কিছুদিন আগে একদল ফিলমের লোক আসিয়াছিল। তাহারা অপুর প্রথম উপন্যাসখানি অবলম্বনে একটি ফিল্ম তুলিতে চায়। একজন মধ্যবয়স্ক বিরলকেশ সতর্ক চেহারার মানুষ তাহাদের দলপতি। তিনিই নাকি ডিরেকশন দিবেন। ভদ্রলোক মাথা চুলকাইয়া কিঞ্চিৎ ইতস্তত করিয়া বলিলেন—অপূর্ববাবুর লেখা তো এখন খুবই পপুলার। তবে কিনা, জানেন তো—সাহিত্যের ভাষা আর ফিল্মের ভাষায় কিছুটা পার্থক্য আছে। অপূর্ববাবু ছিলেন খাঁটি সাহিত্যিক, উনি তো আর ওঁব গল্প ফিল্ম হবে এ ভেবে লেখেন নিকাজেই ছবির খাতিরে গল্পের কয়েকটা জায়গা—মানে খুব সামান্যই—অদলবদল করতে হতে পারে। আমি এইরকম ভাবে ভেবেছি।
পরের পনেরো মিনিট ধরিয়া ভদ্রলোক কাজল ও হৈমন্তীকে যে কাহিনী শোনাইলেন, তাহা তাহার নিজের অপ্রকাশিত রচনা হইতে পারে, আজারবাইজানের উপকথা হইতে পারে কিন্তু কোনোমতেই অপুর উপন্যাস নহে।
হৈমন্তী নরম স্বভাবের হইলেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তেজ প্রকাশ করিতে পারে। সে দৃঢ়স্বরে বলিল—এ একেবারে অন্যরকম গল্প বলে মনে হচ্ছে, আমি এতে মত দিতে পারি না। তাছাড়া আমার স্বামীর ধারণা ছিল ওঁর এই লেখাঁটির চলচ্চিত্র হতে পারে না। তবু আপনারা অতিথি, কষ্ট করে এসেছেন, তাই আপনাদের কথা শুনলাম। কিন্তু ছবি করবার অনুমতি আমি দেব না।
পরিচালক বলিলেন—আমরা কিন্তু ভালো টাকা দেব–
হৈমন্তী বলিল—আপনার একথা অত্যন্ত অপমানজনক। আমার স্বামী তার বইগুলিকে নিজের সন্তান বলে মনে করতেন। আমিও তাই। টাকার জন্য কেউ নিজের সন্তানকে বিক্রি করে না। আচ্ছা নমস্কার—আমি ভেতরে যাচ্ছি। ডাল বসিয়ে এসেছিলাম, পুড়ে যাবে–
ভিতরের ঘরে যাইবার মুখে দরজার কাছে ফিরিয়া হৈমন্তী কাজলকে বলিল—তুমি এঁদের মিষ্টি আর চা দেবার ব্যবস্থা করো–
পরিচালক রুমাল দিয়া কপালের ঘাম মুছিয়া বলিলেন—আপনি যদি দয়া করে আপনার মাকে একটু বুঝিয়ে বলতেন—
কাজল বলিল–কিছু মনে করবেন না, মায়ের কথাই শেষ কথা। তাছাড়া আমিও মায়ের সঙ্গে একমত। আমার কিছু করবার নেই।
ফিমের দল একপ্রকার রাগ করিয়াই জলখাবারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া চলিয়া গেল।
১৫. প্রগাঢ় বসন্তে কাজল
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
প্রগাঢ় বসন্তে কাজল বিমলেন্দু রায়চৌধুরীর চিঠি পাইল।
বিমলেন্দু বিদেশ হইতে আস্তানা গুটাইয়া দেশে ফিরিয়াছেন এবং কলিকাতায় বাড়ি ভাড়া লইয়া আছেন। কাজল কী তাহার সঙ্গে একবার দেখা করিতে পারে? তাহার বিশেষ প্রয়োজন।
অনেক ভাবিয়া কাজল চিঠির ব্যাপারটা আপাতত মাকে জানাইল না। দেখা যাক বিমলেন্দু কী বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রয়োজন বুঝিলে পরে মাকে বলা যাইবে।
কিছুটা খুঁজিয়া বাড়ি বাহির হইল। ভবানীপুরে বড়ো রাস্তা হইতে ভিতরে গলির মধ্যে বাড়ি। ঢুকিবার দরজা দেখিয়া বোঝা না গেলেও ভিতরে বেশ অনেকখানি জায়গা। চতুষ্কোণ উঠানের বাঁদিকে বসিবার ঘর, কয়েকধাপ সিমেন্ট বাঁধানো সিঁড়ি বাহিয়া উঠিতে হয়। কাজল লক্ষ করিল, কাশীতে সে যে আসবাবগুলি দেখিয়াছিল তাহার মধ্যে কয়েকটি এই ঘরে রহিয়াছে। কাশীর বাড়ি কী ইহারা বিক্রি করিয়া দিল নাকি?
