হৈমন্তী হাসিয়া বলিল—মিত্ৰমশাই, আপনি তো জানেন আমার স্বামী তার এই বইটিকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। ওঁর ধারণা ছিল—এবং আমারও ধারণা—এ বইয়ের ছবি করা যায় না। অনেক পরিচালক এসে গল্পের স্বত্ব কিনতে চেয়েছেন, তাদের আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। টাকার জন্য কী সন্তানকে বিক্রি করা যায়, বলুন?
ত্রিদিব মিত্র বলিলেন–আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। টাকার জন্য এ কাজ করলে আপনার অখ্যাতি হত। তবে ছবি করা যায় না এ কথা ঠিক নয়। করা কঠিন, কিন্তু করা যায়। ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে এ বই থেকে একটি অসাধারণ ফিলম হতে পারে।
-উনি এর আগে কী কী ছবি করেছেন?
—কোনো ছবিই করেনি। এটাই ওর প্রথম উদ্যোগ হবে। তাছাড়া ওর টাকাও নেই, কাজেই টাকার লোভে আপনি স্বত্ব দিচ্ছেন এ অপবাদও কেউ দিতে পারবে না।
–টাকার অসুবিধে থাকলে উনি ছবি করবেন কীভাবে? ফিলম তুলতে তো শুনেছি অনেক টাকা লাগে।
এবার প্রত্যয় চৌধুরী নিজে উত্তর দিলেন। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ। কথা বলিবার এমন একটি অ-ত্বরিত ভঙ্গি আছে যাহাতে বক্তব্যের সমীচীনতা স্পষ্ট হইয়া ওঠে। তিনি বলিলেনএ ছবিতে খুব বেশি খরচ হবে না। দামি নায়ক-নায়িকা বা অভিনেতা কাউকেই আমার প্রয়োজন নেই। শুটিং হবে গ্রামে, শক্ত হাতে বাজেট করে নেব। আমার সামান্য কিছু জমানো টাকা আছে। তারপর দরকার হলে স্ত্রীর গয়না আছে, সেগুলো
হৈমন্তী প্রত্যয় চৌধুরীর দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—আপনি এই ফিলমে গান রাখছেন তো?
কিঞ্চিৎ অবাক হইয়া প্রত্যয় চৌধুরী বলিলেন—গান? কোন্ সিচুয়েশনে?
-কেন, নায়কের বোনের মৃত্যুদৃশ্যে? সেখানে গান থাকবে না?
হৈমন্তীকে দেখিয়া এবং তাহার সঙ্গে কথা বলিয়া প্রত্যয় চৌধুরীর বোধহয় একটা সমপূর্ণ মনোভাব জন্মিয়াছিল, গানের প্রস্তাব শুনিয়া তাঁহার মুখে বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল। হৈমন্তী বলিল– আগে যেসব পরিচালকেরা এ ছবি করতে চেয়েছেন তাঁরা কিন্তু গান বাখার কথা ভেবেছিলেন। তাই—
প্রত্যয় চৌধুরী হাসিলেন।
কথা একদিনে শেষ হইল না। নিজের সহজ বুদ্ধিকে প্রয়োগ করিয়া হৈমন্তী বুঝিতে পারিয়াছিল এই মানুষটি অন্য সকলের মতো নয়। কিন্তু সে দীর্ঘদিনেব দ্বিধা কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিল না। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত আছে যাহা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হইয়া অন্য কেহ গ্রহণ কবিলেই ভালো হয়। হৈমন্তীর তেমন কোনো গুরুজন নাই। সে অনেক ভাবিল। বিঝুদ্ধে ও সপক্ষে যুক্তিগুলি মনের মধ্যে সাজাইয়া দেখিল, কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তে আসিতে পাবিল না।
