কাজল কথা না বলিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
বিমলেন্দু বলিলেন–তুলিকে তুমি দেখেছ, বাই এনি স্ট্যান্ডার্ড, তাকে সুন্দরী বলতেই হবে। ঘরের সব কাজ জানে—যেটুকু জানে না, শিখে নিতে পারবে। তাছাড়াও মায়ের একটা গুণ ও পেয়েছে, তা হল সেসিটিভ মন। তুলি বই পড়ে, ভালো গান করে। কিন্তু এত গুণ থাকা সত্ত্বেও ওর বিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন হবে। হিন্দুসমাজে আমরা মানুষকে উদার মুক্তির আলো দেখাতে পারিনি, কিন্তু নানা নিয়মের নিগড়ে তাকে আচ্ছা করে বেঁধেছি। তুলির কোন দোষ নেই, কিন্তু তার মায়ের ভুলের কথা সমাজ মনে কবে রেখেছে। আমি দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে সমস্ত পুরোনো কথা গোপন করে তুলির বিয়ে দিতে পারি, কিন্তু এ ধরনের ব্যাপার চিরকাল চাপা রাখা যায় না, একদিন প্রকাশ হবেই-এবং হলে ওর জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। আর আমিও বিবাহের মতো পবিত্র ব্যাপারে মিথ্যাচরণ করতে চাই না। এত কথা তোমাকে বলতাম না, কিন্তু তোমার বাবা তুলির ভবিষ্যৎ জীবনের অসহায়তার কথা আন্দাজ করে আমার কাছে একটা ইচ্ছে প্রকাশ করে গিয়েছিলেন, তুমি কি সে বিষয়ে কিছু জানো?
কাজল বলিল–জানি। বাবার ডায়েরিতে পড়েছি।
-মায়ের অপরাধে যেমন মেয়ের কষ্ট পাওয়া অনুচিত, তেমনি বাবার কোনো ইচ্ছের বোঝ ছেলেব ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। পুরোনো কোনো ঘটনার জের না টেনেই আমি সামাজিকভাবে তোমার সঙ্গে তুলির বিবাহের প্রস্তাব করছি। এ বিষয়ে তোমার মতটাই আমি আগে জানতে চাই, বলো তোমার কী মত—
গলির মধ্যে একটা ফেরিওয়ালা সুর করিয়া কী যেন হাঁকিতেছে। ঘরের দরজায় পাপোশের উপর হলুদ আর কালো লোমওয়ালা একটা মেনিবেড়াল শান্তভাবে বসিয়া আছে। বিমলেন্দু তর্জনী দিয়া টেবিলের ওপর অদৃশ্য নকশা আঁকিতেছেন। কাজলের মনে হইল সমস্ত পৃথিবী তাহার উত্তরের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছে। জগৎসংসার দুইটি সম্ভাবনার দরজায় দাঁড়াইয়া, তাহার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো একটা পথ বাছিয়া চলিতে শুরু করিবে।
কাজল বলিল–আপনার সঙ্গে আমি বন্ধুর মতো কথা বলতে পারি?
বিমলেন্দু হাসিলেন। বলিলেন—পারো।
–তবে আমাকে কিছুদিন সময় দিন। আমাকে ভাবতে হবে।
বিমলেন্দু বোধহয় একটু ক্ষুন্ন হইলেন। তিনি হয়তো আশা করিয়াছিলেন কাজল আজই তাঁহার প্রস্তাবে সম্মতি জানাইবে। কিন্তু তিনি সহজভাবেই বলিলেন—বেশ তো, ভাবো। একটা কথা তোমাকে বারবার বলছি-এই ব্যাপারে তোমার কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। তুমি না বলতেই পারো, এবং তা বললে আমাদের সম্পর্কের কোনোরকম অবনতি ঘটবে না। আর কিছু বলবে?
