–বাঃ, ফোলিও এডিশন বের হওয়া তো খুব সম্মানের কথা। তোমাকে তারা নিশ্চয় বই পাঠাবে, হাতে পেলে দেখিয়ে যেয়ো।
প্রমথ বসু প্রুফ দেখা বন্ধ করিয়া তাহাদের কথা শুনিতেছিলেন, এইবার তিনি বলিলেনএকটা কথা কী জানো, আমার প্রায়ই মনে হয়—অপূর্ববাবু যদি আর একটু লম্বা আয়ু পেতেন, তাহলে ভারতবর্ষ আর একটা নোবেল প্রাইজ পেত–
দ্বিজেনবাবু বলিলেন—সে আমারও বিশ্বাস। তবে তাতে কিছু এসে-যায় না। স্বয়ং টলস্টয় নোবেল প্রাইজ চালু হবার পরও বারো-তেরো বছর বেঁচে ছিলেন, তিনি ও প্রাইজ পান নি। এরিখ মারিয়া রেমার্ক পান নি, সমারসেট মম পান নি–তাতে কি তাদের সাহিত্যের মূল্য কমে গিয়েছে না পাঠক আর তাদের বই পড়ে না? আবার এমন অনেক লেখক আছেন, যাঁরা নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, কিন্তু তাদের নাম লোকে ভুলে গিয়েছে, তাঁদের বই আর কেউ পড়ে না
কাজল বলিল—ঠিকই। হ্যালডর কিলিয়ান ল্যাক্সনেস, ফ্রাসোয়া এমিল সিলানপা কিংবা পার ফেবিয়ান লাগেৰ্কভিস্ট-এর লেখা আজ আর কে পড়ে? লেখার নিজস্ব মূল্যই লেখাকে বাঁচিয়ে রাখে, পুরস্কারে কী এসে যায়? বাবার এই পাঠকেরা চিরদিন আগ্রহ করে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস।
দ্বিজেনবাবু বলিলেন–তুমি আজ এসে পড়েছ, ভালোই হয়েছে। একটা জরুরি প্রয়োজনে তোমাকে চিঠি লিখব ভাবছিলাম
-কী কাকাবাবু? কোনো দরকার ছিল আমার সঙ্গে?
—হ্যাঁ। আচ্ছা অপূর্ববাবু তো নিয়মিত দিনলিপি রাখতেন বলে জানি, সেসব ডায়েরির সবগুলো তোমার কাছে আছে?
দশ-বারোটা রয়েছে কাকাবাবু। মার কাছে শুনেছি আরও কয়েকটা ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর জিনিসপত্র নিয়ে আসার সময় কিছু খোয়া যায়
—এ, বড়োই দুঃখের কথা!
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিবার পর দ্বিজেনবাবু বলিলেন—একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, বেশ ভেবে উত্তর দাও। তুমি তো সাহিত্যের ছাত্র, তোমার মতে অপূর্ববাবুর ডায়েরিগুলোর সাহিত্যমূল্য বা পাঠযোগ্যতা কতখানি? আমি ওগুলো ছাপতে চাই। তোমার কি মনে হয় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে এ বই পাঠকেরা কিনে পড়বে?
প্রশ্ন শুনিয়া কাজল কয়েক মিনিট ভাবিল। তারপর বলিল—আপনার প্রশ্নের দুটো অংশ কাকাবাবু, প্রথম অংশের উত্তর দেওয়াটা আমার পক্ষে সোজা। সাধারণ মানুষ যেভাবে ডায়েরি লেখে, বাবার দিনলিপি তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও ভ্রমণকাহিনীর মতো, কোথাও বা নাটকের স্বগত সংলাপের মতো, কোথাও আবার ভাষা এমন এক গভীরতার মধ্যে প্রবেশ করেছে যে, মনে হয় উপনিষদের বাংলা অনুবাদ পড়ছি। সাহিত্যমূল্য বা পাঠকযোগ্যতার দিক দিয়ে এসব রচনার মান খুবই উঁচু। কিন্তু পাঠকেরা কিনে পড়বে কিনা সেকথা আমি বলতে পারি না। অনেক রাবিশ বই প্রতিমাসে হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়, আবার অনেক ভালো বই পোকায় কাটে। এ বিচার আপনার। তবে রিস্ক এলিমেন্ট একটা আছেই।
দ্বিজেনবাবু চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলেন। প্রমথবাবু প্রুফ দেখা থামাইয়া তার দিকে তাকাইয়া ছিলেন, এবার বলিলেন—দ্বিজেন, আমার কিন্তু একটা কথা মনে হচ্ছে–
–কী?
