শিবনাথের প্রভাব প্রতিপত্তি এ গাঁয়ের অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। টাকার অহংকারে সে এখন মানুষকে মানুষ বলে ভাবে না। সবাইকে ভাবে তার দাসানুদাস। হাসপাতালের টিকেদারবাবুকে কী কথায় একটা চড় কসিয়ে দিলেন সজোরে। অপমানে লাল হয়ে গিয়েছিল টিকেদারবাবুর মুখখানা। চোখে জল এসে গিয়েছিল তার। জলভরা চোখে সে দেখেছিল ফোলা ফোলা গাল নড়িয়ে শিবনাথ বলছেন, চাকরি করে খেতে এসেছ, রাজনীতির কি বোঝে হে। খারাপ ভাল যা বলার আমরা জনগণ বলব। তোমরা সরকারী চাকুরে, সব সময় মাথা ঝুঁকিয়ে জনগণের সেবা করবে। সেবায় গাফিলতি দেখলে পাছায় লাথি মেরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ভাগিয়ে দেব।
শুভ সেদিন একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল ব্যাগ হাতে নিয়ে, সরস্বতী তাকে বাজার করার জন্য পাঠিয়েছে। এমন মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী না থাকলে বুঝি ভালো হত। এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য যত তাড়াতাড়ি মন থেকে মুছে যায় ততই ভাল। যে দৃশ্য মনের মধ্যে ভয়ের পেরেক পুঁতে দেয়, সেই দৃশ্য না দেখাই ভালো।
বাজার পাড়ার শিবনাথের সঙ্গে থানার বড়বাবুর ভীষণ জানা-শোনা। প্রায়ই থানার জিপটা এসে তার দোকানের সামনে দাঁড়ায়। বড়বাবু কাঠের চেয়ারে বসে চা খান। চা খাওয়া শেষ হলে লম্বা সিগারেট ধরিয়ে টান দেন। সিগারেট টানা শেষ হলে একটা চটের ব্যাগে খানকতক মদের বোতল ঢুকিয়ে জিপে তুলে দেয় শিবনাথের ছোকরা চাকরটা। আড়চোখে বোতলগুলো দেখে নিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দেন বড়বাবু। গাড়িটা ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাওয়ার পরেও হাঁ-করে তাকিয়ে থাকেন শিবনাথ। মানুষটার কোনো জবাব নেই। আশ্বিনের মেঘের মতো স্বভাব। এই রোদ এই বৃষ্টি, ওই মেঘ উতলা হাওয়া।
.
শিবনাথের চোখে মুখে বর্ষার ছাতুর মতো ফুটে ওঠে চতুরতা। কারোর সঙ্গে কথা বলার সময় সে নিজেকে বর্ণচোরা গিরগিটি অথবা ধূর্ত শেয়াল ভাবে। এই ভাবনাটা তার অন্যায় নয়। বুদ্ধি হবার পর থেকে তিনি মানুষকে ঠকিয়ে চলেছেন ধারাবাহিকভাবে। একাজে তার শরীরে কোন মায়াদয়ার জোয়ার-ভাটা খেলে না। আপে বাঁচলে বাপের নাম এই সিদ্ধান্তে অচল অনড়। পরের জন্য কাদা কিংবা কপাল ফাটানো তার স্বভাবে নেই। বরং আপনা হাত জগন্নাথকে বেশি সমীহ করতে ভালোবাসেন। ফলে কথা বলায় যে তিনি বাজারের এক নাম্বার এই তথ্য ঠারেবারে বুঝিয়ে দিতে কুণ্ঠিত বোধ করেন না।
এত বড়ো বাজারটা তার কথায় ওঠে, বসে। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তার উপস্থিতি আশু প্রয়োজন। তাকে এড়িয়ে বা গোপন করে বাজার কমিটির কোনো কাজ করার সাধ্য নেই।
