পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিকে বিদুর তাকিয়ে ছিল অধীর আগ্রহে। কপোতাক্ষও আশা করেছিলেন নির্বাচনের ফলাফল তাদের অনুকূলে যাবে। কিন্তু গ্রামসমাজের শম্বুক-গতি পরিবর্তন তাদের ব্যথিত করল।
লাবণি বিদুরকে বোঝাল, মন খারাপ করো না। আমাদের আরও মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে গেলে আমাদের হতে হবে তাদেরই লোক। নিজের মানুষ না হলে তাদের সমর্থন আমরা পাব কি করে?
.
ধুঁধুল গাছটা উঠে গিয়েছে কাঁটায় ভরা কুলগাছে। হলুদ আলোর ফুল ফুটেছে সবুজ ঘিরে। বাজারের একদিকটা সব সময় জমজমাট। বাঁধের কাছ থেকে ভেসে আসছে সব সময় গম-পিষানো মেসিনের শব্দ। চরসুজাপুর দোয়েমের মানুষরা ভিড় করে আসে গম পিষাতে। গম-পিষাতে এসে বাজার করে চলে যায়। কালীগঞ্জের মাটির হাঁড়ি-সরা-পাতনা সস্তা। দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। দশ-গাঁয়ের মানুষ আসে শাক-সবজি নিয়ে বেচতে। দামেও কম, পাওয়াও যায় টাটকা। এছাড়া সোম-শুক্র দেবগ্রামের ব্যাপারীরা দোকান দেয় ভূষিমালের। কেউ আবার কাপড়ের গাঁট খুলে ছড়িয়ে দেয় বাজারে। রেডিমেড পোশাকও পাওয়া যায় সেখানে। দরদাম করে দেখে-শুনে কেনা যায়।
হাটবারে বাঁধের কাছ থেকে ভিড় লেগে থাকে। বিদুর একটা জলচৌকির উপর দাঁড়িয়ে খালি গলায় বক্তব্য রাখে সেখানে। হাটের মানুষ বক্তব্য শুনতে চায় না, তবু কানে যতটুকু ঢেকে সেটুকুই বা কম কি। রাম একদিনে লঙ্কায় যাবার সেতু বাঁধতে পারেনি। বানরসেনার ভূমিকা সেখানে বিশেষ উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। শোনা যায় কাঠবেড়ালিও বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল সেতু বাঁধায়। বিদুরও সেইরকম কিছু একটা করে দেখাতে চায়।
লাবণি সবসময় তার সঙ্গে গাছের ছালের মতো আটকে আছে। অভাব-অনটন তাকে প্রতিজ্ঞা থেকে সরাতে পারে না। সংগঠনের কাজের জন্য সে নিবেদিত প্রাণ। ঘরে বসে খবরের কাগজের উপর আলতা দিয়ে সে স্লোগান লেখে যত্ন সহকারে। জেলা শহর কৃষ্ণনগরে সম্মেলন থাকলে তারা বুকে ব্যাচ লাগিয়ে লালগোলা ট্রেনে চেপে বসে। ট্রেনে গেলে যাওয়া-আসার ভাড়াটা বেঁচে যায়, সেই সামান্য অর্থটুকু বেঁচে থাকার জন্য কাজে লেগে যায়।
বিদুর লাবণির কষ্ট দেখে বোঝয়, সব মিটিংয়ে তোমার না গেলেও চলবে। আমি মিটিং থেকে ফিরে এলে তার সারাংশটা বলে দেব।
লাবণি মৃদু হাসলেও এই প্রস্তাব তার মনে ধরে না, তুমি খেলে আমার যদি পেট ভরে যেত তাহলে পৃথিবীতে হাঁড়ির সাইজ আরও ছোট হয়ে যেত। মিটিং মিছিল সম্মেলনে যে যাই-এতে আমার স্বার্থ থাকে। শীতের দিনে মানুষ আগুন পোহায় শীত লাগে বলে। সব মানুষেরই নিজেকে তাতিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন। ঠাণ্ডা মানুষ মানে তো মৃত মানুষ। এই মিটিং মিছিল আমার কাছে আগুন পোহানো।
