গল্পটা লিখিয়া কাজলের ভালো লাগিয়াছিল। সে ভাবিয়াছিল সম্পাদক পড়িয়া নিশ্চয় অবাক হইয়া যাইবেন এবং অবিলম্বে প্রেসে দিবেন। গল্প দিতে যাওয়ার দিন সম্পাদক ছিলেন না। দপ্তরের একজন কর্মচারী লেখাঁটি রাখিয়া বলিয়াছিল-মাসখানেক বাদে খোঁজ করবেন
কাজল একটু আশাহত হইল। খ্যাতনামা কাগজগুলিতে গল্প প্রকাশ হওয়ায় অন্তত পত্রিকার অফিসগুলিতে লোকে তাহার নামটা চিনিতে পারে। কিন্তু এই ভদ্রলোক তাহার পাণ্ডুলিপি ডানদিকের একটা দেরাজে রাখিয়া গম্ভীরভাবে প্রফ সংশোধন করিতে লাগিলেন। একটু ইতস্তত করিয়া সে বলিল—তাহলে–
ভদ্রলোক কিছুটা বিরক্ত হইয়া মুখ তুলিয়া বলিলেন–বললাম যে, মাসখানেক পর!
বাহিরে আসিয়া কাজলের ভারি দুঃখ হইল। মানুষ তো একটু বসিতেও বলে! আহত মর্যাদাবোধ বড়ো খারাপ জিনিস। সারা দিনরাত কাজল বিষণ্ণ হইয়া রহিল। তারপর ভাবিয়া ভাবিয়া ঠিক করিল—লোকটা আমার লেখাটা নিয়েই ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেলল, নাম-টাম কিছুই পড়বার সুযোগ পায়নি। নাম দেখলে কী আর চিনতে পারত না? ও বেচারীর আর দোষ কী? ওদের অফিসে সারাক্ষণ লোকে বিরক্ত করছে, আমাকে তো আর চিনে রাখেনি
মাসখানেক কাটিবার পর একদিন কাজল খুশি ও খেলা-র দপ্তরে খোঁজ করিতে গেল। বাহিরের ঘবে পূর্বদিনের সেই ভদ্রলোক আজ নাই। একজন বেয়ারাকে জিজ্ঞাসা করিয়া
জানিতে পারিল সম্পাদক মহাশয় নিজের ঘরে কাজ করিতেছেন। সে বলিল—একটু দেখা করা যায় না?
–কী দরকার বলুন?
–এমনি একটু প্রয়োজন ছিল—
লোকটি সামান্য ভাবিয়া বলিল—আচ্ছা যান। ওই যে, ওই ঘর–
নির্দেশ দিবার দরকার ছিল না, কারণ সুইং ডোরের ঘষা কাঁচের গায়ে সম্পাদক লেখা কাগজ সাঁটা আছে। সে দরজা ঠেলিয়া জিজ্ঞাসা করিল—আসতে পারি?
ধুতি এবং খন্দরের পাঞ্জাবি পরা সম্পাদক, মাথায় কাঁচাপাকা লম্বা চুল, বিশাল টেবিলের অপর প্রান্তে বসিয়া কী লিখিতেছিলেন। দেখামাত্র কাজল তাহাকে চিনিতে পারিল। ইনি বর্তমান বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব—আধুনিক কবি হিসাবেও খুব নাম করিয়াছেন। সম্প্রতি ছোকরা কবিযশঃপ্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই ইঁহার অনুকরণে লম্বা চুল রাখিতেছে এবং কাঁধে ঝোলা লইয়া ঘুরিতেছে। জলদমন্দ্র কণ্ঠে সম্পাদক জিজ্ঞাসা করিলেন-কী চাই?
কাজল ঘরের ভিতর কিছুটা অগ্রসর হইয়া বলিল—আজ্ঞে, আমি একটা গল্প দিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল মাসখানেক বাদে খবর নিতে–
–তা। এখানে কী?
ভদ্রলোকের আচরণে হৃদ্যতার লেশমাত্র নাই। কাজল বলিল—লেখাটার বিষয়ে জানতে–
—যাঁকে দিয়েছিলেন তার কাছেই খোঁজ করা নিয়ম। এখানে কেন?
—বাইরে কাউকে দেখলাম না, তাই—
—তাই ঢুকে পড়লেন?
