আজও হয় নাই। কে জানে কোনোদিন হইবে কিনা।
কাজলের সিগারেট শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে দূরে পথে উপব একজন লোক দেখা দিল। লোকটা স্টেশনের দিক হইতেই আসিতেছে। কাছে আসিতে বোঝা গেল মানুষটি পুববাহিত শ্রেণির। তাহার পরনে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, গায়ে নামাবলী, ছোট ছোট কবিযা চুল ছাঁটা। কপালে এবং নাকে চন্দনের ছাপ। খালি পা, হাতে একখানি পিতালের সাজি—তাহাতে পূজার কিছু উপকরণ। সে হনহন করিয়া হাঁটিায় আসিল এবং কাজলের সামনে দাঁড়াইয়া পড়িয়া অমায়িকভাবে একগাল হাসিল।
কাজল তাহাকে আদৌ চেনে না, কাজেই এ ঘনিষ্ঠ হাসির মর্মোদ্ধার করিতে না পারিয়া সে কী বলিবে ভাবিতেছে, এমন সময় লোকটিই তাহাকে প্রশ্ন করিল—বাবু কী কোথাও যাবেন? এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে?
কাজল তাহার গন্তব্যের কথা বলায় সে বলিল—খুব চিনি, আপনি আমার সঙ্গে চলুন। আমিও তো সেখানেই যাচ্ছি। আপনার বুঝি সেখানে নেমন্তন্ন?
লোকটির বয়েস বেশি নয়, কাজলেরই সমান হইবে। বাকি পথটা সে আপনমনে গল্প করিতে করিতে চলিল। তাহার কথাবার্তা শুনিয়া মনে হয় সে পুরাপুরি পাগল না হইলেও কিছুটা ছিটগ্রস্ত বটেই।
কাজল বলিল—আপনি কী এই গ্রামেই থাকেন?
উত্তরে লোকটি জিজ্ঞাসা করিল—আপনি কী ব্রাহ্মণ?
কাজল বলিল—হাঁ। কেন বলুন তো?
–তাহলে আমাকে আপনি বলবেন না। বয়েসে আমি আপনার চেয়ে কিঞ্চিৎ ছোটই হব—
বলিয়া সে নিচু হইয়া খ করিয়া কাজলের পায়ের ধুলা নিতে গেল। কাজল ব্যস্ত হইয়া বলিল—আরে না না, থাক। আচ্ছা তুমিই বলবো এখন–
পথ চলিতে চলিতে লোকটি বলিল—আমার নাম নন্দলাল-নন্দলাল চক্রবর্তী। থাকি এখান থেকে চারক্রোশ দূরে নাটাবেড় গ্রামে। সকালবেলা উঠে পুজোআচ্চা সেরে এতটা পথ হেঁটে আসতে বেলা হয়ে গেল। আসবার সময় আবার মহেন্দ্র বিশ্বাসের আড়তে গণেশের নিত্যপুজাটা করে আসতে হল কিনা—ওরা মাসে তিন টাকা করে দেয়, আর এই পুজোর আগে একখানা কাপড়। এই দেখুন না, তাদের দেওয়া কাপড়ই তো পরে রয়েছি। কেমন, ভালো না?
কাজল বলিল—হাঁ, বেশ সুন্দর।
-হবে না কেন বলুন! বিরাট বড়োলোক তাঁরা, বাবার আমল থেকে আমাদের যজমান। বাবা বাতের ব্যথায় চলাফেরা করতে পারে না, তাই এখন আমিই পুজো সারি। তবে বড়োলোক হলেই হয় না, দেবার মনও থাকা চাই। লালু মুখুজ্জের বাড়ি গত তিনবছর ধরে প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ পুজো কবছি-তা ববাবর সেই একসিকি দক্ষিণা আর দেড়সের চাল! এবার কত বললাম আমার পুজো করার কাপড় ছিঁড়ে গিয়েছে, একখানা কিনে দাও। শেষ অবধি কী দিলো, জানেন?
-কী?
-একখানা গামছা। তাও আবার কেমন, ষষ্ঠীর দিন সেইটে পরে চান করেছি—তারপর দেখি রঙ উঠে কোমরের নিচে থেকে হাঁটু অবধি একদম সবুজ। বুঝুন কাণ্ড!
কাজল বলিল—তোমারও বুঝি পুজোবাড়িতে নেমন্তন্ন?
