চন্দ্রালোকিত এই রাত্রির কথা সে কোনোদিন ভোলে নাই।
পরের দিন বিদায় লইয়া চলিয়া আসিবার সময় নন্দলাল আবার সঙ্গী হইল। কিছুদূর হাঁটিবার পর নন্দলাল হঠাৎ দাঁড়াইয়া পড়িল। কাজল বলিল–কী হল? থামলে যে?
নন্দলাল ঘাড় চুলকাইয়া লজ্জিতমুখে বলিল—আপনি একটু এগিয়ে ওই পথের মোড় একটু বসুন, আমি এক্ষুনি আসছি–
কাজল প্রথমে বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিল—কেন, তুমি কোথায় যাচ্ছো?
—এইখানে পথের ধারে জল আছে, সুবিধে হবে। আপনি বসুন, আমি এক্ষুনি আসব।
রাস্তার পাশে নয়ানজ্বলিতে জল জমিয়া আছে বটে। সেদিকে তাকাইয়া কাজল ব্যাপারটা বুঝিতে পারিল। গতরাত্রে অপরিমিত লুচি ও মণ্ডা খাইয়া নন্দ বেসামাল হইয়াছে। লোকটাকে ফেলিয়া আসা যায় না, তাহাকে কিছুক্ষণ বসিতেই হইল।
তাহার ট্রেন আসা পর্যন্ত নন্দলাল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া রহিল। কাজল তাহাকে ঠিকানা দিয়া বলিল–সুযোগ করে একদিন আমার বাড়ি যেয়ো, আমার মা খুব ভালো রান্না করেন, তোমাকে পেট ভরে খাওয়াব–
নন্দলাল কৃতজ্ঞতার হাসি হাসিল।
বিজয়ার দিন সন্ধ্যাবেলা কাজল নদীর ধারে প্রতিমা বিসর্জন দেখিতে গেল। অন্যদিন এই সময়ে জায়গাটা নির্জন হইয়া আসে। আজ সেখানে বহু লোকের চেঁচামেচি। মানুষের কাঁধে করিয়া, লরি করিয়া ঠাকুর আসিতেছে। সব দলই সঙ্গে করিয়া পেট্রোম্যাক্স লণ্ঠন আনিয়াছে, কেহ কেহ আবার মশাল জ্বালাইয়া হাতে লইয়াছে। কোন ঠাকুর ঘাটের ধাপে দাঁড়াইয়াই বিসর্জন হইল, কোন দল নৌকায় চাপাইয়া মাঝনদীতে প্রতিমা লইয়া চলিল, সেখানে বিসর্জন দেওয়া হইবে। ঘাটের উপর কোলাহলরত জনতার দিকে তাকাইয়া কাজলের বছর চারেক আগের এমনই একটি বিজয়ার দিনেব কথা মনে পড়িল।
সে তখন সবে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হইয়াছে। আজকের মতোই একা ঘুরিতে ঘুরিতে নদীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। ঠিক সেই সমযটা নদীর ধার নির্জন, কোন প্রতিমা নাই। কাজলের হঠাৎ নদীর জলে একটু হাত ডুবাইতে ইচ্ছা করিল। কোন বিশেষ কারণে নয়, প্রবহমান জল দেখিলেই মানুষের স্পর্শ করিতে ইচ্ছা করে, তাই। আস্তে আস্তে সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া গিয়া সে ঠাণ্ডা জলে আঙুল দিয়া রেখা কাটিয়া খেলা করিতে লাগিল। ভেজা হাত লইয়া মুখে বুলাইয়া দিল। কিছুক্ষণ বসিবার পর হঠাৎ ঢাক-ঢোলের শব্দে উপরে তাকাইয়া দেখে প্রতিমা লইয়া একটি বিসর্জনের দল আসিয়া হাজির হইয়াছে। সে সন্ত্রস্ত হইয়া একপাশে সরিয়া গেল। যাহারা বিসর্জন দিবে তাহারা দাঁড়াইয়া রহিল। সম্ভবত কাহাদের বাড়ির পূজার ঠাকুর, বাড়ির মহিলারাও সঙ্গে আসিয়াছেন। উপরে উঠিতে গিয়া কাজল থামিয়া গেল।
