কোনো না কোনো ঘটনা অবলম্বন করিয়া মানুষের জীবনে পরিবর্তন সূচিত হয়। দিদিমার মৃত্যুতে কাজলের জীবনে সেই পরিবর্তন শুরু হইল। দিদিমা অনেকদিন ধরিয়াই ভুগিতেছিলেন, বিশেষ করিয়া দাদুর মৃত্যুর পর তাহার বাঁচিবার ইচ্ছাটাই চলিয়া গিয়াছিল। একদিন অনেক রাত্রে কাজল শুইয়া বই পড়িতেছে, দরজায় কে কড়া নাড়িল। দরজা খুলিয়া কাজল দেখিল প্রতাপ আসিয়াছে।
-কী ব্যাপার মামা? এত রাত্তিরে?
-মায়ের শরীর খুব খারাপ হয়েছে, রাত কাটে কিনা সন্দেহ। তাই মেজদিকে নিয়ে যেতে এসেছি—
হৈমন্তী চট করিয়া তৈয়ারি হইয়া লইল। কাজল বলিল—আমিও সঙ্গে যাই মা? যদি ওষুধপত্র বা ডাক্তারের দরকার হয়—
প্ৰতাপ বলিল—তুই থাক। বাড়ি খালি রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। সকালে উঠে চলে যাস এখন। তার মধ্যে দরকার হলে কাউকে দিয়ে খবর দেব–
দিদিমা মারা গেলেন পরদিন বিকাল পাঁচটা নাগাদ।
পাড়ার লোকজন এবং কাজলের বন্ধু-বান্ধবরা আসিয়া রাত আটটার মধ্যে সব ব্যবস্থা করিযা ফেলিল। পাড়ার মাতব্বর বৈদ্যনাথ সরকার বলিলেন—আর দেরি কিসের? চল, চল-ওদিকে অনেক সময় লেগে যাবে
কেষ্ট মুখুজ্যের ঘাটে ল্যাম্পপোস্টের মাথায় মিটমিট করিয়া একটা ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলিতেছে। তাহারই ঘোলাটে আলোয় দিদিমার শেষ শয্যা প্রস্তুত হইল। ঊনসত্তর বছর বাঁচিয়া এইমাত্র এক প্রিয়জন পঞ্চভূতে বিলীন হইয়া যাইবে। মুখাগ্নি করিবার জন্য ওই ধারে প্রতাপ প্রস্তুত হইতেছে। পুৰােহিত মহাশয় ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসিয়া নাকে চশমা লাগাইয়া অনুচ্চস্বরে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় পড়িতেছেন। শ্মশানবন্ধুদের কয়েকজন নিজেদের মধ্যে গতকাল পাড়ায় ঘটিয়া যাওয়া কী একটা মুখরোচক ব্যাপার লইয়া আলোচনা করিতেছে। এ সমস্তই থাকিবে, আগামীকাল সকাল হইলেই পৃথিবী আবার আপন কর্মের স্রোতে ভাসিয়া যাইবে। মেঘ গোয়ালা যথাসময়ে দুধ দিতে আসিবে, গলির মুখে খোঁড়া নাপিত ইটের উপর বসাইয়া ব্রিজনাথ ভরতের দাড়ি কামাইয়া দিবে। তাহার দিদিমা হেলেন কেলার, মাদাম কুরি বা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ছিলেন না, কেহ তাহাকে মনে করিয়া রাখিবে না। এমন কী আত্মীয়স্বজনেরাও প্রথমে কিছুদিন শোক করিবে তারপর ভুলিয়া যাইবে।
অথচ দিদিমা কী স্নেহপ্রবণই ছিলেন, সবাইকে লইয়া বাঁচিতে ভালোবাসিতেন। তাহারও আলো-বাতাস সকাল-সন্ধ্যা হাসিকান্না লইয়া একটা আস্ত জীবন ছিল। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সবই যদি এমনভাবে মুছিয়া যাইবে তাহলে বাচিবার সার্থকতা কী?
