই, এদিকে একটু
অমলকান্তিবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন, মুখমণ্ডলে সৌজন্যতার সূক্ষ্ম প্রলেপ, নমস্কার।
-হ্যাঁ, নমস্কার! শিবনাথবাবু মুখ বিকৃত করে তাকালেন, আপনার ছুটির দরকার মানছি কিন্তু তা বলে দরখাস্ত না দিয়ে হুটহাট করে চলে যাবেন? ভেরি ব্যাড! আপনাদের দেখে ছাত্ররা শিখবে।
অমলকান্তিবাবুর মুখে ভুসোকালি বিছিয়ে গেল নিমেষে, সরি, হঠাৎ টেলিগ্রাম পেয়ে আমাকে চলে যেতে হল। বাবা ভীষণ সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল। বুঝতেই তো পারছেন–আমি বাড়ির বড়ো ছেলে।
-না, আমার বোঝার কোনো দরকার নেই। গমগমিয়ে উঠল শিবনাথবাবুর কণ্ঠস্বর। আপনার মামলা আপনিই সামলান। আপনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার আমার কোনো আগ্রহ নেই। তবে শুধু এইটুকু বলি–কাজটা আপনি ঠিক করেন নি।
–আপনি কি বলতে চাইছেন তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না! অমলকান্তিবাবুর মৃদু গলায় বিস্ময়।
-ন্যাকামী করবেন না। সব বুঝতে পেরেছেন। শিবনাথবাবু টানাটানা গলায় বললেন, মাসখানিক আগের কথা। কালীগঞ্জ বাজারে…সেই যে আপনার সঙ্গে দেখা হল, আপনি হাত নেড়ে নেড়ে আমাকে বোঝাচ্ছিলেন সাপে কামড়ালে মন্ত্র পড়ে রোগী বাঁচানো যায় না…আরও কত কী। এবার মনে পড়ছে? রুমাল বের করে শিবনাথবাবু কলাগাছের মতো মোটা গলার ঘাম মুছলেন।
মুখ ফাঁক করে শ্বাস নিয়ে অমলকান্তিবাবু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। বলুন কি বলতে চাইছেন?
-একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে গ্রামে এসব ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কি আপনার উচিত হচ্ছে? গ্রামের সহজ সরল মানুষ সাদা কালোর ফারাক বোঝে না, তারা আপনার এসব মহান কথার অর্থ বুঝবে কি করে? শিবনাথবাবুর খোঁচা দেওয়া কথায় অমলকান্তিবাবু নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকালেন। প্রসঙ্গটাকে আর বাড়ানো উচিত হবে কিনা ভাবলেন। শিবনাথবাবু মানুষটি সাপের চেয়েও ক্ষিপ্র এবং ধূর্ত। তার সঙ্গে সরাসরি তর্ক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া অনুচিত হবে। অমলকান্তিবাবু নিজেকে সংযমের বেড়ায় আটকে রাখতে চাইলেন, ওসব পুরনো কথা ছেড়ে দিন। বলুন আর কি বলতে চান?
ছেড়ে দেব মানে? শিবনাথবাবুর চোখ থেকে যেন আগুনের গোলা ঠিকরে এল, আপনি আগুন নিয়ে খেলতে চাইছেন, আর আমি সেখানে হাওয়া দেব–এটা আপনি ভাবলেন কি করে? আপনার স্পর্ধা তো কম নয়।
এবার আত্মসম্মানের দরজায় টোকা নয়, কেউ যেন কুঠারাঘাত করল, অমলকান্তিবাবু শিরদাঁড়া সোজা করে দীপ্ত স্বরে বললেন, সত্যি কথা বলাটা নিশ্চয়ই কারোর স্পর্ধার মধ্যে পড়ে না। আপনার কাছে যা মিথ্যে বা অবান্তর বলে মনে হয় তা যদি আমার কাছে সত্যি হয় তাহলে আপনার আপত্তি কোথায়?
