জীবনে এই প্রথম সে মা কথাটার তাৎপর্য বুঝিতে শুরু করিয়াছে।
১৮. একদিন সকালের ডাকে
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
একদিন সকালের ডাকে এয়ারমেলের লাল-নীল বর্ডার দেওয়া খামে ব্রিটেনের ডাকটিকিট সাঁটা একখানা চিঠি আসিল। কাজলের নামে চিঠি। চিঠিটা হাতে লইয়া প্রথমে কাজল আন্দাজ করিতে পারিল না কে এই চিঠি লিখিতে পারে। বিলাতে তাহার বন্ধুবান্ধব কেহই নাই, আত্মীয়স্বজন তো দুনিয়াতেই কেহ নাই।
খাম খুলিয়া দেখিল লন্ডনের এক প্রখ্যাত প্রকাশক চিঠি লিখিতেছে–অপুর প্রথম উপন্যাসটি, যেটি লইয়া প্রত্যয় চৌধুরী ছবি করিয়াছিলেন, সেটি তাহারা অনুবাদ করিয়া প্রকাশ করিতে চায়। কপিরাইট সংক্রান্ত অনুমতি পাইলে তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন অধ্যাপককে দিয়া (একজন ভালো বাংলাজানা খাঁটি সাহেব এবং একজন কৃতবিদ্য প্রবাসী বাঙালি) অনুবাদের কাজ শুরু করাইতে পারে। ব্যবসায়িক শর্তাদিও তাহারা চিঠিতেই জানাইয়াছে।
চিঠি পড়িয়া কাজলের খুব আনন্দ হইল। হ্যাঁ, অনুমতি সে পাঠাইয়া দিতেছে। আর ব্যবসায়িক শর্ত? টাকার জন্য তাহার লালসা নাই। পাইলে ভালো, না পাইলেই বা কী? তাহার বাবাব নাম তো বিদেশে ছড়াইয়া পড়িবে। এত ভালো লেখা তাহার বাবার, পৃথিবীর সকলে পড়ক, পড়িয়া অবাক হউক।
কাজল তাহার জীবনে এই প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর কবিল।
টাকা ছাড়াও একটি চুক্তির আরও অনেক দিক থাকে, অনভিজ্ঞতাবশত কাজল সে সব কিছু খেয়াল করিল না। সই করিয়া ডাকে কাগজ পাঠাইয়া দিল। এব ফল পরে তাহাকে বেশ ভালোভাবেই ভুগিতে হইয়াছিল।
তাহার এক সাংবাদিক বন্ধুকে কাজল ঘটনাটি বলিয়াছিল, চুক্তিপত্রের একটা নকলও দেখাইয়াছিল। দুই-তিনদিন পরে তাহাদের কাগজে অপুর বইয়ের অনুবাদ হওয়ার খবরটা বেশ বড়ো করিয়া বাহির হইল। বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতরা পথেঘাটে কাজলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল—তোমার বাবার বই দেখলাম বিদেশে অনুবাদ হয়ে বেরুচ্ছে? বাঃ বাঃ, বেশ
কলিকাতায় এবং মফঃস্বলের কয়েক জায়গায় অপুর স্মৃতিতে সভা হইয়া গেল। দু-একটা সভায় আমন্ত্রণ পাইয়া কাজল যোগ দিতে গিযাছিল। বেশ ভিড়, শ্রোতারা আগ্রহের সঙ্গে বসিয়া বক্তৃতা শুনিতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ অধ্যাপক বলিলেন—অপূর্বকুমার রায়ের বই যে বিদেশে অনুবাদ হইতেছে, ইহা অত্যন্ত সময়োচিত হইয়াছে। এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যে অন্য এমন কেহ নাই যাঁহার রচনা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে পেশ করা যাইতে পারে। দুর্ভাগ্য এই, অপূর্বকুমার অকালে গত হইলেন। তিনি বাঁচিলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধতর হইত।
