বিষকৌটোর ঢাকনা খুলে মেয়েটি যখন চরম সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে তখনই বিদুর ছোঁ মেরে কৌটোটা কেড়ে নিয়ে ভৎর্সনার গলায় বলল, তোমাকে আমি গাঁয়ের সব চাইতে ভালো মেয়ে বলে জানতাম। আজ বুঝতে পারলাম-তোমার যা কিছু ছিল সব লোক দেখানো। আসলে একটা উইপোকার যা সাহস আছে–তোমার তা নেই। তুমি একটা ভীতুর ডিম।
–বিদুরদা, তুমি সব জানো না। জানলে একথা বলতে না। চোখের জলে গলার স্বরও আর্দ্র হয়ে উঠল লাবণির।
আমি সব জানি। দাদা আমাকে সব বলেছেন। বিদুর রাগে উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছিল, তোমার কী হয়েছে যে তুমি মরবে? তোমার যা ঘটেছে, এমন ঘটনা সারা দেশে হাজার হাজার মেয়ের ঘটছে। তা বলে তাদের সবাই তোমার মতো মরতে যায় না। ছিঃ!
লাবণি এই তোড়ের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। সে ঘাসের দিকে মুখ করে নীরবে চোখের জল ফেলে যায়। নিজের স্বপক্ষে তার একটা কথাও বিদুরের ক্ষুরধার যুক্তির কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
বিদুর আদেশ করা গলায় বলে, চলো, আমি তোমাকে ঘর অবধি পৌঁছে আসি। আজ যা পাগলামি করলে আর কোনোদিন যেন না শুনি এমনকথা।
-আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। তুমি কেন আমাকে বাঁচাতে চাইছ, বিদুরদা?
–মরার মধ্যে এমন কী বাহাদুরী আছে? বিদুর উষ্ণ চোখে তাকাল সেই উত্তাপে কুঁকড়ে গেল লাবণি, আমি আর ঘরে ফিরতে চাই না।
-কোথায় যাবে তুমি?
–আমি জানি না।
–আর পাগলামী করো না। রাত হচ্ছে। চলো বলছি। বিদুর ওর হাত ধরে টানল। লাবণি ম্প্রিংয়ের পুতুলের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আবার ধপাস করে বসে পড়ল মাটিতে। চোখের জলে গাল ভিজে যাচ্ছিল ওর।
বিদুর ব্যথিত। অবশেষে নিরুৎসাহিত হয়ে বলল, তুমি যা ভালো বোঝ কর। আমার কিছু ভালো লাগছে না। আমি ঘরে চললাম
দাঁড়াও। কান্নায় গলা বুজে এলেও কোনমতে লাবণি। বলল, আমি তোমার সাথে যাব। আমাকে নিয়ে চলো।
–আমার সাথে যাবে?
–কেন তোমার সাথে গেলে আমার কি হবে?
-তোমার জাত চলে যাবে। সারা হরিনাথপুরে ঢিঢি পড়ে যাবে। বিদুর তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল, তখন পারবে তো সহ্য করতে?
লাবণির বেতের মতো ছিপছিপে শরীরে একটা ঢেউ উঠল, ঘৃণায় বেঁকেচুরে গেল ওর গোলাপী ঠোঁট, চোখের মোলায়েম ভাবটা সরিয়ে সে রুক্ষু গলায় বলে উঠল, বেঁচে উঠেছি যখন তখন আর আমি মরার কথা ভাবব না। তুমি আমাকে আশ্রয় দাও।
চাইলেই সবকিছু পাওয়া যায় না, লাবণি। তুমি বড় হয়েছ। সব কিছু বুঝতে শিখেছে। এমন পাগলামী করো না। ঘরে চল। নিজের ঘরে ফিরে গেলে তোমাকে আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। বিদুর সাধ্যমতো চেষ্টা করল বোঝাবার। কিন্তু লাবণির কোনো কথা মাথায় ঢুকল না। এক অস্থির অবুঝ পাগলামী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালো।
অবশেষে লাবণির জেদের কাছে হার-মানতে বাধ্য হল বিদুর। সে রাতটা লাবণি বিদুরের ঘরে কাটিয়ে ফিরে গেল তার নিজের বাড়িতে। মাকে সবকিছু বলল সে। তারপর নিজের জিনিসপত্র নিয়ে চিরদিনের জন্য ঘর ছেড়ে চলে এল সে। তার মা সুর করে কাঁদল। সেই ছোঁয়াচে সুর মন গলাতে পারল না লাবণির। জীবনে অনেক ভুল হয়েছে তার। আর সে ভুলের পথে হাঁটতে চায় না। জাতপাতের পাঁচিলকে সে উপড়ে ফেলবে।
কপোতাক্ষর সামনে বিয়ে হয়ে গেল ওদের। কোনো মন্দির বা দেবালয় সাক্ষী থাকল না এই বিয়েতে, কেননা ছোটবেলা থেকে বিদুর এসব লোক-লৌকিকতার বাইরে।
লাবণিও সমর্থন করল তাকে।
লাবণি ঘোষ থেকে লাবণি রাজোয়ার হতে ওর সময় লাগে মাত্র দশ মিনিট। কপোতাক্ষ ওদের আশীর্বাদ করেন, সুখী হও তোমরা। সার্থক হোক–তোমাদের যৌথ প্রচেষ্টা।
.
