কেবল দুই-একটি সংবাদপত্রের সমালোচকেরা অধমনস্ক গোছের প্রশংসার কবিলেন। কলিকাতায় কয়েক জায়গায় বোদ্ধা দর্শকের দল প্রত্যয় চৌধুরীকে সম্বধনা দান করিল। তাহাতেও বাজার গরম হইল না।
কাজল কিন্তু বুঝিল ছবি ভালো হইয়াছে। লোকে দেখিল না, সে আর কী করা যাইবো ভালো শিল্পের রসিক চিবকালই কম। একদিন সে হৈমন্তীকে বলিল—মা, তুমি মনে দুঃখ রেখো না, তুমি ঠিক কাজই করছে। বাবার গল্প এভাবেই ছবি হওয়া উচিত ছিল। নাচ-গান-কান্না না থাকলে আমাদের দেশে ছবি কেউ দেখে না। প্রত্যয়বাবু ভালো কাজ করেছেন, আস্তে আস্তে লোকে নেবে দেখো
মায়ের মনে যাতে দুঃখ না হয় সেজন্য তখনকার মতো কাজল একটা কথার কথা বলিয়াছিল। কারণ সে জানিত ফিলম জিনিসটা ছাপা বইয়ের মতো না। বিলিজ হইবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি ছবির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হইয়া যায়। হয় মানুষ সেই ছবিটি গ্রহণ করে, নয়তো উপেক্ষার অন্তরালে সরাইয়া দেয়। সাহিত্যিকের মৃত্যুর একশত বৎসর পরেও তাঁহার রচনার পুনর্মূল্যায়ন হইতে পারে, কিন্তু উপেক্ষিত ফিলম দশ বৎসর বাদে আবার সচরাচর দর্শকের মনোযোগের আলোয় আসে না।
কিন্তু কাজলের ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করিয়া, দর্শক ও সমালোচকের উপেক্ষাকে উপহাস করিয়া এক্ষেত্রে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যয় চৌধুরীর বংশের একটা খাতি ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের সঠিক স্থানে অবস্থিত কয়েকজন সচেষ্ট হওয়ায় ছবিটি বিদেশের কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে দেখাইবার ব্যবস্থা হইল।
এরপর যা ঘটল তাহাকে বাস্তব ঘটনা না বলিয়া রুপকথা আখ্যা দিলেই ভালো হয়। প্রত্যয় চৌধুরীর ছবি বিদেশে পরপর তিনটি উৎসবে শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল হিসাবে খ্রথম পুরস্কার পাইল। ইউরোপের বড়ো বড়ো সব কাগজে ফিল্মের স্থিরচিত্র ও প্রত্যয় চৌধুরীর ছবি বাহির হইল। দেশের যেসব কাগজ এতদিন বিশেষ কোনো উৎসাহ প্রকাশ করে নাই তাহারা প্রত্যয়বাবুর ছবিসহ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করিল। সমালোচকেরা বলিলেন ছবিটির অসাধারণত্ব তাহারা আগেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন, উপযুক্ত তথ্য ও মালমশলা সংগ্রহ করিয়া তাহারা বড়ো বড়ো প্রবন্ধ লিখিবার উদ্যোগ করিতেছিলেন, এইবার সেগুলি প্রকাশিত হইবে। অনেকে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়া ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া আসিল। প্রত্যয় চৌধুরী কয়েকটি উৎসবে যোগ দিতে বিদেশে গিয়াছেন, দুই মাসের আগে ফিরিবেন না।
কৌতূহলী হইয়া কাজল দেশী-বিদেশী কিছু কাগজ সংগ্রহ করিয়া পড়িল। সকলেই লিখিয়াছে গ্রামের এমন চিত্র, প্রকৃতির এমন বিশ্লেষণ, নিম্নবিত্ত সংসারে একটি ভাবুক শিশুর বিকশিত হইয়া ওঠা-চৌধুরী ছাড়া এমনটি আর কেহ পারেন নাই।
কাজলের মনটা খারাপ হইয়া গেল। বেশ মজা তো! উহারা অপুর নামের কোনো উল্লেখ কোথাও করে নাই। গ্রামের নিপুণ চিত্র, শিশু-মনস্তত্ত্ব—এসব প্রশংসা তো তাহার বাবার প্রাপ্য। তাহার বাবা উপন্যাস না লিখিলে সিনেমার গল্পটা আসিত কোথা হইতে? হ্যাঁ, পরিচালকের অবশ্যই প্রশংসা প্রাপ্য যথেষ্টই প্রাপ্য, কিন্তু লেখককে যে সবাই একেবারে ভুলিয়া গেল! এ কী রকম ব্যাপার?