নন্দলাল সহজভাবেই বলিল—না, আমায় কী আর আলাদা করে চেনে যে নেমন্তন্ন করবে? পুজোয় ভালো খাওয়ায় শুনে গতবছরও এসে খেয়ে গিয়েছিলাম। ব্রাহ্মণের এতে কোন অপমান নেই, বলুন! আমাদের পেশাই হল ভিক্ষা। ওই যে, পুজোবাড়ি দেখা দিয়েছে
রাস্তা হইতে একটু ভিতরে ঘন সবুজ গাছপালার ছায়ায় বাড়িটা। জায়গায় জায়গায পলেস্তাবা খসিয়া সেকেলে পাতলা ইট দেখা যাইতেছে। ঢুকিবার দরজার দুই পাশে পূর্ণঘট এবং কলাগাছ বসানো। দরজা পার হইলেই বিশাল বাঁধানো উঠান, উঠানের প্রান্তে ঠাকুরদালান। সেখানে ডাকের সাজ দেওযা দেবীপ্রতিমার সামনে কয়েকটি বালক-বালিকা বসিয়া কলরব করিতেছে। লালপাড় গরদের শাড়ি পরা ফরসা একজন প্রৌঢ়া মহিলা হাতে একটি তামার পাত্র লইয়া কী কাজে ঠাকুরদালানে আসিতেছিলেন, কাজলকে দেখিয়া তিনি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেনতুমি কে বাবা? কাউকে খুঁজছো?
কাজল উত্তর দিবার আগেই কোথা হইতে অপালা আসিয়া হাজির হইল।
-ওমা! সত্যি এসেছেন তাহলে আসুন, বাড়ির ভেতরে আসুন-পথ চিনতে অসুবিধে হয়নি তো?
নন্দলালের বোধহয় আরও গল্প করিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কাজল বাড়ির ভিতর চলিয়া যাওয়ায় সে ঠাকুরদালানের একদিকে দুপুরবেলা খাওয়ার ডাক পড়িবার আশায় বিমর্ষমুখে একা বসিয়া রহিল।
অপালার দাদু-দিদিমা মানুষ ভালো, তাঁহারা কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজলকে একান্ত আপন করিয়া লইলেন এবং অপালার সহিত তাহার সম্পর্ক লইয়া নানাবিধ ইঙ্গিতপূর্ণ রসিকতা করিয়া আসর জমাইয়া তুলিলেন। অপালার বাবা স্বল্পবাক মানুষ কিন্তু তাহার সংযত ব্যক্তিত্বের মধ্য হইতে একটা সহৃদয়তার প্রভাব ফুটিয়া বাহির হয়। তিনি অপুর বইয়ের পরম ভক্ত, অপুর ছেলেকে দেখিয়া প্রকৃতই খুশি হইলেন।
দুপুর ঠাকুরদালানের ডানধারে লম্বা বারান্দায় চাটাইয়ের আসন পাতিয়া খাইবার জায়গা হইল। এক সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশজন লোক দুই সারিতে বসিয়া খাইতেছে। কাজলের মুখোমুখি নন্দলাল বসিয়াছে, চোখে চোখ পড়িতে সে খুশির হাসি হাসিল। খাইবার পদের বিশেষ বাহুল্য নাই। নিজেদের চাষের ঈষৎ মোটা চালের ভাত, কুমডোভাজা, ডাল, দুইরকম তরকারি, চাটনি ও পায়েস। কাজলের পাতে চাটনি পড়িবার সময় সে তাকাইয়া দেখিল নন্দলাল তৃতীয়বার ডাল চাহিয়া লইয়া ভাত মাখিতেছে।
খাইবার পর অপালা সমস্ত বাড়িটা ঘুরিয়া দেখাইল। বলিল—এটা কিন্তু নতুন বাড়ি, দাদুদের আদি বাড়ি ওইদিকে, আসুন দেখাই
আম-জাম-কাঁঠাল গাছের সারি পার হইয়া একটা বহু পুরাতন পাকাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আগাছার জঙ্গলের মধ্যে পড়িয়া আছে। ছাদ ভাঙিয়া পড়িয়াছে অনেকদিন, ইট বাহির হওয়া দেওয়ালগুলি কোনমতে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। খসিয়া পড়া কড়ি-বরগা এমনভাবে ছড়াইয়া আছে যে, তাহা পার হইয়া ভিতরে যাওয়া অসম্ভব।