দলের মধ্যে একটি মেয়ে দাঁড়াইয়া বিসর্জন দেখিতেছে। বছর সতেরো-আঠারো বয়েস। পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি। ঘনকুঞ্চিত লম্বা চুল কোমর ছাড়াইয়া নামিয়া আসিয়াছে। পাশেই কাহার হাতে মশাল জ্বলিতেছে, মেয়েটির মুখে সেই আলোর প্রভা। গোল মুখখানি, টানা-টানা দুই চোখ-মশালের আলো পড়িয়া যেন দুর্গাপ্রতিমার মুখে ঘামতেল চকচক করিতেছে।
দৃশ্যটা ভারি সুন্দর লাগিয়াছিল। কাহাদের মেয়ে কে জানে? হয়ো কবেই বিবাহ হইয়া গিয়াছে, কতদূরে চলিয়া গিয়াছে হয়তো বা। তবু চার বছর আগের ঘটনাটা সে ভুলিতে পারে নাই।
আজ আবার মনে আসিল।
বাড়ি ফিরিয়া মাকে বিজয়ার প্রণাম করিতেই হৈমন্তী বলিল—তুই এসে গিয়েছিল, ভালো হয়েছে। এত দেরি করলি কেন? একটা রিকশা ডেকে নিয়ে আয় দেখি, মার কাছে যাব
কাজল বলিল—আজ রাত্তিরে আর কেন মা? কাল সকালে বরং
-না রে, এখুনি একবার যেতেই হবে। তুই বাড়ি ছিলি না, প্রতাপ এসে খবর দিয়ে গেল মায়ের খুব শরীর খারাপ। আমি আজই একবার যাব।
দিদিমার শরীর খারাপ শুনিয়া কাজলের চিন্তা হইল। দাদু মারা যাইবার পর হইতেই দিদিমা কেমন একরকম যেন হইয়া পড়িয়াছেন। আগেই হৃদযন্ত্রের গোলমাল ছিল, আজকাল বিছানা ছাড়িয়া ওঠা দূরের কথা, নিজে পাশও ফিরিতে পারেন না। সেবা ও পরিচর্যার জন্য সবসময়ে কাহাকেও কাছে থাকিতে হয়। কাজল সপ্তাহে অন্তত দুইদিন গিয়া দিদিমাকে দেখি আসে।
মামাবাড়ির বারান্দায় পুরাতন চাকর ভূষণ বসিয়া আছে। তাহারা রিক্শা হইতে নামিতেই সে মেজদি এসেছেন? বলিয়া হৈমন্তীকে প্রণাম করিল।
—ভালো আছো ভূষণ? মা কেমন আছে?
–খুব ভালো না। আজ একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে। যান, ভেতরে যান–
ঘরে ঢুকিয়া কাজল দেখিল দিদিমা চোখ বুঁজিয়া শুইয়া আছেন। দুই অবিবাহিত মাসি সীতা ও প্রভা পাশে বসিয়া হাওয়া করিতেছে ও কপালে জলপটি দিতেছে। হৈমন্তীকে দেখিয়া প্রভা মায়ের কানের কাছে মুখ লইয়া বলিল—মা, ও মা-মেজদি এসেছে
বার-দুই বলিবার পর দিদিমা একবার তাকাইয়া দেখিলেন। উদাসীন নিস্পৃহ দৃষ্টি। তারপব আবার চোখ বন্ধ করিয়া পড়িয়া রহিলেন।
হৈমন্তী খাটের এককোণে বসিয়া বলিল—কবে থেকে এমন হয়েছে?
প্রভা বলিল—আজই সকাল থেকে। নইলে তো তোকে আগেই খবর দিতাম। তাও এতটা বাড়াবাড়ি হবে বুঝতে পারিনি। সকালে বলছিলেন মাথায় ব্যথা কবছে, মাথা ঘুরছে। দুপুবেব পর থেকে দেখি আর বিশেষ কথাবার্তা বলছেন না—
—প্রতাপ কোথায়?
সীতা বলিল—দাদা হেমন্তবাবুকে খবর দিতে গিয়েছে—
হেমন্তবাবু আজ বহুদিন মামাবাড়ির পারিবারিক চিকিৎসক। হঠাৎ কোন ছোটোখাটো প্রয়োজনে পাড়াব সুরেশ ডাক্তারকে ডাকা হইলেও বিপদ ঘোরালো হইলে হেমন্তবাবুই ভবসা। বেঁটেখাটো কিন্তু বিপুলায়তন মানুষটি। পোশাকে নিখুত পবিচ্ছন্নতা আছে। সমস্ত ব্যক্তিত্বে সহৃদয় বহুদর্শিতার ছন্দ। হেমন্তবাবু সেই বিবল চিকিৎসকের একজন, যাঁহারা ঘরে ঢুকিলেই বোগী আশ্বাস পাইয়া বালিশে ভর দিয়া উঠিয়া বসে।