–বইটা তুমি ছেপে ফেল। আমার বিশ্বাস পাঠকেরা এ বই নেবে। আর কাজল রিসক এলিমেন্টের কথা বলল, সে তো প্রকাশনের ব্যবসায় থাকেই। আমরা তো আর আলুকাবলি কিংবা চানাচুর বিক্রি করি না যে, মাঠের ধারে বসলেই হুহু করে সব বিক্রি হয়ে যাবে! প্রকাশনের কাজে অনেক ধৈর্য লাগে, অনেক সাহস লাগে–
দ্বিজেনবাবু কাজলের দিকে তাকাইয়া বলিলেন তুমি সামনের সপ্তাহে বাবার দু-তিনটে ডায়েরি নিয়ে চলে এস। কপি করাতে হবে। কপি করে অরিজিনাল তোমাকে ফেরৎ দিয়ে দেব।
এডিট করার দরকার আছে বলে মনে করো কি?
কাজল বলিল–কপি হয়ে গেলে আমাকে একবার দেখতে দেবেন, যদি কোনো অংশ বাদ দেবার প্রয়োজন হয়—আমি দেখবো এখন
—বেশ। তা কী বই পড়ছে এখন? দু-একখানা জমাট ভূতের গল্পের বই পড়াতে পারো? আমার কাছে পড়ার মতো তেমন বই নেই–
—এম. আর. জেম্স পড়বেন? ওঁর একটা সংকলন আছে, দিতে পারি।
–ওঃ, আমার খুব প্রিয় লেখক। কাল বা পরশু দিয়ে যেয়ো তো—
–জেমসের লেখা আপনার ভালো লাগে?
–খুব। এম, আর, জেম্স, ই, এফ, বেনসন, অ্যালজারনন ব্ল্যাকউড—এঁরাই তো অলৌকিক গল্পকে জাতে তুলে দিয়ে গেলেন। সমালোচকেরা ভূতের গল্পকে চিরদিন দ্বিতীয় শ্রেণির সাহিত্য বলে নাক কুঁচকে এসেছেন, এঁরাই প্রথম দেখালেন যে অলৌকিক গল্পও প্রথম শ্রেণির সাহিত্যপদবাচ্য হতে পারে। হেমেন রায়ের বাজলে বাঁশি কাছে আসি তো নিশ্চয় পড়েছে, ওটা জেমসের ও হুইসল, অ্যান্ড আই উইল কাম টু ইউ, মাই ল্যাড-এর অনুবাদ। কিংবা কাস্টিং দি বুস্-ওঃ, দারুণ গল্প!
একটু থামিয়া বলিলেন–তবে আসল জিনিস হচ্ছে ডিকেন। যতবার পড় কোনো ক্লান্তি আসবে না। প্রথম দিকটা একটু কষ্ট করে পড়তে হয়, এই ধর—একশো-দেড়শো পাতা, তারপর আর ছাড়তে পারা যায় না। সেকালের লেখক, সে যুগে রেওয়াজই ছিল বড়ো বড়ো বই লেখা। লোকের অবসর ছিল অনেক, মনে শান্তি ছিল, অরিয়ে সরিয়ে বই পড়বার অবকাশ ছিল। সে সব দিন ফিরে পাবে, ডিকেনস্ পড়–
এক-একটা কথা মানুষের মনে চিরদিনের জন্য গাঁথিয়া যায়। দ্বিজেনবাবুর এই পরামর্শ সারাজীবনের জন্য কাজলের মনে মুদ্রিত হইয়া গেল। পরবর্তীকালে সে ডিকেসের রচনাবলী প্রায় সব পড়িয়া ফেলিয়াছিল—পড়িবার সময় প্রায়ই তাহার দ্বিজেনবাবুর কথা মনে পড়িত। অনার্সে এবং এম.এ.-তে ডিকেনস্ পাঠ্য ছিল বটে, কিন্তু তখন পরীক্ষার ভয়ে বাধ্য হইয়া পড়িতে হইয়াছিল, গভীর রসোপলব্ধির সুযোগ ঘটিয়া ওঠে নাই। এখন ভালো করিয়া পড়িয়া তাহার মনে হইল তাহার বাবার লেখার সহিত ডিকেনসের রচনার একটা মূলগত ঐক্য রহিয়াছে। মানবিকতায়, জীবনের সদর্থক ও আশাবাদী রূপের উদঘাটনে দুজনে একই কথা বলিয়াছেন। বরং তাহার বাবার সাহিত্য যেন আরও গম্ভীর, আরও স্নিগ্ধ এবং সরল, তাহা দুঃখকে ভুলিবার পথ দেখায় না, মৃত্যুকে জয় করিয়া জীবনের প্রতিষ্ঠা সম্ভব করে।
