সেবার বার্ষিক পরীক্ষায় শিবপ্রসাদ বেশ ভালো ফল করিয়া প্রমোশন পাইল। কাজলের মনে হইল একটু সাহায্য ও সঠিক নির্দেশ পাইলে ছেলেটি ম্যাট্রিকে যথার্থ ভালো ফল করিবে। স্কলারশিপ পাইলে কলেজে পড়িবারও অসুবিধা হইবে না।
কিন্তু ক্লাস এইটে পড়িবার সময় শিবপ্রসাদ হঠাৎ পরপর কয়েকদিন স্কুল কামাই করিল। অসুখবিসুখ করিল নাকি? দিনসাতেক দেখিয়া কাজল ক্লাসে জিজ্ঞাসা করিল—তোমরা কেউ কী শিবপ্রসাদের বাডি চেনো? ওর কী হয়েছে বলতে পারো? বেশ কিছুদিন স্কুলে আসছে না–
পরিতোষ নামে একটি ছেলে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল—আমার বাড়ি স্যার শিবুদের পাড়ায়। শিবুর বাবার খুব অসুখ, সেইজন্য স্যার ও আসছে না।
–অসুখ? কী হয়েছে?
—তা তো জানি না স্যার, তবে খুব অসুখ–
ছেলেটির কাছ হইতে ঠিকানা জানিয়া কাজল বিকালে শিবপ্রসাদেব বাড়ি খুঁজিয়া বাহিব করিল। ডাকাডাকি কবিতে শিবু বাহির হইয়া কাজলকে দেখিয়া একেবারে অবাক হইয়া গেল। কোথায় বসাইবে, কী করিবে ভাবি পায় না। পরে বারান্দার কোণে একটা নড়বড়ে চৌকিতে গবুকে বসিতে দিয়া দৌড়াইয়া মাকে ডাকিয়া আনিল। শিবুব মায়ের বয়েস বছর ত্রিশ কী বত্রিশ হইবে। একসময়ে হয়তো দেখিতে ভালো ছিলেন, দারিদ্র্য ও অতিরিক্ত পরিশ্রম বর্তমানে চেহারার মাধুর্যটুকু হরণ করিয়াছে। তিনি কোনো কথা না বলিয়া দরজার পাল্লা ধরিযা দাঁড়াইয়া থাকিলেন। কাজল বলিল—আমাকে আপনি চিনবেন না, আমি শিবপ্রসাদের মাস্টারমশাই। ও আমার খুব প্রিয় ছাত্র। আজ কদিন স্কুলে যাচ্ছে না—ছাত্রদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানলাম আপনার স্বামী অসুস্থ। আমার কাছে আপনি কোনো সংকোচ করবেন না, নিজের ভাই বলে মনে করবেন। যদি আমি কোনো কাজে আসতে পারি–
শিবুব মা কাঁদিয়া ফেলিলেন। কাজল এতদিন ছাত্রের সংসারের খবর বিশেষ কিছু জানিত না, এখন শুনিল শিবুর বাবা শহরের কোন এক লেদ কারখানায় কাজ করেন, বেতন সামান্যই। ছুটির পর খুচরা দু-একটা কাজ করিয়া সব মিলাইয়া কোনমতে চালাইয়া দেন। দিনদশেক আগে কাজ করিতে কবিতে হঠাৎ অজ্ঞান হইয়া যান, কারখানার লোকেরাই ধরাধরি করিয়া বাড়ি পৌঁছাইয়া দেয়। জ্ঞান ফিরিবার পর শরীবের বাঁদিক সম্পূর্ণ অবশ হইয়া গিয়াছে, উঠিবার ক্ষমতা নাই। কারখানার মালিক এমনিতে লোক ভালো, পাওনা যাহা ছিল তোক মারফৎ পাঠাইয়া দিয়াছে। তাহা ভাঙাইয়াই বর্তমানে চলিতেছে বটে, কিন্তু আর কদিন চলিবে? চিকিৎসারও বিশেষ কিছু ব্যবস্থা করিয়া যায় নাই। মোড়ের মাথার হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারবাবু ভরসা।
কাজল বলিল—আমি কী একবার ওঁকে দেখতে পারি?
