দ্বিজেনবাবু চোখ বুঁজিয়া শুনিতেছিলেন, এবার তাকাইয়া বলিলেন—যাক, কারও কারও তাহলে কাণ্ডজ্ঞান এখনো একেবারে নষ্ট হয়নি। শোনো কাজল, এ নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না। আমি যদি সত্যি সাহিত্য বুঝে থাকি, তাহলে অপূর্ববাবুর লেখা বহু-বহুদিন থাকবে। যখন তুমি কিংবা আমি থাকবো না, আমাদের পরবর্তী পাঁচ-দশ-পনেরো পুরুষ কেটে যাবে, ইতিহাস আর সমাজ সব বদলে যাবে, তখনও তোমার বাবার লেখা থাকবে। এর মধ্যে কত অনুবাদ হবে, কত নতুন এডিশন বেরুবে, আজকের এই ত্রুটি কেউ মনে রাখবে না। শিল্পের সমস্ত শাখার মধ্যে সাহিত্য সবচেয়ে দীর্ঘজীবী। উপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো—
জীবনটা নিজের ইচ্ছামতো সরলভাবে কাটানো ভারি কঠিন, প্রায়ই নানারকম ঝামেলা আসিয়া উপস্থিত হয়। মৌপাহাড়ি ছাড়িয়া আসিবার পর সেখানকার বাড়িটা কিছুদিন খালি পড়িয়াছিল, পরে এক বাঙালি ভদ্রলোক হৈমন্তীর অনুমতিক্রমে সেখানে বাস করিতেছেন। তিনি বলিয়াছিলেন–বৌদি, আমি গরিব ব্রাহ্মণ, বর্তমানে আশ্রয়হীন। আপনার বাড়িটা খালি পড়ে রয়েছে, আমাকে একটু থাকতে দেবেন? বাড়িটা এমনি পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে, দেখাশুনো করা প্রয়োজন। আমি কেয়ারটেকার হয়ে থাকব, আমাকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না, আমিও গরিব লোক— আপনাকে ভাড়া দিতে পারব না, গায়ে গায়ে শোধ হয়ে যাবে। আমার ছেলেটা নিজের পায়ে একটু দাঁড়িয়ে গেলে আর মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে আপনার বাড়ি আমি ছেড়ে দেব
এইরূপ ব্যবস্থায় হৈমন্তী আপত্তি করে নাই। কিন্তু যে ঝামেলা ঘরে আহ্বান করিয়া আনা হইল তাহার স্বল্প প্রকাশ হইতে তখনও দেরি ছিল।
মৌপাহাড়ির বাড়িতে বসবাসকারী ভদ্রলোকের মেয়ের বিবাহ হইয়া গেল, ছেলেটিও শহরের পাশে তামার কারখানায় মোটামুটি ভালো কাজ পাইয়া গেল, কিন্তু তিনি বাড়ি ছাড়িবার কোনো উদ্যোগ করিলেন না। প্রতি সপ্তাহেই, বিশেষ করিয়া ছুটির দিনগুলিতে, অপুর বাড়ি দেখিতে কিছু কিছু, ভক্তের দল যায়। তাহারা ভিতরে ঢুকিতে পায় না, বাহির হইতে বাড়িটার চেহারা দেখিয়া ফিরিয়া আসে। উঠানে হৈমন্তী একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করিয়াছিল, তাহাতে গ্রথিত একটি শ্বেতপাথরের ফলকে অপুর স্মৃতিতে নিবেদিত হৈমন্তীর লেখা কবিতা উৎকীর্ণ আছে। কেহ কেহ সেই স্তম্ভে মালা দিয়া যায়, ধূপকাঠি জ্বালিয়া দেয়। সাহিত্যিক অপূর্বকুমার রায়ের স্মৃতিরক্ষা যথাযথভাবে হইতেছে না বলিয়া ইহারা অনুযোগ করে, খবরের কাগজে চিঠি লেখে। বসবাসকারী ভদ্রলোককে হৈমন্তী বহুবার উঠিয়া যাইবার জন্য অনুরোধ করিয়াছে, কোনো ফল হয় নাই। ভদ্রলোক বিনীতভাবে কেবলই আরও কিছু সময় প্রার্থনা করেন। ওই বাড়িতে হৈমন্তীর একটি সংগ্রহশালা স্থাপন করিবার ইচ্ছা, সেখানে অপুর লিখিবার কলম, পাণ্ডুলিপি, জামাকাপড়, ব্যবহৃত অন্য দ্রব্যাদি ও ছবি থাকিবে। পাশের ঘরে লাইব্রেরি হইবে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের সংগ্রহ। কিন্তু এসব করিতে হইলে আগে তো বাড়িটা খালি হওয়া চাই।