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, দিদিমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের সহিত তাহার যোগসূত্র প্রায় সবটাই ছিন্ন হইয়া গেল। এইভাবেই বোধহয় যুগ শেষ হইয়া যায়।
ঘাট হইতে ফিরিতে রাত প্রায় আড়াইটা বাজিয়া গেল। ঝুমুর বেড়ালটা পাঁচিলের উপর লম্বা হইয়া ঘুমাইতেছে। বাহিরের দরজা খোলা, ভূষণ সেখানে একটা ভাজ করা শতরঞ্চির উপর বসিয়া ঝিমাইতেছে। সবকিছু কেমন স্বাভাবিক, কেবল দিদিমা নাই।
দিদিমার ঘরের কাছে গিয়া কাজল হঠাৎ চমকইয়া উঠিল। চিরপরিচিত খাটটা আর নাই, এরই মধ্যে তুলিয়া ফেলা হইয়াছে। ওইখানে দিদিমা দরজার দিকে মাথা দিয়া শুইয়া থাকিতেন। কে জানে পুনর্জন্ম আছে কিনা, এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের আত্মা আর ফিরিয়া আসে কিনা। দিদিমার সঙ্গে সত্যই চিরকালের মতো ছাড়াছাড়ি হইয়া গেল।
দিনরাত পরিশ্রম করিয়া সে উপন্যাস প্রায় শেষ করিয়া আনিল। একদিন সে উপন্যাসের প্রথমদিকের শখানেক পাতা সইয়া দুরু দুরু বক্ষে বসু ও গুহ-এর দোকানে গিয়া হাজিব হইল।
দ্বিজেনবাবু কেদারায় হেলান দিয়া উদ্বোধন পত্রিকা পড়িতেছিলেন। তাহাকে দেখিয়া বলিলেন–কী খবর? অনেকদিন তোমায় দেখিনি, ভালো আছ তো? মা কেমন আছেন?
প্রণাম করিয়া কাজল বসিল। কিছুক্ষণ নানা বিষয়ে কথাবার্তা বলিবার পর ইতস্তত করিয়া কাজল বলিল—আমি একটা বড়ো লেখায় হাত দিয়েছি, প্রায় শেষও হয়ে এসেছে। আপনি যদি একটু পড়ে দেখেন–
–বড় লেখা? কী ধরনের বড়লেখা উপন্যাস?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–কী বিষয় নিয়ে লিখছো?
কাজল বলিল–বাবার প্রথম উপন্যাসখানা ওঁর আত্মজীবনীমূলক। উনি যেখানে শেষ করেছেন, সেখান থেকে আমি ধরেছি। বাবা নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন ওঁর জীবনদর্শন ছেলের মধ্যে সঞ্চারিত হোক। সে আশা কতখানি সফল হল তাই নিয়ে আমার লেখা।
দ্বিজেনবাবু বলিলেন—মানে তোমার নিজের জীবন?
কাজল দৃঢ়গলায় বলিল–না। গ্রামের মাটিতে যার উৎস, অথচ শহরের জটিলতায় যে বড়ো হয়ে উঠেছে—এমন একজন বাঙালি ছেলেব জীবন।
দ্বিজেনবাবু কিছুক্ষণ কাজলের দিকে তাকাইয়া থাকিলেন, তারপর হাত বাড়াইয়া বলিলেন–লেখাটা দাও। চার-পাঁচদিন পর আমার সঙ্গে দেখা করবে–
পাণ্ডুলিপি দিয়া কাজল চলিয়া আসিতেছিল, দ্বিজেনবাবু ডাকিলেন—শোন।
-আজ্ঞে?
-আমি কিন্তু তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। লেখাটা পড়ে মতামত জানাবো, এটুকু কেবল জানালাম। লেখা যেমনই হোক, আমি ছাপিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তাতে তোমার সর্বনাশ করা হবে–
কাজল হাসিয়া বলিল—ঠিক আছে। মোপাসা আর ফ্লোবেয়ারের গল্প আমি জানি।
হপ্তাখানেক বাদে কাজল দ্বিজেনবাবুর মতামত জানিতে গেল। তিনি বলিলেন—পড়লাম তোমার লেখা। আর কতদূর বাকি আছে?
–আজ্ঞে দশ-পনেরো দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
-লেখা ভালো হয়েছে। তোমার গদ্য সুন্দর তা তো আগেই বলেছি। অপূর্ববাবুর বইখানা জনপ্রিয়। তাঁর উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব তারই পুত্র লিখেছে—এতে পাঠকদের মনে আগ্রহ জাগা স্বাভাবিক। আমার বিশ্বাস-এ বই পড়ে তারা নিরাশ হবে না।