সেদিন কালীগঞ্জ বাজারে বিদুরের সঙ্গে তর্ক বেঁধে গেল শিবনাথবাবুর। তার কাছে চাঁদা চাইতে গিয়েছিল বিদুর। শিবনাথবাবু স্পষ্ট মুখের উপর বলে দিলেন, কোনো ভিখারী পার্টির উপর আমার কোনো সহানুভূতি নেই। তোমরা কি ভেবেছ বলো তো বিদুর? কৌটো ঝাঁকিয়ে চাঁদা তুলে পুরো দেশটাকে কি ভিখারি সাজিয়ে দেবে? যাও ভাই, আমার মাথা গরম করে দিও না।
বিদুর রাগল না, দয়ার চোখে তাকাল, শিবনাথদা, একটা কথা বলি, খারাপভাবে নেবেন না। আমাদের দেশটা তো অনেক আগে থেকেই বিদেশের কাছে ভিখারি সেজে বসে আছে। ফলে আপনি আমি সবাই যে যার মতো ট্রেন্ড-ভিখারি। আমার কৌটো নাড়ানোতে আপনার যদি এত আপত্তি তাহলে নিজের জমিদারীটাকে সামলে রাখার জন্য সচেষ্ট হোন। নাহলে সরকারী নীতির মুখোশ খসে পড়লে আপনারা বিশেষত অসংশোধনবাদী সামন্তপ্রভুরা বিপাদ পড়বেন।
-সে যখন বিপদে পড়ব তখন দেখা যাবে। আগে মরি, তারপর তো ভূত হবার প্রশ্ন।
–আপনার বাঁধের ধারে যে জমিগুলো আছে–সেগুলোর দলিল সম্ভবত আপনার কাছে নেই। আমরা ভূমি ও রাজস্ব দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি। জেলা স্তরে এ নিয়ে আমাদের আলোচনাও হয়েছে। খুব শিঘ্রি আমরা খাসজমি দখলের অভিযানে নামব। আমরা কৃষিজমির সুবণ্টন এবং সমবণ্টন দাবী করেছি সরকারের কাছে। সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেলে আমাদের আন্দোলন লাগাতর চলতে থাকবে। বিদুরের কথা শুনে শিবনাথবাবুর মুখের গোলাপী আভা নিমেষে কাশফুলের আকার ধারণ করল। অতিরিক্ত চিন্তায় ধড়ফড়িয়ে উঠল তার বুক, কোনোমতে ঢোক গিলে বললেন, পুলিশ-প্রশাসন সব আমাদের দখলে। একটা ফোন ঘোরালে সব এসে পোষা পাখির মতো শিস দেবে। জানো তো টাকায় আজকাল কি না হয়? টাকায় এমন যাদুশক্তি আছে যা দিয়ে এ দুনিয়ার সব কিছু কেনা যায়।
–সব কিছু কেনা গেলেও মানুষ কেনা যায় না।
–যায় বিদুর যায়। তুমি ছেলেমানুষ। নতুন রাজনীতি করছ। কিছু বোঝ না। যখন রাজনীতিটাকে হজম করবে তখন তোমার ভেতরে একটা নিজস্ব নীতির জন্ম হবে। সেই নীতি তোমাকে বানের জলে ভাসা কচুরিপানার গাছের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তখন তোমার মিথ্যা আদর্শবোধ ঠাঁই পাবে না। তুমিও ভেসে যাবে। শিবনাথবাবুর কণ্ঠস্বরে জেদ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
আর কথা বাড়ায়নি বিদুর, চাঁদা না নিয়ে সে সোজা চলে এসেছিল পার্টি অফিসে। কালীগঞ্জ বাজারে শিবনাথের বন্ধকী কারবার, এছাড়া আছে সোনা-রূপার ব্যবসা। গ্রামের গরীব মানুষরা দায়ে পড়লে তার দারস্থ হয়, চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে চিন্তায় বুড়িয়ে যায় দ্রুত।