পরে অবশ্য তাহার মনে হইল প্রথম উৎসাহের জোয়ারে সবাই এমন করিতেছে, প্রাথমিক উল্লাস স্তিমিত হইলে সত্য আপনিই স্পষ্ট হইয়া উঠিবে।
একদিন প্রায় চৌধুরীর ছবির উপর আয়োজিত এক আলোচনার সভায় সে যোগ দিতে গেল। আমন্ত্রণ পাইযা যায় নাই, সভা হইবে খবর পাইযা ব্যাপার দেখিতে গিয়াছিল। দরজায় কেহ আটকাইতেছে না দেখিয়া সে পায়ে পায়ে ঢুকিয়া পড়িল। শ্রোতায় সভার ঘর আধাআধিরকম ভর্তি হইয়া গিয়াছে। কাজল পেছনের দিকে বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েসের চালাক চেহারার একজন লোকের পাশে বসিল। লোকটি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল–আপনি কোন্ কাগজ থেকে এসেছেন?
কাজল বুঝিতে না পারিয়া বলিল—আমাকে কিছু বলছেন?
-হ্যাঁ। আপনি কোন কাগজের রিপোর্টার?
কাজল হাসিয়া বলিল—কোনো কাগজেরই না। আমি ফ্রিল্যান্সার।
লোকটি অবাক হইয়া বলিল—তাই নাকি? আশ্চর্য তত! আমার ধারণা ছিল ফ্রিল্যানসার কেবল বিদেশেই আছে। এখানেও হয়েছে জানতাম না। আপনি কী অনেক দিন থেকে–
–না, এই তো মাসকয়েক হল—
–ওঃ, তাই বলুন। তা না হলে তো খবর পেতাম।
এমন সময় একজন বক্তা উঠিয়া বলিতে শুরু করা কথাবার্তা থামিয়া গেল।
এখানেও একই ব্যাপার। মূল উপন্যাসটির নামও কেহ উচ্চারণ করিলেন না বা ছবিব সাফল্যের পেছনে অপুরও যে সমান অবদান আছে সে কথা সবাই ভুলিয়া গেল। সভার শেষে বাহির হইতে হইতে কাজল তাহার সঙ্গীকে বলিল—কী ব্যাপার বলুন দেখি, ফিল্ম তৈরি করতে তো একটা ভালো গল্প লাগে, বলা যেতে পাবে সেটাই প্রাথমিক শর্ত—এঁরা কেউ তো লেখকের কথা বললেন না?
লোকটি অন্যমনস্কভাবে বলিল—আঁ? হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। আচ্ছা প্রত্যয়বাবুর ডিটেলের ব্যবহার লক্ষ করেছেন? গ্রামকে দেখার কী চোখ!
–কিন্তু সেটা লেখক লিখেছেন বলেই তো-তাছাড়া ক্যামেরা কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তাও প্রত্যয় চৌধুরী দেখিয়ে দিলেন। নবযুগ মশাই, নবযুগ—
কাজলের সঙ্গী বিহুল, মুগ্ধ অবস্থায় বিড়বিড় করিতে করিতে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তা পার হইয়া চলিয়া গেল।
কলিকাতার কয়েকটি সিনেমা হলে ছবিটি নতুন করিয়া দেখানো শুরু হইল। ভিড়ের চোটে হলের সামনে রাস্তা দিয়া চলা যায় না। অথচ এই একই ছবি কিছুদিন আগে কেহ দেখে নাই। সাহেবরা প্রশংসা না করিলে কী আর এদেশে কোন জিনিসের কদর হয়? শহরের অনেক জায়গায় ফিলম্টির পোস্টার কাজলের চোখে পড়িল। সর্বত্রই লেখা আছে—প্রত্যয় চৌধুরীর মহান ছবি। লেখকের নাম পোস্টারে কোথাও নাই।
