কাজল যেন কিছুটা অবিশ্বাসের সুরে বলিল—তার মানে আপনি–
-বইখানা আমি ছাপাবো। যত তাড়াতাড়ি পাররা শেষ করে আমাকে কপি দাও—
ঝুঁকিয়া দ্বিজেনবাবুকে প্রণাম করিতে গিয়া কাজল কাঁদিয়া ফেলিল।
বাহিরে আসিয়া কাজল দেখিল হ্যারিসন রোডে ট্রাম চলিতেছে। অফিস-ফেরত লোকের ভিড় চলিয়াহে শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে। জ্ঞানবাবুর চায়ের দোকানে চা-রস-প্রত্যাশীদের সান্ধ্য সমাগম আরম্ভ হইয়াছে। ফুটপাথের উপর কাপড় বিছাইয়া একজন খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোক যশোরের চিরুনি বিক্রি করিতেছে। সবই অবিকল ঠিক অন্য অন্য দিনের মতো। কেবল তাহার জীবনে অনতিদূর ভবিষ্যতে এক আশ্চর্য পরিবর্তন আসিতেছে। সবাইকে কথাটা জানাইয়া দিলে হয় না?
বই বাহির হইবার দশ-বাবোদিন আগে বিখ্যাত সাময়িক পত্রগুলিতে তাহার উপন্যাসের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হইল। হৈমন্তী দেখিয়া ভারি খুশি। বলিল–সেকালে বাণভট্টের ছেলে ভূষণভট্ট বাবার আরব্ধ কাজ শেষ করেছিলেন, তুইও তাই করলি–
কিন্তু রাত্রে শুইয়া কাজলের মনে হইল—বাবার কাজ আমি শেষ করিনি, ও কাজ তো শেষ হয় না। বাবা বিশ্বাস করতেন জীবন অনন্ত, পথের কোন আরম্ভও নেই, শেষও নেই। তিনি যেখানে থেমেছিলেন, আমি সেখান থেকে শুরু করে কিছু পথ হাঁটলাম মাত্র। পথ তো পড়ে রইল সামনে–হয়তো ভবিষ্যতে এখান থেকে কেউ আরম্ভ করবে–
বই প্রকাশিত হইবার পর পাঠকমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। কেহ বলিল—চমৎকার হয়েছে। অপূর্ববাবুর ফিলজফির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে সঙ্গতি রেখে লিখেছেন লেখক। অথচ নকলনবিশী নয়—ভাষায় স্পষ্ট স্বকীয়তা আছে। কেহ বলিল–প্রথম থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছিল লেখক বাবার নাম ভাঙিয়ে খেতে চান, এই উপন্যাস রচনা সে পথেই আর একটি পদক্ষেপ।
সমালোচনা যেমনই হোক, প্রথম মাসে উপন্যাসটির পাঁচশত কপি বিক্রয় হইয়া গেল। তাহার পর বিক্রি কিছুটা কমিলেও মোটামুটি কাটতি বজায় রহিল। দ্বিজেনবাবু বলিলেন—বিরূপ সমালোচনায় ভেঙে পড়বে না। মনে রেখ, বিরূপ সমালোচনাও একটা প্রচার। আসল মতামত দেবে পাঠকেরা—দেখা যাক তারা কী বলে?
প্রথমদিকের দ্রুত বিক্রিব কাছাকাছি আর না পৌঁছাইলেও বইখানা একেবারে গুদামে পড়িয়া রহিল না, কিছু কিছু বিক্রি হইতেই লাগিল।
এইসময় ডাকে তাহার নামে একদিন একখানা খাম আসিল।
কলিকাতা হইতে একটি মেয়ে চিঠি লিখিয়াছে। তাহার পরিবাবের সকলে কাজলের বই পড়িয়া অবাক হইয়া গিয়াছে। ভূমিকার শেষে যে ঠিকানা ছিল সেই ঠিকানা ব্যবহাব করিয়া চিঠি লিখিতেছে। তাহারা কী একবার বাড়িতে আসিয়া লেখকের সহিত আলাপ করিতে পারে?