বিরক্তমুখে সম্পাদক ঘন্টি বাজাইতেই বেয়ারাটি আসিয়া হাজির হইল।
—এঁকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে কে? রবিবাবু কোথায়?
–আজ্ঞে, উনি টিফিন করতে গিয়েছেন—
–তার টেবিলে বসালে না কেন? যাও, গল্পেব ফাইলটা নিয়ে এস–
সম্পাদক আবার কী লিখিতে লাগিলেন। কাজল দাঁড়াইয়াই রহিল। এই অফিসে কেহ অতিথিকে বসিতে বলে না দেখা যাইতেছে।
বেয়ারা ফাইল আনিয়া দিল। বক্স ফাইলের ঢাকনা খুলিয়া সম্পাদক জিজ্ঞাসা করিলেন— গল্পের নাম কী?
কাজল নাম বলিল। এইবাব গল্প বাহির করিয়া সম্পাদক তাহার নাম দেখিবেন—এবং নিশ্চয় চিনিতে পারিবেন। চিনিতে পারিলেও সম্পাদক মহাশয়ের ব্যবহারে তাহার কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। ফাইল হইতে লেখাঁটি বাহির করিয়া বলিলেন—ও, এই গল্প! নিয়ে যান।
কাজল অবাক হইয়া বলিল—নিয়ে যাব?
-হ্যাঁ। এটা কোনো গল্পই হয়নি। আমি নিজে পড়ে দেখেছি। তাছাড়া বাংলা ভাষার আপনি কিছুই জানেন না। আপাতত লেখা বন্ধ রেখে ভাষার ব্যবহার শিখুন
কিছুটা যেন ছুঁড়িবার ভঙ্গিতে সম্পাদক পাণ্ডুলিপিটি টেবিলের এ প্রান্তে কাজলের সামনে ফেলিয়া দিলেন।
মানুষটির আচরণে এক ধরনের রূঢ় ঔদ্ধত্য আছে যাহা কাজল আগে কখনও দেখে নাই। লজ্জায় অপমানে তাহার কান গরম হইয়া উঠিল। কাগজগুলি হাতে লইয়া সে কোনোরকমে বাহির হইয়া আসিল।
রাস্তায় সবাই যেন তাহার দিকেই তাকাইয়া মুচকি মুচকি হাসিতেছে। সবাই কী করিয়া জানিয়া ফেলিয়াছে এইমাত্র সে পত্রিকার দপ্তর হইতে অপমানিত হইয়া বাহির হইল! বাড়ি ফিরিবার সময় ট্রেনে জানালার ধারে বসিয়া সে মান-অপমানের নিরর্থকতা এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে অবিচল থাকিয়া নিজের কর্তব্য করিবার বিষয়ে মহাপুরুষদের অনেক ভালো ভালো কথা স্মরণ করিল। কিন্তু দেখিল তাহাতে অপমানের জ্বালা কমে না।
ভদ্রলোক নিজে একজন কবি। কবিদের সম্বন্ধে কাজলের মনে বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধার আসন ছিল। তাহারা কী সবাই এমন হয় নাকি? অকারণে তাহার সহিত এরূপ ব্যবহারের কারণ কী? লেখা পছন্দ না হইলে সে কথাটা মধুর করিয়াও তো বলা যাইত।
অনেকদিন পরে বাট্রান্তু রাসেলের প্রবন্ধ পড়িতে গিয়া কাজল ইহার উত্তর পাইয়াছিল। রাসেল বলিয়াছেন ক্ষমতার ব্যবহারেই ক্ষমতা অর্জনের সুখ। দুইটা মাথাই যদি না কাটিতে পারিলাম তাহা হইলে ধারালো তলোয়ারের মালিক হইয়া কী লাভ? মানবসভ্যতা নামক ব্যাপারটি এই ক্ষমতা দখলেরই ইতিহাস। নিতান্ত উচ্চকোটির মহাপুরুষ না হইলে এ প্রলোভন এড়ানো কঠিন।
সম্পাদকগণ সকলেই কিছু মহাপুরুষ নহেন।
ঘটনার দার্শনিক এবং মনস্তাত্তিক ব্যাখ্যা যাহাই হোক, কাজল পরিষ্কার বুঝিতে পারিল, লিখিয়া খ্যাতি অর্জন করা খুব সহজ কাজ হইবে না।