ভদ্রমহিলা ছেলেকে ইঙ্গিত করিতে শিবু কাজলকে ঘরের মধ্যে লইয়া গেল। নিতান্ত নিম্ন মধ্যবিত্তের গৃহস্থালিচটা ওঠা সিমেন্টের মেঝে, দেওয়ালের দিকে তিনখানি তোবড়ানো রঙ ওঠা ঢিনের তোরঙ্গ একটার উপর একটা রাখা, তাহার উপর আঁকা গোলাপফুল মান হইয়া আসিয়াছে। ঘরের এক কোণ হইতে অন্য কোণ পর্যন্ত দড়ি টাঙানো, তাহা হইতে মলিন কিছু শাড়ি ধুতি গামছা ঝুলিতেছে। একটা কুলুঙ্গিতে সিঁদুরমাখা মাটির মূর্তি। মেঝেতে বসিয়া একটা বিড়াল রুটির টুকরা খাইতেছে।
ঘরের কোণে চৌকিতে শিবুর বাবা শুইয়া আছেন। চোখ খোলা, মুখ ঈষংহ করা। বাঁ চোখের পাতা এমনভাবে অর্ধেক নামিয়া আসিয়াছে যে দেখিলে মনে হয় শায়িত ব্যক্তি কোনো একটা নিগূঢ় ঈঙ্গিত করিতেছেন। ঠোঁটও বাঁদিকে শিথিল হইয়া ঝুলিয়া পড়িয়াছে। কাজল পাশে গিয়া দাঁড়াইতে ভদ্রলোক বোধহয় তাহাকে কিছু বলিবার চেষ্টা করিলেন, গলা দিয়া একটা দুর্বোধ্য ঘড়ঘড় শব্দ বাহির হইল মাত্র। কাজল তাহার হাত ধরিয়া বলিল—থাক, আপনি কথা বলবেন না। আমি শিবুর স্কুলের মাস্টারমশাই। আপনার অসুখের খবর পেয়ে দেখতে এসেছি। ভয় নেই, ভালো হয়ে যাবেন—
শিবুর বাবার গলার মধ্যে আবার বিকৃত ঘড়ঘড় শব্দ হইল, দুর্বল ডানহাত দিয়া তিনি কাজলের হাত জড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা করিলেন। বেশিক্ষণ থাকিয়া রোগীকে উত্তেজিত করিয়া লাভ নাই, কাজল বলিল—আমি আজ যাচ্ছি, আবার আসব। আপনি বিশ্রাম করুন।
এক ডাক্তার বন্ধুকে লইয়া পরের দিন সন্ধ্যায় কাজল আবার শিবুদের বাড়ি গেল। বন্ধু রোগী দেখিয়া বলিল— সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে আংশিক পক্ষাঘাত দেখা দিয়েছে। আমি তো ভাই সাধারণ ডাক্তার, কোলকাতায় কোনো হাসপাতালে ভর্তি করে একজন নিউরোলজিস্টকে দেখালে ভালো হত–
কাজল বলিল—সেরে ওঠার সম্ভাবনা কতখানি?
-বলা কঠিন। অনেকে চিকিৎসায় বেশ উপকার পায়, আবার অনেকে-বুঝলে না? তবে আগের স্বাস্থ্য আর বোধহয় ফিরে পাবেন না—
বন্ধুর সুপারিশে কলিকাতার হাসপাতালে বেড় পাওয়া গেল, একখানা অ্যামবুলেনসও জোগাড় হইল। কিন্তু একমাস হাসপাতালে থাকিবার পর শিবুর বাবা যখন ফিরিলেন, দেখা গেল তাঁহার অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয় নাই। লাঠি ধরিয়া সামান্য চলাফেরা করিতে পারেন–চিকিৎসার ফলের মধ্যে এই। কথা জড়াইয়া গিয়াছে, নিকটজনেরা ছাড়া বুঝিতে পারেন না।
কাজল নিজের পকেট হইতে কিছু দিয়া, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চাঁদা তুলিয়া শিবুর মায়েব হাতে দিয়া আসিল। কিন্তু এভাবে কাহারও সংসার বাহির হইতে সাহায্য করিয়া চিরকাল চালানো যায় না। চাঁদাও যে খুব সহজে সংগ্রহ হইল এমন নয়। তাহার নিজের স্কুলের একজন প্রৌঢ় শিক্ষক তিনটি টাকা দিলেন বটে কিন্তু বলিলেন–আপনার কথা এড়াতে পারলাম না, তাই দিচ্ছি। নইলে এব কোনো মানে হয় না।
