বিদেশ হইতে ফিরিয়া প্রত্যয় চৌধুরী একদিন কাজলদের বাড়িতে আসিলেন। অপুর উপন্যাসটির অর্ধেকের কিছু বেশি অংশ লইয়া তিনি হবি করিয়াছিলেন, এবার বাকিটুকু লইয়া আর একটি ছবি করিতে সন। হৈমন্তীর সম্মত না হইবার কোনো কারণ ছিল না। প্রথমবারেই প্রত্যয়বাবুতাহার যোগ্যতা প্রমাণ করিয়া দিয়াছেন। দ্বিতীয় ছবির চুক্তিও হইয়া গেল। সমস্ত কাগজে সংবাদ বাহির হইলঅপূর্বকুমার রায়ের গল্প লইয়া প্রত্যয় চৌধুরী আবার ফিলম করিতেছেন। শুটিং আরম্ভ হইয়া গেল।
প্রথম ছবির জন্য প্রাপ্য সব টাকা কিন্তু তখনও হৈমন্তী পায় নাই। প্রত্যয় চৌধুরী নিজের টাকা দিয়া কিছুদূর কাজ করিবার পর একজন প্রযোজক বাকি টাকা লগ্নী করিয়াছিলেন। তিনি লেখকের প্রাপ্য অংশ দিতে নানাবিধ গড়িমসি করিতে লাগিলেন। একজন সাংবাদিক খবরটা পাইয়া তাহার কাগজে প্রদীপের নিচে অন্ধকার নামে একটি ফিচার লিখিল। যে অপূর্ব রায়েব গল্পের চিত্ররূপ লইয়া সমস্ত পৃথিবীতে উৎসব হইতেছে, সেই লেখকের পরিবার এখনও তাহাদের প্রাপ্যে বঞ্চিত। আরও দুই-একটি কাগজে অনুরূপ সংবাদ বাহির হইবার পর টাকাটা আদায় হইল।
অপুর গল্পেব দ্বিতীয় চিত্ররূপও দেশে-বিদেশে আগের মতো আলোড়ন তুলিল। এবার আর সমালোচকেরা ভুল করিলেন না। ক্ষেত্র প্রস্তুতই ছিল। শুটিং-এর প্রতি পর্যাযে ছবিসহ খবর প্রকাশিত হইতেছিল। ফিল্ম রিলিজ হইবামাত্র পুনরায় দেশজোড়া উৎসাহের বন্যা বহিয়া গেল। নতুন করিয়া আবার অনেক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হইল, অনেক বড়ো বড়ো সংস্থার পক্ষ হইতে প্রত্যয় চৌধুরী সংবর্ধিত হইলেন।
কোথাও অপুর নাম উচ্চারিত হইল না। এইসব সভায় পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, কলাকুশলী প্রত্যেকেই আমন্ত্রণ পাইল, কেবল লেখকের পক্ষ হইতে উপস্থিত থাকিবার জন্য কাজলদের কাছে কোনো আমন্ত্রণ আসিয়া পৌঁছিল না।
অবশ্য চলচ্চিত্রের এই সাফল্যে অপুর বই-বিক্রি কিছু বাড়িল। এক শ্রেণির মানুষ আছে যাহারা সাধারণত সাহিত্য পাঠ করে না, কিন্তু কোন উপন্যাসের ফিলম হইলে বইটা কিনিয়া পড়িবার আগ্রহ দেখায়।
বাবার জন্য কাজলের মনের মধ্যে কোথাও একটা কষ্ট হইতেছিল। যাহার প্রতি তীব্র ভালোবাসা রহিয়াছে তাহাকে শ্রেষ্ঠত্বের সমস্ত অলঙ্কারে সজ্জিত না দেখিলে গভীর বঞ্চনার বোধ বুকের ভিতর ক্রিয়া করে। চলচ্চিত্র এবং সাহিত্য একেবারে ভিন্ন দুটি শিল্পমাধ্যম, যে হৈ-চৈ হইতেছে তাহা কেবলমাত্র চলচ্চিত্র লইয়াই-সাহিত্যের গৌরব তাহাতে কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয় না, এসব যুক্তি সে যে জানিত না এমন নয়, কিন্তু সে যুক্তিতে মনখারাপ দূর হইতেছিল না। চলচ্চিত্র তো আকাশ হইতে পড়ে না বা শূন্যে গজাইয়া ওঠে না। তাহার প্রাথমিক অবলম্বন একটি গল্প। তাহা হইলে পরিচালকের সঙ্গে সঙ্গে গল্পকার সমানভাবে সংবধিত হইবেন না কেন?
