কাজল বলিল–বেড়ানো ভালো কথা, কিন্তু এত জায়গা থাকতে হঠাৎ তালচের কেন?
উৎসাহ পাইয়া জ্যোতিপ্রিয় বলিল—তালচেরে কতগুলো অদ্ভুত পাথরের খও আছে, জানো? জিওলজিস্টদের ভাষায় সেগুলো হচ্ছে এরাটিক বোন্ডার। অর্থাৎ ওই জায়গায় ওরকম পাথর থাকবার কথা নয়। চারদিকে কয়েকশো মাইলের মধ্যে নেই। তাহলে এই খাপছাড়া বহুটন ওজনের পাথরের টুকরো তালচেরে এলো কোথা থেকে? জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বুলেটিনে ব্যাপারটা পড়ে অবধি মাথা খারাপ হয়ে আছে। যাবে?
কাজলের কাছে তখন টাকা ছিল না। জ্যোতিপ্রিয়রও বোনের বিবাহ সামনের মাসে। সব মিলাইয়া যাওয়ার ব্যাপারটা চাপা পড়িয়া গেল।
মাস ছয়েক বাদে কাজল লাইব্রেরিতে কী কাজে যেন গিয়াছিল, দেখিল জ্যোতিপ্রিয় এককোণে বসিয়া গভীর অভিনিবেশ সহকারে মোেটা একখানা বই পড়িতেছে। কাজল পাশে গিয়া বসিতেও সে তাহাকে লক্ষই করিল না। খপ করিয়া বইটা কাড়িয়া লইতেই জ্যোতিপ্রিয় এই এই! কী হচ্ছে? বলিয়া ভয়ানক চমকাইয়া উঠিল, পরে কাজলকে দেখিয়া হাসিয়া বলিল—ওঃ, তুমি! দাও বইটা দাও—একটা দরকারি জায়গা পড়ছিলাম—
ফেরত দিবার সময় কাজল দেখিল বইখানার নাম স্টারস্ ইন দেয়ার কোর্সেস। সে বলিলব্যাপার কী? এখন আবার গ্রহনক্ষত্র নিয়ে পড়েছে নাকি?
মাথা চুলকাইয়া জ্যোতিপ্রিয় বলিল–না, ঠিক গ্রহনক্ষত্র নয়—আসল ব্যাপারটা হল গিয়ে ডাইনোসোর।
আশ্চর্য হইয়া কাজল বলিল–ডাইনোসোর? তার মানে?
—-ডাইনোসোর জানো না? জুরাসিক-ট্রিয়াসিক যুগের যেসব বিশাল সরীসৃপ আজ থেকে ছসাতকোটি বছর আগে পৃথিবী কাঁপিয়ে বেড়াত—ব্রন্টোসোর, প্লেসিওসোরাস, টিরানোমোরাস রে —ছবি দেখনি?
–আহা, তা জানি। বলছি, হঠাৎ তাদের নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ যে?
জ্যোতিপ্রিয় চেয়ারে হেলান দিয়া স্বপ্নালু চোখে এমনভাবে সামনের দিকে তাকাইল, যেন সে সাতকোটি বৎসর আগের পৃথিবীটাকে দেখিতে পাইতেছে। চুলের মধ্যে অন্যমনস্কভাবে হাত বুলাইয়া সে বলিল–কয়েক কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করার পর ডাইনোসোরের দল খুব কম সময়ের মধ্যে একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়। কেন, তার কোনো সঠিক উত্তর বৈজ্ঞানিকেরা দিতে পারছেন না। এই ব্যাপারটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে—
কাজল বলিল–কোনোরকম মহামারী হয়েছিল হয়তো।
—না, তা সম্ভব নয়। মহামারী হলে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে একটা প্রাণীদল এমন নিঃশেষে সুপ্ত হয়ে যায় না। এখানে ওখানে দুএকটা থেকে যেত, তার থেকে আবার বংশবৃদ্ধি ঘটত। এর মধ্যে অন্য কোনো রহস্য আছে–
সাতকোটি বছর আগে ডাইনোসোরেরা কেন মরিয়া গিয়াছিল সে রহস্য ভেদ করিয়া এইমুহূর্তে বিশেষ কী লাভ আছে তাহা হঠাৎ বোঝা না গেলেও এই ধরনের কল্পনা চিরদিনই কাজলকে আকর্ষণ করে। সে বলিল–তোমার কী ধারণা?