কাজলকেও বলিবার জন্য আহ্বান করা হইল। সে বাবার সাহিত্য বিশ্লেষণ করিল না, অপুর ব্যক্তিগত জীবনচর্যার কথা বলিল। লেখা পড়িয়া লেখককে যেমন মনে হয় এক্ষেত্রে লেখক ঠিক তেমনই ছিলেন। সাহিত্যিকসত্তা ও ব্যক্তিসত্তায় কোনো পার্থক্য ছিল না—একই রকম উদার, মহৎ ও গভীর। বাবার সহিত তাহার হোটবেলা কেমন কাটিয়াছিল, তাহার কিছু গল্প বলিল। সে আগে কখনও ঠিক এভাবে কোনো সভায় আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দেয় নাই। প্রথমদিকে সামান্য জড়তা এবং সংকোচ বোধ করিতেছিল, কিন্তু মিনিট পাঁচ-ছয় বলিবার পর সে জড়তা কাটিয়া গেল। বাবার সম্বন্ধে কত কথা বলিবার আছে যে! তাহার সেই হারানো শৈশব—বাবার সাহচর্যে যাহা অমৃতময় হইয়া উঠিয়াছিল, সে কথা বলিতে আর সংকোচ কিসের? প্রায় চল্লিশ মিনিট সে বলিল।
সভা শেষ হইবার পর অনেকেই আসিয়া তাহাকে অভিনন্দন জানাইয়া গেল। একজন বলিল—আপনাব বলার ধরন ভারি সুন্দর, আরও বললেন না কেন?
কাজল হাসিয়া বলিল–বাবার কথা আমি সারাদিন ধরে বলতে পারি, কিন্তু আপনাদের সভা তাহলে আর সফল হত না, সব্বাই পালাতে
–না না, ও আপনার ভুল ধারণা। সবাই অপূর্ববাবুর কথা আরও শুনতে চাইছিল। তঁার বই তো ইচ্ছে করলেই বাজার থেকে কিনে পড়া যায়, কিন্তু তার জীবনের গল্প তো আপনজন ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। আমরা সামনের মাসে একটা বড়ো সভার আয়োজন করব, সেখানে এই অঞ্চলের দশ-বারোটা হাইস্কুলের ছাত্রদের ডেকে আনব। সৎ সাহিত্য আর নিজের দেশের সংস্কৃতির বিষয়ে অল্প বয়েস থেকেই সবাইকে সচেতন হতে হবে। সেই সভায় আপনি বাবার জীবন ও সাহিত্য সম্বন্ধে বলবেন–আসবেন তো?
কাজল বলিল–বেশ তো, আমাকে জানাবেন—নিশ্চয় আসব।
—আপনি এত সুন্দর বলেন কী করে?
—ওটা আমার গুণ নয়, আমার ঠাকুরদাব গুণ। রক্তের মধ্যে দিয়ে আমার কাছে একটুখানি এসেছে। ঠাকুরদা হরিহর রায় কথক ছিলেন, গান লিখতেন, আবার নিজে সুর দিয়ে গাইতেন। নাতি হিসেবে তারই একটু পেয়েছি–
একদিন দুপুরে সে ‘বসু ও গুহ’ পাবলিশার্সের অফিসে গেল। এখনও আড্ডাধারীদের ভিড় জমিতে শুরু করে নাই। সবুজ কেদারাটিতে দ্বিজেন্দ্র গুহ গা এলাইয়া কী যেন পড়িতেছেন। পাশের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়া প্রমথ বসু প্রুফ দেখিতেছেন ও মাঝে মাঝে আশান্বিত চোখে দ্বিজেনবাবুর দিকে তাকাইতেছেন। একবার বন্ধু কোনো কাজে উঠিলেই হয়, সঙ্গে সঙ্গে কেদাবাটি তিনি দখল করিবার সুযোগ পাইবেন।
তাহাকে দেখিয়া দুইজনেই খুশি হইলেন। দ্বিজেনবাবু বলিলেন–বোসো, অনেকদিন পরে এলে এবার। কাগজে দেখলাম তোমার বাবার বই ইংবেজিতে অনুবাদ হচ্ছে—
—আজ্ঞে হ্যাঁ কাকাবাবু, জর্জ অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন প্রকাশ করছে। একটা ফোলিও এডিশন বেরুবে বলেও লিখেছে লন্ডন বুক ক্লাবের উদ্যোগে–
