কাজল বলিল—সে কী কথা! আমাদেরই স্কুলের দরিদ্র ছাত্র, তার ফ্যামিলি একটা স্ট্রেসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে—এতে আমাদের কোনো কর্তব্য নেই?
-দেখুন সে কথা বলতে গেলে আমাদের ইস্কুলে আরও পঞ্চাশজন ছাত্র আছে যাদের পরিবার হয়তো এর চেয়েও ডায়ার স্ট্রেসের মধ্যে দিয়ে চলেছে। তাদের সবাব উপকার করার সাধ্য আপনার আছে? দেশের অগণিত দরিদ্র জনসাধারণের কথা ছেড়েই দিন। এখানে আপনার পার্সোনাল ইনভলভমেন্ট রয়েছে, আপনার প্রিয় ছাত্র–অন্যদের কী হবে?
কাজল রাগিয়া বলিল—এটা কী একটা যুক্তি হল? সবার জন্য করার শক্তি নেই বলে সামনে যে কষ্ট পাচ্ছে তাকেও সাহায্য করবো না? আমরা প্ৰত্যেকে নিজেদের পরিচয়ের গণ্ডীর মধ্যে যদি সেবার কাজ করি, তাহলে পৃথিবীটা বেটার প্লেস হয়ে উঠবে–
প্রৌঢ় শিক্ষক খড়কে দিয়া দাঁতের ফাঁক হইতে পানের কুচি বাহির কবিতে করিতে বলিলেন–ওসব ভাবজগতের কথা মশাই, আমাদের বাস্তবজগতে বাস করতে হয়। যাক, আপনার অনুরোধ রেখেছি, এবার আপনি দেশোদ্ধার করুন গে–
নেহাত শিবুদের এখন প্রতিটি টাকার প্রয়োজন, নতুবা কাজল ভদ্রলোকের চাঁদা ফেরত দিয়া দিত। কিন্তু সেদিনই সন্ধ্যায় যখন সে টাকাটা দিতে গেল, শিবু বলিল—স্যার, আপনি আর টাকা আনবেন না—
কাজল বলিল–তোমার বাবা যতদিন না ভালো হয়ে উঠছেন—মানে সংসার তো চালাতে হবে, তারপর না হয় আর নিয়ো না।
বাবা কবে ভালো হবেন কিছু ঠিক নেই। বাবার পুরোনো কারখানার ম্যানেজার আমাকে নিতে রাজি হয়েছে। ছমাস কাজ শিখতে হবে, হপ্তায় পনেরো টাকা করে পাবে। ঠিকমত কাজ শিখে নিতে পারলে তারপর থেকে হপ্তায় চল্লিশ টাকা।
—সে কী! তুমি আর পড়বে না?
–না স্যার। কাল থেকে কারখানায় যাবো বলে দিয়েছি–
শিবুর মা তাহার সাহায্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ দিলেন, শিবুর বাবাও অর্ধোচ্চারিত জড়িত স্বরে নিজের কৃতজ্ঞতা জানাইতে লাগিলেন। কিন্তু কাজল মনে একটা ঘোর অতৃপ্তি লইয়া বাড়ি ফিরিল। বর্তমান মুহূর্ত হইতে শিবপ্রসাদের ভবিষ্যৎ সে ছবির মতো স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছে। নিজের বাবার জীবনেরই সে পুনরাবৃত্তি করিবে-কারখানায় চাকরি, বিবাহ, একগাদা বাচ্চা লইয়া অনটনের সংসার, তারপর একদিন অবসব অথবা অপারগতা জীবন শেষ!