একজন পরিচারিকা তাহাকে বসাইয়া বাড়ির ভিতরে খবর দিতে গেল।
কাজলের বুকের ভিতর অদ্ভুত অনুভূতি হইতেছিল। তুলি এখানে আছে কী? বোধহয় আছে। বিমলেন্দু এতদিন পরে দেশে ফিরিয়া কী আর তাহাকে দূরে রাখিবেন? থাকিলেই বা কী? উহারা তো আর তুলিকে সাজাইয়া গুছাইয়া কাজলের সঙ্গে গল্প করিবার জন্য বাহিরের ঘরে পাঠাইয়া দিবে না। ওসব কথা ভাবিয়া লাভ নাই।
এমন সময় বিমলেন্দু ঘরে ঢুকিলেন। কাজল দেখিল তিনি বিদেশ হইতে সাহেব হইয়া ফেরেন নাই। তাহারা পরনে ধুতি ও হাতকাটা ফতুয়া গোছের জামা। তবে মানুষটি সুন্দর, সাধারণ পোশাকেও তাহার ব্যক্তিত্ব ফুটিয়া বাহির হইয়াছে।
কাজল উঠিয়া তাহাকে পায়ে হাত দিয়া প্রণাম করিতে তিনি তাহাকে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন। প্রাথমিক আবেগ কমিলে কাজলকে বসাইয়া নিজেও একখানি চেয়ারে বসিলেন। বলিলেন–এবার একেবারে বরাবরের মতো ওদেশের পাট তুলে দিয়ে এলাম, বুঝলে? যতই যা বল, নিজের দেশের মতো কিছু না। তোমার মা ভালো আছেন?
নিজের বিদেশে বসবাস এবং ভবিষ্যতে কী করিতে চান সে বিষয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করিবার পর বিমলেন্দু বলিলেন–তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, কিছু মনে করবে না তো?
কাজল বলিল–না না, মনে করব কেন? আপনি বলুন–
—তোমার মা কী রকম মানুষ?
প্রশ্ন শুনিয়া কাজল অবাক হইল। হঠাৎ এ প্রশ্নের অর্থ কী? সে বলিল—আজ্ঞে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনি কী জানতে চাইছেন। মা খুবই ভালো মানুষ–
—আমি আসলে ঠিকভাবে প্রশ্নটা করতে পারছি না। নো অফেন্স—আমি আজ তোমার সঙ্গে একটা খুব জরুরি বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। সেটা করতে গেলে তোমার মায়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি জানা থাকলে ভালো হত। উনি কী খুব অর্থোডক্স?
বিমলেন্দু কী বিষয়ে আলোচনা করিবেন কাজল তাহা বেশ বুঝিতে পারিল। সে বলিলআপনি যদি মায়ের ধর্মবিশ্বাস বা সামাজিক আচারের প্রতি নিষ্ঠার কথা জানতে চান তাহলে বলতেই হবে—আমার মা কিছুটা রক্ষণশীল। তিনি অনুদার বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন, কিন্তু পারিবারিক বা সামাজিক কোনো প্রথাকে হঠাৎ ভাঙতেও পারেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারে একজন সাধারণ মহিলা যেমন হন।
বিমলেন্দু কাজলের দিকে খানিকক্ষণ তাকাইয়া থাকিলেন, তারপর বলিলেন–তুমি বুদ্ধিমান। সম্ভবত বুঝতে পেরেছ আমি কী বলতে চাই। যাক, তাতে ভালোই হল, এমনিতে আমার কথা শুরু করতে সংকোচ হচ্ছিল।
