অপালা বলিল—প্রায় একশো বছর ওই বাড়ি এমনি পড়ে রয়েছে, দাদুর ঠাকুরদার আমলের বাড়ি। তখন আমরা এই অঞ্চলের জমিদার ছিলাম, জানেন?
অপালা তাহার বংশের পূর্ববৃত্তান্ত বলিতেছিল। শুনিতে শুনিতে কাজল অন্যমনস্ক হইয়া গেল। বিশাল বাড়ির ভগ্নস্তূপটা তাহাকে কেমন যেন মুগ্ধ করিয়াছে। কেমন ছিল একশত বৎসর আগের সেই মানুষগুলি? যাহারা এই বাড়িতে বাস করিত, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করিত? তাহাদের কাছে একান্ত বাস্তব সেই বর্তমান আজ এক শতাব্দী পিছাইয়া পড়িয়াছে–যেমন সে নিজে একদিন অতীত ইতিহাসে পর্যবসিত হইবে।
সান্ধ্য-আরতি ও ভোগের আয়োজনে সাহায্য করিতে অপালা বাড়ির ভিতরে চলিয়া গেল। দুই-একজন ছাড়া কাজল এ বাড়ির অন্যদের এখনও ভালো করিয়া চেনে না, অচেনা মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকিবার ইচ্ছা না করায় সে আমবাগানের ওপাশে দীঘির বাঁধানো ঘাটের উপর আসিয়া বসিল। একেবারে উপরের ধাপে বসিবার জন্য দুই দিকে বেদি করা আছে, তাহারই একটিতে নন্দলাল চক্রবর্তী অঘোরে ঘুমাইতেছে। দীঘির জলে প্রাচীন গাছেদের শান্ত ছায়া। অপরাহু গাঢ় হইয়া আসিয়াছে, গাছের ডালে ডালে বাসায় ফিরিয়া আসা পাখিদের কলরব। এই শান্তির আবাস ছাড়িয়া লোভী মানুষ শহরে চলিয়া গিয়াছে। ভুল বুঝিয়া যখন ফিরিবে, এই পরিবেশ আর থাকিবে কি?
নন্দলাল ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া বসিল, আড়ামোড়া ভাঙিয়া চারদিকে তাকাইয়া বলিল—যাঃ, বেলা গিয়েছে দেখছি।
কাজল বলিল–ভালো ঘুম হল? তোমার বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যাবে–
-আজ আর ফিরবো না ভাবছি। শুনলাম ঠাকুরবাড়ি রাত্তিরে লুচি-ভোগ হবে। জনাই থেকে মণ্ডা এনেছে, তাও দেবে। আমরা গাঁয়ের মানুষ, এসব তো বড়ো একটা খেতে পাই না–আমাদের এদিকে পুজোর প্রসাদ বলতে দুটো আখের টিকলি, একমুঠো কুচোনো ফলমূল আর কয়েকটা পিপড়েধরা ফোপরা বাতাসা। থেকে যাই রাতটা–
কাজল জিজ্ঞাসা করিল—না ফিরলে বাড়ির লোক ভাববে না? বলে এসেছো?
—কে ভাববে বলুন! আমার মা নেই, ছোটবেলাতেই মরে গিয়েছে। বারা একজন সেবাদাসী রেখেছে—সে আমাকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। ভাববে কে?
কাজল অবাক হইয়া বলিল—সেবাদাসী মানে?
নন্দলাল নির্বোধের মতো হাসিয়া বলিল—মানে যা, তাই। বিয়ে করা বউ নয়, তবু বারো বছর আমাদের সংসারে রয়েছে। নিজের বাবার কথা নিজে বলতে লজ্জা করে। এখন বাবার শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছে, সংসারের সবকিছু সেই সেবাদাসীর হাতের মুঠোয়। আমি ফিরলাম কী ফিরলাম না কেউ খোঁজও করবে না হয়তো—
পুকুরের জলের দিকে তাকাইয়া কিছুক্ষণ নন্দলাল কী ভাবিল, তারপর কাজলকে জিজ্ঞাসা করিল—আপনি কখনও জনাইয়ের মণ্ডা খেয়েছেন?