–দুটো কারণ থাকতে পারে। আমার মনে হয় সে সময়ে আকাশে সৌরজগতের কাছাকাছি কোনো সুপারনোভার বিস্ফোরণ হয়েছিলনক্ষত্রদের জীবনের শেষদিকে এরকম হতে পারে, জানো তো? সেই বিস্ফোরণ থেকে কোনোরকম ক্ষতিকর রশ্মি এসে পৃথিবীতে পড়তে থাকে অনেকদিন ধরে। তাতেই এরা মারা পড়ে। এই মতবাদ নিয়ে লেখা একটা প্রবন্ধ পড়লাম ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকায়। তাই অ্যাস্ট্রোনমির বইপত্র ঘেঁটে দেখছি ওইসময় সত্যি কোনো সুপারনোভার বিস্ফোরণ হয়েছিল কিনা। দ্বিতীয় কারণটা শুনলে অবশ্য তুমি হাসবে–
–হাসবো কেন? তুমি বলো–
জ্যোতিপ্রিয় কাজলের দিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিল—এটা অন্য গ্রহ থেকে আসা প্রাণীদের কীর্তিও হতে পারে–
অবাক হইয়া কাজল বলিল—তার মানে?
–আমার মনে হয় বিশ্বে আমরা একা নই, লক্ষ লক্ষ নীহারিকার কোটি কোটি গ্রহ–কোথাও না কোথাও নিশ্চয় বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। তাদের ভেতর কোনো গোষ্ঠী মহাকাশযানে চেপে পৃথিবীতে এসেছিল। সে সময়ে পৃথিবীতে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আবির্ভাব হয়েছে, কিন্তু তারা ডাইনোসোরদের ভয়ে দিনেরবেলা মাটির তলায় গর্তে লুকিয়ে থাকে, রাত্তিরে চুপিচুপি বেরিয়ে খাবার সংগ্রহ করে আবার ঢুকে পড়ে গর্তে। নভোচারীরা বুঝতে পেরেছিল স্তন্যপায়ীদেরই একমাত্র ভবিষ্যৎ আছে। তাদের একটা সুযোগ দিলে একসময় তারাই পৃথিবী শাসন করবে, উন্নত সভ্যতা গড়বে। তাই অন্য গ্রহমণ্ডলী থেকে আসা নভশ্চরেরা ডাইনোসরদের কোনোভাবে খতম করে দিল–
কাজল বলিল—এর থেকে আর একটা সিদ্ধান্তেও আসা যায়—
জ্যোতিপ্রিয় আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিল–কী? কী?
-যে তুমি একটা বদ্ধ উন্মাদ! আর সারবে না!
হতাশ ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়া জ্যোতিপ্রিয় বলিল–দাউ টু? সবাই আমাকে খেপায়, অপদার্থ বলে। তোমাকে আমি অন্য চোখে দেখি, তুমি কমন রান অফ পিপ-এর মধ্যে পড়ো না। তুমিও পেছনে লাগলে তো মুশকিল।
–তুমি আবার সিরিয়াসলি নিলে নাকি? দূর—আমি এমনি মজা করে বললাম বুঝতে পারলে না? আরে এইসব আনইউজুয়াল বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে বলেই তো তোমাকে এত ভালোবাসি।
জ্যোতিপ্রিয় উত্তেজিত হইয়া বলিল—ওইখানেই তোমাদেব সঙ্গে আমার বিবোধ। এগুলো কি আনইউজুয়াল চিন্তা হল? এগুলোই তো আসল ভাববার জিনিসচর্চা করবার বিষয়। এত বড়ো ব্রহ্মাণ্ডটার ভেতর আমরা বাস করছি—কে আমরা? কোথা থেকে সৃষ্টি হল এই বিশ্ব? এর কী কোনো মানে আছে? সার্থকতা আছে? নাকি আপনাআপনি জড়পদার্থের অন্ধ নিয়মে এর বিকাশ আর ধ্বংস হয়ে চলেছে? বরং জীবনের বাকি সব দিক—যার ওপর সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি জোর দেয়-যেমন ব্যবসা, রাজনীতি—সেগুলোই হচ্ছে আনইউজুয়াল! আর কবে যে মানুষের চোখ ফুটবে!