মাছওয়ালি মাসিটা প্রতিদিন তাকে বাছাই করা মাছটা দিয়ে যায়, যদিও তাকে দাম মিটিয়ে দেন শিবনাথ, তবু প্রায় কথায় মাছের প্রসঙ্গ তুলে তিনি এক বিকৃত অনুভূতির আবেশ নিতে চান। বাজারের সেরা মাছটা ফলটা চালটা তার ঘরে না গেলে তিনি বেজায় রেগে যাবেন।
কালীগঞ্জ বাজারে শিবনাথের কথাটাই শেষকথা।
শুধু বাজার নয়, স্কুলেও তার আধিপত্য যথেষ্ট। অকৃতদার শিবনাথ ভাইয়ের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে কোর্ট থেকে লিখিয়ে নিয়েছেন। তাতে কালীগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট দু’জন ব্যক্তির সই আছে।
শুধু সইয়ের জোরে দাদার বড় ছেলে তার নিজের ছেলে হয়ে গেল। ইস্কুলের ভোটে দাঁড়াতে গেলে বেশ কিছু শর্ত তাকে পালন করতে হবে লোকলজ্জার ভয়ে। ব্যাপক ভোটে জিতেছেন শিবনাথ। তিনি জেতা মানে সেক্রেটারির পদটা একেবারে তার পাকা।
তিনি ছাড়া অমন রাশভারি পদে মানাবে কাকে? এমনিতে তার পঁচাশি কে.জির শরীরটা বয়ে নিয়ে যেতে কষ্ট হয় ভীষণ। বুকের কাছে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়, হাঁপিয়ে ওঠেন, ঘাম ফুটে ওঠে সারা শরীরে।
এই ইস্কুলে তার পড়াশোনা ফলে এই ইস্কুলের উপর তার আত্মিক টান বেঁচে আছে এখনও। ভাইয়ের ছেলের কাছে প্রতিদিন স্কুলের খবর পেয়ে যান তিনি। সে ছেলে ধানী লঙ্কা। পুটপুট করে হেড়মাস্টারের বিরুদ্ধে লাগায় জ্যাঠার কাছে। দুর্নীতির চাপা অভিযোগ হেডমাস্টারের বিরুদ্ধে ঠেলে ওঠে। সব জেনেও না বোঝার ভান করে পড়ে থাকেন কৃপানাথ। যে ছেলেকে হাতে ধরে পড়িয়েছেন শিখিয়েছেন সেই ছেলে এখন একাই একশো। হেডমাস্টার মশাই প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার শিবনাথ, হঠাৎ যে তোমার ইস্কুল চত্বরে আসা হল? কোনো কাজ আছে বুঝি?
না, তেমন কোন কাজ নয়। আমি স্কুলের সেক্রেটারি। মাঝেমধ্যে স্কুলে না আসলে আমার চলবে কি করে। শিবনাথ হেড-স্যারের দিকে বিরক্তির চোখে তাকালেন, আপনাদের হাজিরা খাতাটা একবার আনুন, আমি দেখতে চাই।
হেড-মাস্টারমশাই বাধ্য হন অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারটা এগিয়ে দিতে।
হাজিরা খাতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে শিবনাথ কপাল কুঁচকে তাকালেন, অমলকান্তিবাবুর হাজিরা খাতায় দুদিন সই নেই। কি ব্যাপার?
-উনি দু’দিন ছুটি নিয়েছেন। হেড মাস্টারমশাই বললেন।
–তাহলে আপনার লিভ মার্ক করা উচিত ছিল। শিবনাথবাবু কড়া গলায় বললেন কথাগুলো। হেডমাস্টারমশাই ঢোক গিললেন, উনি তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছেন। ওঁর বাবা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছেন। বাইপাস সার্জারি হবে।
–সব ঠিক আছে। তা বলে লিভ অ্যাপলিকেশন না দিয়ে চলে যাবেন? এত সাহস কোথা থেকে পান। আপনি দেখছি সবাইকে মাথায় তুলে রেখেছেন। ভেরি ব্যাডঃ শিবনাথ তিরস্কার করলেন, এবারের মতো ক্ষমা করে দিলাম। এরপরে যদি এমনটা দেখি তাহলে দুজনকেই আমি অ্যাবসেন্ট করে দেব।
