ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিয়া কাজলের বিছানা, টেবিল ও তাকের বইপত্র এবং চেয়ার ইত্যাদি একনজরে দেখিয়া লইয়া সন্তর্পণে চেয়ারে বসিলেন। টেবিলের উপর অকসফোর্ড লেকচার্স অন পোয়েট্রি বইখানা পড়িয়াছিল। সেটা তুলিয়া পাতা উলটাইতেছেন, এমন সময় হৈমন্তীকে লইয়া কাজল ঘরে ঢুকিল। ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি বই রাখিয়া দাঁড়াইয়া উঠিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেনআমার নাম রেবতী সেন, একটা বিশেষ দরকারে এসেছিলাম। আগে খবর না দিয়ে আসার জন্য আমি দুঃখিত–
হৈমন্তী বলিল—তাতে কী হয়েছে, আমরা অত ইংরেজি সামাজিকতা মানি না। আপনি বসুন—
বসিয়া ভদ্রলোক বলিলেন—আমার একটা গর্ব আজ ভেঙে গেল। আমার নামটা বলেই বুঝলাম আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি। আমি ফিলম তুলি, আমার ছবি লোকে খুব দেখে। যেখানে যাই, নাম বললেই সবাই চিনে ফেলে। আপনি পারলেন না–
হৈমন্তী হাসিয়া বলিল—আপনি কিছু মনে করবেন না, আসলে আমি বা আমার ছেলে কেউই বায়োস্কোপ দেখি না–
ভদ্রলোকও হাসিলেন, বলিলেন না না, আমি কিছু মনে করিনি, বরং মজাই লাগছে। নিজের যথার্থ স্থান সম্বন্ধে সচেতন থাকাই ভালো।
কিছুক্ষণ সৌজন্যমূলক বার্তালাপ হইবার পর রেবতী সেন তাহার আসিবার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করিলেন। তিনি অপুর প্রথম উপন্যাসটির ছবি করিতে চান। ছবি দেখিবার অভ্যাস না থাকিলেও হৈমন্তী নিশ্চয় তাহার নির্মিত ‘সুখের সংসার’ বা ‘অশ্রুজলে’ লেখা বায়োস্কোপ দুটির নাম শুনিয়াছে? অপূর্ববাবুর গল্পটি হাতে পাইলে, তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি দর্শকদের কাঁদাইয়া পাগল করিয়া দিবেন। বিশেষ করিয়া গল্পের শেষে ছোট মেয়েটির মৃত্যুদৃশ্যে এমন একখানি করুণ গান জুড়িবার কথা ভাবিয়াছেন, যাহা আগামী দশবছরেও দর্শক ভুলিবে না। তাহার বলিতে সংকোচ হইতেছে, তবু তিনি বলিতেছেন, টাকার বিষয়ে হৈমন্তীর কোনো আশঙ্কার কারণ নাই। তিনি উপযুক্ত মূল্য দিবেন এবং নগদেই দিবেন।
মানুষটি ভদ্র। তাঁহার প্রার্থনার ভিতরেও দম্ভ বা ঔদ্ধত্য নাই। তিনি যেভাবে অপুর উপন্যাসের চিত্ররুপ দিবার কথা ভাবিয়াছেন, তাহার হাস্যকর দিকটাও তাহার নিজের কাছে স্পষ্ট নয়। নিজের অর্জিত সাফল্য সম্বন্ধে সরল তৃপ্তিবোধ এবং তার অসংকোচ প্রকাশ ছাড়া ভদ্রলোকের আচরণে চটিয়া উঠিবার মতো কিছু নাই।
হৈমন্তী বলিল—কিছু মনে করবেন না, এ গল্প আমি আপনাকে দিতে পারব না।
রেবতী সেন অবাক হইয়া বলিলেন—কেন? কেন বলুন তো?