ত্রিদিব মিত্র ও প্রত্যয় চৌধুরী কিছুদিন বাদে-বাদেই আসাযাওয়া করিতে লাগিলেন। হৈমন্তী বুঝিল এ প্রসঙ্গ আর বেশিদিন মুলতুবি রাখা যাইবে না। জীবনে কোনো কোনো বিষয়ে ঝুঁকি লইতেই হয়। সম্ভাব্য পরিণতিগুলির মধ্যে যেটির সবচেয়ে সফল হইবার সম্ভাবনা সেটিকে নির্বাচন করিয়া অগ্রসর হওয়াই ভালো। একদিন ছবির চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়া গেল।
পরের দিন কাগজে কোনো খবব বাহির হইল না, চুক্তিব কথা কযেকজন বাদে বিশেষ কেহ জানিলও না। কাজল, হৈমন্তী, প্রত্যয় চৌধুরীকেহই আন্দাজ করিতে পারিল না দেশের শিল্পসংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হইল। সে দিন আসিতে আরও দুই তিন বৎসর বিলম্ব ছিল।
শুটিং শুরু হইল কলিকাতা হইতে মাইল ত্রিশেক দূরে এক গ্রামে। ছবি তোলাব দলের সবাই সমান উৎসাহী। সবাই মনপ্রাণ দিয়া কাজ করিতে লাগিল। কিছুদুর কাজ অগ্রসর হইলে প্রত্যয় চৌধুরী কাজল আর হৈমন্তীকে কলিকাতা লইয়া যান, যতখানি ছবি উঠিয়াছে সেটুকু প্রোজেক্ট করিয়া দেখান, বিশেষ করিযা হৈমন্তীর মতামত মনোযোগ দিয়া শোনেন। হৈমন্তী একদিন তাহাকে বলিল— আমি নিতান্ত সাধারণ গৃহবধু, আমার জ্ঞানবুদ্ধির সীমা আমি তো ভালো করেই জানি, আমার মতামত আপনি জানতে চাইছেন কেন?
প্রত্যয় চৌধুরী বলিলেন—আপনার মতই আসল মত। সমালোচকদের পাণ্ডিত্য তাদের চোখের সামনে একটা আররণ তৈরি করে, আপনি কিন্তু সহজ সত্যটা দেখতে পান। প্রায় অর্ধেক ছবি তো হয়ে গেল, আপনার কেমন লাগছে?
-খুব ভালো। ত্রিদিববাবুর ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে, এখন দেখছি তিনি ভুল লোক নির্বাচন করেন নি। কিন্তু–
-কিন্তু কি?
–আমার ভয় হচ্ছে আপনার এ ছবি সাধারণ মানুষ নেবে না।
প্রত্যয় চৌধুরী সামান্য চুপ করিয়া থাকিয়া পরে বলিলেন ঠিকই বলেছেন। আমারও সে ভয় হচ্ছে। এ ছবির দর্শক এখনও এদেশে তৈরি হয়নি। তবু কাউকে তো একদিন কাজ শুরু করতেই হয়।
কলিকাতার তিনটি প্রেক্ষাগৃহে যেদিন ছবি রিলিজ হইবে তার আগের দিন সারারাত হৈমন্তীর ঘুম আসিল না। শেষরাতে দেয়ালে টাঙানো অপুর ছবিখানার সামনে দাঁড়াইয়া মনে মনে বলিলতুমি নেই, তোমার হয়ে একটা বড়ো কাজ করলাম। আশীর্বাদ কোরো, যেন সবদিক বক্ষা পায়–!
ছবি বাজারে চলিল না। প্রথম দুই-তিন দিন কিছু দর্শক সমাগম হইল, যেমন নতুন ছবি রিলিজ হইলে হওয়া স্বাভাবিক। তাহার মধ্যে আবার কিছু দর্শক বিরক্ত হইয়া ইন্টারভ্যালে উঠিয়া বাড়ি চলিয়া গেল। বলিতে বলিতে গেল—ছ্যা ছ্যা, গল্প নেই, নাটক নেই, একখানা ভালো গান নেই—এ জিনিস আড়াই ঘণ্টা বসে দেখা-না, পয়সাটাই নষ্ট!
প্রথম সপ্তাহের শেষ হইতেই বোঝা গেল ছবি সম্পূর্ণ মার খাইয়াছে। প্রতি শো-য়ে পনেরোবিশজনের বেশি দর্শক হইল না। দ্বিতীয় সপ্তাহ ছবি রাখিবার জন্য কোনো প্রেক্ষাগৃহেব মালিকই আগ্রহ দেখাইলেন না। অপূর্বকুমার রায়ের প্রথম উপন্যাসের চিত্ররূপ ব্যবসায়িক সাফল্য তো দিতেই পারিল না, জনজীবনে সামান্য আরর্তের সৃষ্টি হইল না।