ব্ৰহ্মণীতলার পঞ্চায়েত অফিসে বিদুর প্রায়ই যায় দলবল নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে। সেই দলের একেবারে অগ্রভাগে থাকে লাবণি। দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে তার জঙ্গি মনোভাব গ্রাম-প্রধান ডাঃ সত্যপ্রিয় সান্যালকে বেশ সমস্যায় ফেলে দেয়। তিনি বাধ্য হন মেহনতী মানুষের দাবিকে শ্রদ্ধা জানাতে।
খুব দ্রুত না হলেও একটা চাপা সমর্থন বিদুরের পক্ষে গড়ে উঠেছে। খাসজমি দখলের লড়াইয়ের সময়ে এই সত্যটা আরও বেশি করে প্রমাণিত হল।
সত্যপ্রিয়বাবু সেই প্রথম বিদুরকে চেয়ারে বসার অনুমতি দিয়ে বললেন, এই পঞ্চায়েত আমাদের সবার। এর সম্মান অটুট রাখার দায়িত্বও আমাদের। কোনরকম হঠকারিতায় আমরা যাব না। আমাদের সমস্যা আমরা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেব।
সত্যপ্রকাশবাবু ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। বিহার থেকে তিনি তার ডাক্তারি পাশের রেজিস্ট্রেশন জোগাড় করেছিলেন অধিক অর্থের বিনিময়ে। তা সত্ত্বেও তার চিকিৎসা ব্যবস্থায় গ্রামের সাধারণ অভাবী মানুষ উপকার পেত। তারা দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করত সত্যপ্ৰকাশবাবুকে। এইভাবেই তার জনপ্রিয়তা সেবার মাধ্যমে পৌঁছে গিয়েছিল শিখরে। সহজে তার আসন টলানোর ক্ষমতা ছিল না বিদুরের। রাজ্য-রাজনীতিতে তখন এক চরম সঙ্কটময় অবস্থা। দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার ধুকছে। শুরু হয়ে গিয়েছে পতনের পর্ব। জাল-জুয়াচুরি আর সন্ত্রাস থাবা মারছে রাজ্যের গ্রাম-শহরে। আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের হানায় ব্যতিব্যস্ত সর্ব শ্রেণীর মানুষ। কপোতাক্ষবাবু এই সময়টিকে বেছে নিলেন লড়াই করার জন্য। দুর্নীতি আর শাসক দলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল তার কণ্ঠস্বর। একটা পরিবর্তনের আলো চারদিক থেকে প্রতিফলিত হল আন্দোলনকারীদের চোখে-মুখে। গ্রাম-প্রধান সত্যপ্রিয়বাবু ভয় পেলেন না। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, আমি চাই সত্য এবং প্রকৃত ধর্মের জয় হোক। রাজনীতির উর্ধ্বে গুরুত্ব পাক মানুষ। আমি থাকব না, হয়ত আমার দলও থাকবে না, তা সত্ত্বেও আমি চাই এই পঞ্চায়েত-ব্যবস্থা বেঁচে থাকুক। গ্রামের মানুষের স্বার্থে এর প্রয়োজন আছে। আমার বিশ্বাস এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাই পারবে গ্রামকে কুসংস্কারমুক্ত করতে। এবং সুখের কথা একাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। বিদুর সেই দলের অগ্রণী নেতা।