কাজল বলিল—আমাকে ভুল বুঝবেন না। তুলির-তুলির মায়ের প্রসঙ্গে যদি কোনো সামাজিক অসুবিধা থাকে, তবে আমি তার পরোয়া করি না। আমি সেজন্য সময় নিচ্ছি না, অন্য বিষয়ে আমার কিছু সিদ্ধান্ত নেবার আছে। কিন্তু—
বিমলেন্দু কাজলের দিকে তাকাইলে।
কাজল বলিল—মাঝে মাঝে এসে আমি তুলির সঙ্গে দেখা করতে এবং কথা বলতে চাই। আমি কথা দিচ্ছি, আমি এমন কোনোভাবে মিশবে না যাতে তুলির বা আপনাদের পরিবারের সম্মানের কোনো ক্ষতি হতে পারে।
বিমলেন্দু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করিয়া কী ভাবিলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন-কতদিন সময় তুমি চাও?
—অন্তত একবছর।
—বেশ, তাই হোক। একবছর আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। আর তুমি আমার বাড়িতে এলে আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যে কারণে তুমি আসতে চাইছ সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে বলে মনে হয় না। তুলি খুব লাজুক মেয়ে, শী ওয়াজ রেইজ অ্যালোন ইন এ কনজারভেটিভ ওয়ে। তোমার কাছে তুলি ভোলামেলা হতে পারবে কী?
কাজল এ কথার উত্তর দিল না।
বিমলেন্দু একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন–দেখো চেষ্টা কবে।
কাজল বলিল—একটা কথা কিন্তু আগে থেকে পরিষ্কার থাকা প্রযোজন। একবছর পরে আমি বলতেও পারি।
বিমলেন্দু হাসিলেন। বলিলেন–তেমন সম্ভাবনার কথা আমার ভাবতে ভালো লাগছে না বটে, কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে তুমি অনেস্ট। যাক, অনেক কথা হল, এবার কিছু চা-খাবাব আনতে বলি–
কাজল উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল–না, আজ থাক। আর একদিন–
-তুলির সঙ্গে দেখা করবে?
সামান্য দ্বিধা করিয়া কাজল বলিল–না।
বিমলেন্দু বাহির দরজা পর্যন্ত তাহাকে আগাইয়া দিয়া গেলেন।
দুই-একটা খাঁটি পাগল না থাকিলে জীবন বিস্বাদ হইয়া যায়। সবাই হিসাব করিয়া চলিলে বা পাকা বৈষয়িক হইলে পৃথিবীতে বড়ো কাজ করিবে কাহারা? প্রকৃতির নিয়মেই প্রতি যুগে কিছু পাগল জমায়। জ্যোতিপ্রিয় এই ধরনের একজন পাগল। সে কাজলের সহিত এম.এ. পড়িত। লম্বা রোগা চেহারা, মাথার চুল অবিন্যস্ত। জামাকাপড়ের প্রতিও কোনো মনোযোগ নাই। ইস্ত্রিবিহীন প্যান্টের উপর যেমন তেমন একটা শার্ট চাপাইয়া ক্লাসে আসিত। একবার দুই পায়ে দুইরকম চটি পরিয়া ইউনিভার্সিটিতে সারাদিন দ্রষ্টব্য বস্তু হইয়া ছিল। জ্যোতিপ্রিয় ক্লাসের লেকচার বিশেষ শুনিত না, পেছনের বেঞ্চিতে বসিয়া নিবিষ্ট মনে মডার্ন এক্সপ্ল্যানেশন অফ ডারুইনিজম, থিয়োরী অফ এক্সপ্যান্ডিং ইউনিভার্স কিংবা কুক ভয়েজ পড়িত। সর্বদাই সে অন্যমনস্ক। কেহ কেমন আছ? জিজ্ঞাসা করিলে এমনভাবে অবাক হইয়া তাকাইয়া থাকিত যে, তাহাকে বদ্ধ কালা অথবা পাগল ছাড়া কিছু ভাবিবার উপায় ছিল না। অথচ পাশ করিবার সময় সে কেশ ভালো নম্বর পাইয়া পরীক্ষার বেড়া উত্তীর্ণ হইয়া গেল। বহুদিন বিকালে কাজল তাহার সহিত খোলদীঘির ধারে বসিয়া বা উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কতরকম গল্প করিয়াছে। ফিফথ ইয়ারে পড়িবার সময় একদিন জ্যোতিপ্রিয় বলিল—চল অমিতাভ, কিছু টাকা জোগাড় করে একবার উড়িষ্যার তালচের থেকে ঘুরে আসি
