ইংল্যান্ডে অপুর বই প্রকাশ হইবার সঙ্গে সঙ্গে বেশ একটা সাড়া পড়িয়া গেল। বই প্রকাশ হইবার মাসখানেক পরে বিদেশ হইতে কাজলের নামে একখানা বড়ে পার্সেল ডাকে আসিল। পাঁচকপি বই প্রকাশক উপহার হিসাবে পাঠাইয়াছেন, সেই সঙ্গে লন্ডন টাইমস, বার্মিংহাম পোস্ট, লিটারারি টাইমস, লিভারপুল ডেইলি পোেস্ট, দি স্কটসম্যান, অক্সফোর্ড মেল ইত্যাদি কাগজে প্রকাশিত সমালোচনার প্রতিলিপিও পাঠাইয়াছেন। বিদেশের সাহিত্য-সমালোচকেরা অপুর বইয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছেন, বিশ্বের ধ্রুপদী উপন্যাসগুলির সহিত এ গ্রন্থ স্থান পাইবার যোগ্য সে কথা বলিয়াছেন। কেহ কেহ এত ভালো লেখা এতদিন কেন অনূদিত হয় নাই সেজন্য অভিযোগও করিয়াছেন। সবই ভালো, কিন্তু বই খুলিয়া কাজল অকস্মাৎ একটা ধাক্কা খালি।
বইখানার খণ্ডিত অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। প্রত্যয় চৌধুরী সিনেমায় উপন্যাসের যতখানি ব্যবহার করিয়াছেন ততটুকুই অনুবাদ হইয়াছে, শেষের ষাট-সত্তর পাতার পর্বটি বাদ।
এ কেমন হইল! শেষের ওই অংশেই তো লেখকের জীবনদর্শন আশ্চর্য সুষমায় ফুটিয়া উঠিয়াছে, যে গভীর দর্শন ও বোধের প্রতিষ্ঠার জন্য সমগ্র রচনার অবতারণা! এমনভাবে কাটিয়াছটিয়া অনুবাদ করিবার অধিকার সে তো কাহাকেও দেয় নাই।
প্রাথমিক বিহুলতা কাটিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার খুব রাগ হইল। তাহার বাবার অমন সুন্দর বই এভাবে নষ্ট করা! প্রকাশক একথা আগে জানাইলে সে কখনও ওই চুক্তিতে সই করিত না। ধ্রুপদী সাহিত্যের অঙ্গহানি করিবার অধিকার কাহারও নাই। বিদেশের পাঠকেরা বিরাট একটা জিনিস হইতে বঞ্চিত হইল।
অনুবাদের একটি কপি লইয়া একদিন সে দ্বিজেনবাবুর কাছে গেল। তিনি বই দেখিয়া বলিলেন—এঃ, একেবারে সব গোলমাল করে দিয়েছে। পণ্ডিতদের এইজন্য আমি ভয় করি, তাদের আদৌ কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। এই দেখ অনুবাদক ভূমিকায় কী লিখেছেন–The climax surely is reached when the little boy and his parents leave the village. The sister is dead, the cast has already broken up. With these considerations in mind we have ended the book with the boy looking out of the train window sobbing goodbyes to his
sister, his home and village. The film version also ended at this point. We wonder why the author was of another mind!
পড়া শেষ করিয়া দ্বিজেনবাবু কাজলের দিকে তাকাইয়া বলিলেন—এবার বুঝলে তো ব্যাপারটা? অনুবাদকের মনে হয়েছে ওইখানেই উপন্যাস শেষ হওয়া উচিত ছিল, আর সেই মনে হওয়ার সমর্থনে তিনি খাড়া করেছেন সিনেমার উদাহরণকে। সিনেমা আর সাহিত্য দুটো আলাদা শিল্পমাধ্যম, একটার সমর্থনে আর একটাকে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। সিনেমা থেকে কেউ সাহিত্যরচনা করে না, সাহিত্যকে অবলম্বন করেই সিনেমা তোলা হয়। অপূর্ব রায়ের মতো লেখকের রচনাকে এভাবে—আচ্ছা, এই প্রকাশকের সঙ্গে যে চুক্তি সই করেছিলে সেই কনট্রাক্ট-এর কপি আমাকে একবার দেখাতে পার?
প্রয়োজন হইতে পারে ভাবিয়া চুক্তিপত্রটি কাজল সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিল। পকেট হইতে বাহির করিয়া কাগজখানা সে দ্বিজেনবাবুর হাতে দিল। মনোযোগ দিয়া সেটি পড়িয়া তিনি বলিলেনতোমারও ছেলেমানুষি! একনম্বর, এটা কিন্তু পারপেচুয়াল কনট্র্যাক্ট হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ কতগুলো এডিশনের জন্য বা কত বছরের জন্য তুমি পারমিশান দিচ্ছ এতে তা কিছু লেখা নেই। দুনম্বর, মূল রচনাকে কোনভাবেই খণ্ডিত বা বিকৃত করা যাবে না এমন কোনো শর্ত তুমি দাও নি
—আমার মাথাতেই আসেনি কেউ এমন করতে পারে
—ঠিক। তুমি ছেলেমানুষ, অনভিজ্ঞ। আমাদের কাউকে একবার দেখিয়ে নেও উচিত ছিল। যাক, যা হবার তা হয়ে গিয়েছে—
—এই ভুল শোধরাবার কোনো উপায় কি নেই কাকাবাবু?
একটু ভাবিয়া দ্বিজেনবাবু বলিলেন—তুমি প্রকাশককে চিঠি দিতে পার এমন খণ্ডিত অনুবাদ প্রকাশের কারণ জানতে চেয়ে। তবে তাতে খুব একটা ফল হবে না, ওরা বলবে অনুবাদক যে কপি দিয়েছেন তাই ওরা ছেপেছে, আর অনুবাদকের স্বাধীন ইচ্ছামতো কাজ করবার অধিকার তো তুমি দিয়েই রেখেছ।
–তাহলে?
–অন্য একটা পথ আছে।বইটার সম্পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশ করবার জন্য তুমি অন্য কোনো প্রকাশককে অনুমতি দিতে পার। সেটা অবশ্য এক্ষুণি হবে না, কিন্তু একদিন হবেই। অপূর্ব রায়ের লেখার খ্যাতি এবং চাহিদা ক্রমেই বাড়বে। ভবিষ্যতে অন্য ভাষায় প্রকাশের সময় এ ভুল আর কোরো না। আমাদের দেশের কোনো ইংরেজি প্রকাশককে কেবলমাত্র ভারতবর্ষের জন্য একটি এডিশন করতে বলতে পারো। পাঠ্যবস্তু বা টেক্সট বদলে গেলে তা আলাদা বই হিসেবে বিবেচিত হবে—
কাজল বলিল—বিদেশের একজন বড়ো সমালোচক কিন্তু এ ব্যাপারটার নিন্দে করেছে। দেখুন। অক্সফোর্ড মেল-এ কী লিখেছে–
পত্রিকার প্রতিলিপিটি বাহির করিয়া সে দ্বিজেনবাবুকে পড়িয়া শোনাইল-The painstaking translators of this book have decided that the author was so simple that he did not know where best to end the book, so they have chosen a different point from him, the same point chosen by the director for the film. Well, the translators are scholars and must know what they are about, but the book is so well-written that to the laymen the author cannot have been all that simple. Western writers today know about non-communication, about sex, betrayal, murder, nervous disorder, but this Bengali writer, Mr. Roy, can teach them a thing or two about the basic.