কাজল হাসিয়া বলিল—কী জানি, মনে পড়ছে না—
—তাহলে খাননি। ও জিনিস খেলে মনে থাকত। ওপরে পাতলা চিনির রসের পলেস্তারা থাকে, তার ভেতরে নরম সন্দেশ। নাম হচ্ছে-কী যেন বলে-মনোহরা। চৌধুরীদের ছোট মেয়ের বিয়েতে খাইয়েছিল। ওই একবারই খেয়েছি। তা আজ যখন শুনলাম—পুরুতমশাইও দালানের একদিকে থাকতে দিতে রাজি হয়েছেন—থেকেই যাই
মুখ-হাত ধুইবার জন্য নন্দলাল ঘাটের সিঁড়ি দিয়া নামিয়া গেল। সেদিকে তাকাইয়া এই সুখাদ্যলোলুপ দরিদ্র ব্রাহ্মণসন্তানটির জন্য কাজলের মায়া হইল। একবার ইহাকে তাহাদের বাড়ি নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইলে হয় না?
সন্ধ্যাবেলা আরতির পর কাজল আবার দীঘির ঘাটে গিয়া বসিল। বাঁধানো ঘাটে নবমীর জ্যোৎস্না পড়িয়াছে। ওপারের নারকেল গাছের পাতায় চাঁদের আলো পড়িয়া চিকচিক করিতেছে। খানিকক্ষণ এমন জায়গায় বসিলেই মনের সব ঢেউ শান্ত হইয়া আসে। সুটকেস হইতে খাতা আর কলমটা লইয়া আসিলে চাদের আলোয় কবিতা লেখা যাইত।
হঠাৎ ছোট্ট হাসির শব্দে চমকাইয়া কাজল দেখিল কখন ঘাটের উপর অপালা আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।
—আমি ঠিক ভেবেছি আপনি এইখানে এসে বসে আছেন।
কাজল বলিল–শহরে থাকি তো, এমন জ্যোৎস্না, পুকুরঘাট, এমন নির্জনতা—এ সবই আমার কাছে নতুন। বেশ লাগছিল বসে থাকতে।
অপালা বলিল—আমার কাছেও। বাংলার গ্রাম তেমন করে দেখিই নি। লোকে পয়সা খরচ করে দূর দেশে বেড়াতে যায় কেন বলুন তো? যা আমি আগে কখনও দেখিনি, তাই তো আমার কাছে রহস্যময় নতুন দেশ, না?
কাজল অপালার সহিত একমত হইল।
বাড়ি হইতে দূরে পুকুরঘাটে রাত্রিবেলা অবিবাহিতা কোন মেয়ের অনাত্মীয় যুবকের সহিত এভাবে বসিয়া গল্প করাটা সমীচীন নয়, বাঙালি সমাজে মানুষ না হওয়ায় অপালা তাহা বুঝিতে পারিতেছে না। কিন্তু তাহার নিষ্পাপ সারল্যে আঘাত করিতে কাজলের বাধিল। সে বলিল—একটু একটু হিম পড়তে শুরু করেছে, না? চলো বরং বাড়ির ভেতরে গিয়ে বসি—
অপালা প্রখর বুদ্ধিমতী, কিন্তু জীবনের ব্যবহারিক দিকগুলিতে তাহার কোনো অভিজ্ঞতাই নাই। সে কাজলের ইঙ্গিত বুঝিতেই পারিল না, বলিল—আপনি ভারী শীতকাতুরে তো! কোথায় হিম? আমার মতো ছোটবেলা থেকে হিমালয়ের কাছাকাছি থাকলে বুঝতেন শীত কাকে বলে! বসুন না আর একটু, গল্প করি–
বাধ্য হইয়া কাজল বসিল। সামাজিকতার হানি ঘটে বলিয়া মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি থাকিলেও অপালার মতো মেয়ের সহিত জ্যোৎস্নায় একান্তে বসিয়া কথা বলিবার নেশা আছে। দুইজনে অনেক গল্প করিল। বেশির ভাগ গল্পেরই তেমন কোন প্রাসঙ্গিকতা নাই। কিন্তু প্রথম যৌবন, শরতের আশ্চর্য জ্যোৎস্না সামনে বিস্তৃত, পথের সবটা দেখা যায় না কে জানে তাহার অদৃষ্টে বাঁকে বাঁকে কত রোমাঞ্চ ও শিহরণ অপেক্ষা করিয়া আছে—প্রাসঙ্গিকতার খোঁজ কে করে, তারুণ্যই আসল, তারুণ্যের আনন্দই মানুষকে সঞ্জীবিত করিয়া রাখে।