অথচ তাহার জীবন অন্যরকম হইতে পারিত। ইহার জন্য কে দায়ী? দেশের সমাজব্যবস্থা? অর্থনীতি? যাহাই হোক, একটা জীবন তো নষ্ট হইয়া গেল।
১৬. অপুর প্রথম উপন্যাসটির খ্যাতি
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
অপুর প্রথম উপন্যাসটির খ্যাতি দিন দিন বাড়িতেছিল। সাধারণ সামাজিক উপন্যাস এবং জোলো প্রেমের কাহিনী পড়িতে পড়িতে বাঙালি পাঠক বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। শক্তিমান কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক এই অচলায়তন ভাঙিবার জন্য সাহসী ও বলিষ্ঠ এক নতুন রীতির আমদানি করিয়া লিখিতে শুরু করিলেন। এতাবৎকালে প্রাচীন নীতিবোধসম্পন্ন বাঙালি সমাজজীবনের যে গৃঢ় ও অন্ধকার কোণগুলি সঙ্গোপনে লুকাইয়া রাখা পছন্দ করিতেন, এই নতুন লেখকের দল প্রধানত তাহাকেই নিজেদের রচনার উপজীব্য কবিলেন। শরীর ও যৌনতা, অবৈধ প্রেম—এসব বিষয়ে স্পর্শকাতর মধ্যবিত্ত মূল্যবোধকে একেবারে ভিতর হইতে নাড়া দিবার জন্য ইহারা উদ্যোগী হইলেন। নীতিবাগীশের দল খেপিয়া আগুন হইলেন, তরুণের দল জয়ধ্বনিতে আকাশ মুখরিত করিল। কোনো কিছু লইয়া বিতর্ক উপস্থিত হইলে মানুষ স্বভাবতই কৌতূহলী হইয়া ওঠে। কাজেই এই তরুণ-সাহিত্য কিছুদিন বাজারে বেশ ভালো চলিল। কিন্তু একটানা কিছুকাল উত্তেজিত থাকিবার পর একটা ক্লান্তি আসে, কারণ উত্তেজনা জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা নয়। তখন একটু স্বস্তি, একটু আশ্রয় প্রয়োজন হইয়া পড়ে। অপুর উপন্যাসে তাহা ছিল। জীবনের সমস্ত অকারণ চাহিদা, বস্তুগত প্রাপ্তির জন্য নিরন্তর শ্রম এবং উচ্চকিত কলরবের বাহিরে, যেখানে শান্ত সৌন্দর্যের মধ্যে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় খুঁজিয়া পায়, অপুর রচনা পাঠককে সেই সমাহিত মগ্নতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া দেয়। পাঠক তাহার বই কাড়াকাড়ি করিয়া কিনিল না বটে, কিন্তু তাহার বিক্রি একটা নির্দিষ্টস্থানে আসিয়া স্থির হইয়া রহিল। ফলে নতুন সাহিত্যের তরুণ লেখকদের অনেককেই যখন পাঠকসমাজ বেমালুম ভুলিয়া গেল তখনও অপুর খ্যাতি এবং বইয়ের বিক্রি একটি স্থির বিন্দুতে অনড়।
একদিন কাজলদের বাড়ির সামনে একখানা ঝকঝকে স্টুডিবেকার গাড়ি আসিয়া থামিল। বাদামী রঙের এরোপ্লেনের মতো দেখিতে লম্বা গাড়ি। স্টিয়ারিংয়ের পেছনে কেতাদুরস্ত উর্দি পরা চালক বসিয়া আছে। চালক নামিয়া দরজা খুলিয়া দিতে সাদা জামা-প্যান্ট-পরা এক ভদ্রলোক নামিলেন। ছুটির দিন সকাল, কাজল বারান্দায় দাঁড়াইয়া অবসরের আমেজ উপভোগ করিতেছিল। ভদ্রলোক তাহাকেই জিজ্ঞাসা করিলেন–আচ্ছা ভাই, সাহিত্যিক অপূর্বকুমার রায়ের বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারেন?
কাজল একটু অবাক হইল। এতবড় গাড়ি চড়িয়া তাহাদের বাড়ি আসবার মতো অতিথি কমই আছে। সে বলিল—এটাই তার বাড়ি। আপনি কাকে চান?
—আমি একবার ওঁর—আচ্ছা আপনি কে?
—আমি ওঁর ছেলে।
–ওঃ, তাহলে তো খুব ভালোই হল। আপনিই কি ওঁর কপিরাইট হোল্ডার?
–না, আমার মা।
–আপনার মায়ের সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে কী?
কাজল বলিল–আপনি ভেতরে এসে বসুন, আমি মাকে ডাকছি।