পূজার কিছুদিন পরেই কাজল মৌপাহাড়ি যাওয়া স্থির করিল। চিঠি লিখিয়া সব কাজ হয় না। একবার নিজে গিয়া ভদ্রলোককে বলিয়া দেখিতে হইবে। হৈমন্তী কিন্তু সঙ্গে যাইতে চাহিল না। যেখানে তাহার সমস্ত পার্থিব সুখ আর শুরুর আনন্দ অকালে ঝরিয়া গিয়াছিল, সেখানে গেলে হারানো স্মৃতির সুতীব্র যন্ত্রণা তাহাকে দগ্ধ করিবে। একান্ত প্রয়োজন না হইলে সে আর মৌপাহাড়ি যাইবে না।
বম্বে এক্সপ্রেস যখন মৌপাহাড়ি পৌঁছাইল তখন বিকালের ছায়া ঘন হইতেছে। কাজল স্থানীয় হাইস্কুলের হেডমাস্টারের বাড়ি থাকিবে স্থির করিয়া তাহাকে আগেই পত্র দিয়াছিল। তিনি আন্তরিকতার সহিত কাজলকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। তাঁহার কাছে নিজের সুটকেসটি রাখিয়া সে উঁচুনিচু লালমাটির প্রান্তরের ভিতর দিয়া সুবর্ণরেখা নদীর দিকে চলিল। সন্ধ্যা নামিতে আর বিশেষ দেরি নাই, প্রথম হেমন্তের শীত শীত ভাব গায়ে কাঁটা ধরায়। দুরেব পাহাড় নীল দেখায়, কিন্তু আসন্ন সন্ধ্যার আরছায়াতে সিদ্ধেশ্বর ডুংরিকে ধূসর দেখাইতেছে। সুবর্ণরেখা নিজের বালুকাময় শরীর এলাইয়া প্রাঙ্গরের বুকে প্রসারিত। কাজল অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিল।
দিগন্তে মসীরেখার মতো ওই অরণ্য, ওই নিশ্চল পর্বতমালা, এই আকাশ-বাতাস নির্জনতা এবং প্রথম ফুটিয়া ওঠা দু-চারটি নক্ষত্র, এসবের মধ্যেই বিশ্বের প্রতি কণার ভিতর দিয়া প্রবহমান জীবনধারা লুকাইয়া আছে। এই বহিঃপ্রকৃতিই জীবন ও চৈতন্যের প্রকৃত ধাত্রী। নগরের উচ্চকিত কোলাহলে একধরনের ভাসমান তরল আনন্দ আছে বটে, কিন্তু তাহা মনকে সংস্থিত করে না।
কবে, বহুদিন আগে সে বাবার সঙ্গে এই রাঙামাটির পথে বেড়াইত। সময়ের বাঁকে ফেলিয়া আসা সেইসব স্মৃতি হেমন্ত-গোধূলির পরিবেশকে বেদনার রঙে ধূসর করিয়া তুলিয়াছে। নিতান্ত সাধারণ এবং পরিচিত সত্যও এক-একসময় মনের মধ্যে বিদ্যুতের আলোর মতো চমকাইয়া ওঠে, চেতনাকে অভিভূত করে। এই মুহূর্তে আসন্ন সন্ধ্যার আরছায়াতে সুবর্ণরেখার তীরে দাঁড়াইয়া তাহার মনে হইল-সে-সব পুরোনো দিন আর ফিরিবে না। সময়ের একমুখী স্রোত তাহার জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিনগুলিকে কোথায় ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে।
কী একটা দেরি করিয়া বাসায় ফেরা পাখি ডানা ছড়াইয়া নদীর এপার হইতে ওপারে চলিয়া যাইতেছে। কেহ কোথাও নাই, হঠাৎ এক আশ্চর্য অনুভূতিতে তাহার মন-কেমন করিয়া উঠিল।