১৭. এক ছুটির দিন সকালে
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
এক ছুটির দিন সকালে কয়েকজন লোক কাজলের সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। নিশ্চিন্দিপুর হইতে মাইল তিনেক দূরে যে ছোট শহর সম্প্রতি জমিয়া উঠিয়াছে, সেখান হইতে তাহারা আসিয়াছে।
ধুতি আর শার্ট পরা একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক, কথার ভঙ্গিতে মনে হয় তিনিই দলনেতা, কাজলকে বলিলেন—আপনার বাবা আমাদের অঞ্চলের গৌরব। এ বছর তার জন্মদিনে আমরা একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অপূর্ববাবুর নামেই পাঠাগার হবে। আপনার মাকে দিয়ে আমরা পাঠাগার উদ্বোধন করাতে চাই
কাজল বলিল—সে তো খুব ভালো কথা। মা নিশ্চয় যাবেন।
—আর একটা কথা, আমরা দরজায় দরজায় ঘুরে বই সংগ্রহ করে লাইব্রেরি শুরু করছি। আপনি আমাদের কিছু বই দেবেন—
—তা দেব। বাবার একসেট বই দিচ্ছি, তার সঙ্গে অন্য ভালো বই কিছু। একটু বসুন, চা খান, এখনই বই গুছিয়ে দিচ্ছি।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলিলেন—আপনার মায়ের সঙ্গে একবার দেখা হবে কি? ওঁকে কখনও দেখিনি–
–বসুন আপনি, মাকে ডাকছি–
হৈমন্তী ঘরে আসিতে প্রৌঢ় ভদ্রলোক ছাড়া বাকি সকলে তাহাকে পায়ে হাত দিয়া প্রণাম করিল। প্রৌঢ় ভদ্রলোক হাতজোড় করিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন—আমরা আপনার শ্বশুরবাড়ির দেশ থেকে আসছি। অপূর্ববাবুর নামে একটা পাঠাগার উদ্বোধন হবে ওঁর জন্মদিনে, আমরা আপনার আশীর্বাদ চাই।
হৈমন্তী বলিল—আমার শুভেচ্ছা তো থাকবেই, তাছাড়া যদি কোনো কাজে লাগতে পারি জানাবেন।
-সে তো আপনার ছেলেকে বলেছি, উনি আমাদের কিছু বই দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের তো একটা দাবি আছে, ওদিন আপনাকে পাঠাগার উদ্বোধন করতে হবে।
—বেশ, যাব। কখন আপনাদের অনুষ্ঠান?
–অনুষ্ঠান বিকেলে। সেদিন হয়তো ফিরতে পারবেন না। তাতে অসুবিধে নেই, আমরা থাকার ব্যবস্থা করবো।
কাজল বলিল–আমরা গ্রামেই কারও কাছে থাকব। আপনাদের ব্যস্ত হবার দরকার নেই।
দলের একজন লোক হঠাৎ প্রশ্ন করিল—আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব? আপনারা গ্রাম ছেড়ে শহরে বাস করছেন কেন?
কাজল একটু অবাক হইয়া বলিল—আপনার প্রশ্নটা ঠিক ধরতে পারলাম না।
—আমি বলতে চাইছি, আপনার বাবা একজন বরেণ্য ব্যক্তি। সাহিত্যে পল্লীগ্রামের কথা লিখে তিনি যশস্বী হয়েছেন। প্রতিমাসে কত মানুষ নিশ্চিন্দিপুরে আপনাদের বাড়ি দেখতে যায় জানেন? তারা গিয়ে অপূর্ববাবু সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করবার মতো কোনো মানুষ পায় না। বাড়িটারও অবস্থা ভালো নয়। এ বিষয়ে আপনারা কিছু ভাবছেন না?