—কারণ—কারণটা ব্যক্তিগতই ধরুন। আপনার আগেও দু-একজন এ গল্প চাইতে এসেছিলেন, তাঁদেরও আমি ফিরিয়ে দিয়েছি—
–সে জানি, তাদের নামও জানি। কিন্তু তারা আর আমি তো এক নই। আমার ছবি বাজারে আঠারো সপ্তাহের কম চলে না। লোকে আমাকেই চায়—
—আমাকে মাপ করবেন, আমি পারবো না।
আরও কিছুক্ষণ অনুরোধ-উপরোধের পর বিদায় লইবার সময় রেবতী সেন বলিলেনআমাকে আজ ফিরিয়ে দিলেন-বেশ, আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু একটা কথা বলে যাই, এ ছবি খুব শিগগিরই আপনাকে দিতে হবে—বেশিদিন আটকে রাখতে পারবেন না। এক একটা যুগে এক একটা শিল্পের জোয়ার আসে। এই যুগ হচ্ছে ফিমের যুগ। এর দাবিকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আমাকে না হোক, অন্য কাউকে অনুমতি দিতেই হবে। আচ্ছা চলি-নমস্কার।
কিছুদিনের মধ্যেই কাজল আর হৈমন্তী রেবতী সেনের কথার সত্যতা উপলব্ধি করিল। চলচ্চিত্র জগতে গোপনতা রক্ষা করা কঠিন। নামকরা কোনো প্রযোজক বা পরিচালক কোনো একটি গল্প সম্বন্ধে ভাবিতেছেন বলিয়া রটিলে অকস্মাৎ সেই গল্পটির জন্য একেবারে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যায়। কে কাহাকে ডিঙাইয়া গল্পটির স্বত্ব কিনিয়া ফেলিবে তাহার প্রতিযোগিতা চলে। মাসদেড়েক কাজলদের বাড়িতে খুব সিনেমার লোকের যাতায়াত চলিল। হৈমন্তীর একই উত্তর।
তারপর একদিন আসিলেন প্রত্যয় চৌধুরী।
ত্রিদিব মিত্র নামে একজন প্রকাশক অপুর প্রথম উপন্যাসখানির একটি কিশোরপাঠ্য সংস্করণ ছাপিয়াছিলেন। ভদ্রলোক রুচিবান, উচ্চশিক্ষিত। শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ে তাহার মৌলিক মতামত রহিয়াছে। বই ছাপা র্তাহার পেশা নয়, নেশা। মুদ্রণ পারিপাট্য, নির্ভুল ছাপা ও ধ্রুপদী গ্রন্থ নির্বাচনের জন্য মননশীল পাঠকমহলে তাহার খ্যাতি আছে। অপুর বই প্রকাশ করার সূত্রে কাজলদের পরিবারের সহিত তাহার পরিচয় জমিয়া উঠিয়াছিল। মাঝে মাঝে আসিয়া তিনি নানান গল্প শোনাইতেন। ইউকাটান অঞ্চলের অরণ্যে মায়া সভ্যতার পিরামিড, আদিম চিরোকী ইন্ডিয়ানদের আবাস টিপি তৈরি করিবার কৌশল, ইতালীতে প্রস্তুত কাঠেব গ্রামোফোন এবং বাঁশের পিনে বিঠোফেনের নাই স্মিফনি কেমন শোনায়, বিষ্ণুপুরের দশাবতার তাস তৈরি করিবার সময় শিল্পীরা তাহাতে তেঁতুলবিচির গুঁড়ার প্রলেপ দিয়া কিভাবে তাসগুলিকে দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী করিবার কৌশল আবিষ্কার করিয়াছে ইত্যাদি। ত্রিদিব মিত্রই প্রত্যয় চৌধুরীকে সঙ্গে করিয়া আনিলেন। পরিচয় করাইয়া দিবার পর তিনি বলিলেন মিসেস বায়, আমি কিন্তু একটা বিশেষ কারণে একে নিয়ে এসেছি। অপূর্ববাবুর বইখানার ছোটদের সংস্করণের প্রচ্ছদ এবং ভেতরের ছবি সব এই প্রত্যয় এঁকেছে। এ খুব ভালো একজন শিল্পী। ওর পরিবারেরও একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, সে সব শুনবেন এখন। প্রত্যয় ফিলমের বিষয়ে খুব উৎসাহী, অপূর্ববাবুর প্রথম উপন্যাসখানি ও ছবি করতে চায়। এ প্রসঙ্গে আপনার কী মত?