পারে বইকি, নিশ্চয় পারে। ব্যস্ত হইয়া কাজল স্নান-খাওয়া না সারিয়াই বাহির হইয়া পোস্ট অফিসে গেল এবং সেখানে দাঁড়াইয়াই পত্রের উত্তর দিযা আসিল।
দিনদশেক বাদে এক রবিবার সকালে একজন মধ্যবয়স্ক সৌম্যমূর্তি ভদ্রলোক দুই মেয়ে লইয়া আসিয়া হাজির হইলেন। মেয়েরা স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ে, তাহাদের আচরণ সহজ ও সপ্রতিভ। ভদ্রলোক সরকারি চাকরি হইতে সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করিয়াছেন। তাহারা সকলেই অপুর্বকুমার রায়ের লেখার পরম ভক্ত। বিজ্ঞাপন দেখিয়া প্রথমে বিশ্বাস করেন নাই যে অপূর্ব রায়ের ছেলের উপন্যাস বিশেষ কাজের কিছু হইবে। যাহা হৌক, কৌতূহল হওয়ায় কিনিয়া পড়িয়াছেন এবং আশ্চর্য হইয়া গিয়াছেন।
মেয়ে দুটি মুগ্ধ চোখে কাজলের দিকে তাকাইয়া ছিল। ভদ্রলোক থামিতে তাহাদের মধ্যে বড়োজন বলিল—আমাদের দুইবোনে ঝগড়া হত আপনার বইখানা কে আগে পড়বে তাই নিয়ে। তারপর ঠিক করে নিলাম—একঘণ্টা আমি পড়বো, একঘণ্টা বোন পড়বে—
ছোটজন বলিল—আমরা আগে কখনও এত কাছে থেকে লেখক দেখিনি, জানেন? বাবা দেখেছেনবাবার সঙ্গে শরৎচন্দ্রের আলাপ ছিল–
ভদ্রলোক সবিনয়ে বলিলেন–না না, আলাপ নয়। আমার এক বন্ধুর বাবা নামকরা কবিরাজ ছিলেন। তিনি শরৎচন্দ্রের চিকিৎসা করতেন। তার সঙ্গে একবার শরৎবাবুর বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন তিনি বেশ অসুস্থ, বসে গল্প করার মতো অবস্থা ছিল না। তবে হ্যাঁ, কাছে বসে ছিলাম ঘণ্টাখানেক। সেটাও কম কথা নয়, বলুন–
—তা তো বটেই, বড়ো মানুষের কাছে বসে থাকাই আনন্দ
—আমার তো মনে হয় শরৎবাবুর পর আপনার বাবার মতো সাহিত্যিক বাংলা ভাষায় আর আসেন নি। তার ছেলে আপনি-বইখানা পড়ে সত্যিই আমরা–
ছোটমেয়ে তাহার বইখানি এককপি লইয়া আসিয়াছিল। সেটি বাড়াইয়া ধরিয়া বলিল–আমাদের দুজনের জন্য এতে কিছু লিখে আপনার সই দেবেন দয়া করে?
অটোগ্রাফ! জীবনে ইহাও সম্ভব হইল!
অপুর প্রথম উপন্যাসের শেষপাতা হইতে দুইটি প্রিয় লাইন লিখিয়া নিচে কাজল নিজের নাম স্বাক্ষর করিল। জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ।
জলখাবার খাইয়া পিতা-পুত্রীরা চলিয়া গেল বটে, কিন্তু ব্যাপারটার অনুরণন সারাদিন কাজলের মনের মধ্যে বাজিতে লাগিল।
আরও অনেক লিখিতে হইবে। অনেক–অনেক ভালো লেখা।
তাহার সময় হঠাৎ খুব কমিয়া গেল। স্কুল তো আছেই, তার উপর অপুর বইগুলির ব্যাপারে নানা কাজে ব্যস্ত থাকিতে হয়। নিজের লেখার জন্য যতখানি সময় দেওয়া প্রয়োজন তত সময় হাতে পাওয়া কঠিন হইয়া পড়িতে লাগিল। প্রায় প্রতিদিনই কয়েকজন করিয়া লোক আসে সাহিত্যিক অপূর্ব রায়ের স্ত্রী-পুত্রের সহিত আলাপ করিতে। ছুটির দিনে তাহার সংখ্যা বাড়ে। লিখিতে লিখিতে মাঝপথে উঠিয়া অতিথিসৎকার করিতে হয়। দেড়ঘণ্টা বাদে আবার লিখিতে বসিয়া সে আবিষ্কার করে গল্পটা মাথা হইতে অতিথিদের সহিত বিদায় লইয়াছে। অনেক প্রচেষ্টায় সেটিকে ফিরাইয়া আনিয়া দশলাইন লিখিতে না লিখিতে আবার দরজাব কড়া নড়িয়া ওঠে।
