—সে চিন্তা করবেন না। তারা তোক খুব ভালো, চট করে এমন আপন করে নেবেন যে আপনার মনেই হবে না আপনি নতুন লোক। তাছাড়া–
অপালা চুপ করিয়া গেল। কাজল বলিল—তাছাড়া কী?
অপালা তাহার দিকে তাকাইয়া বলিল–তাছাড়া আমি তো আপনাকে চিনি। আমি আপনার সঙ্গে থাকবো।
বাড়ি ফিরিবার পথে চৌমাথার মোড়ের দোকান হইতে কাজল এক প্যাকেট সিগারেট কিনিল। পথে আজ কী কারণে যেন লোজন কম। বাতাসে কিসের নেশা, প্রতিদিনকার সাধারণ দৃশ্যই চোখে অপূর্ব ঠেকিতেছে। অনেক কিছু যেন বলিবার আছে, এখুনি কাছাকাছি কোন বন্ধুকে পাইলে তাহাকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলা চলিত। কিন্তু কী যে বলিত কাজল তাহা অনেক ভাবিয়াও স্থির করিতে পারিল না।
একটা সিগারেট ধরাইয়া কাজল হাঁটতে শুরু করিবে, পিছন হইতে দোকানী ডাকিল-বাবু, খুচরা পয়সা তো লেকে যাইয়ে
-ওঃ, হা–পয়সা ফেরত লইতে হইবে বটে।
নদীর ধারে সন্ধ্যার অন্ধকার নামিয়াছে। বাড়ি যাইতে গিয়া কাজল কেন যে এখানে আসিল তাহা সে নিজেই জানে না। বৈকালী বায়ুসেবনকারীর দল বেশ কিছুক্ষণ হইল চলিয়া গিয়াছে। আরছা অন্ধকারে বাবলাগাছের সারি বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়াইয়া আছে। নদীর ওপারে পশ্চিম দিগন্তে সন্ধ্যাতারার অগ্নিময় ইশারা। পাড়ের কাছে ছলাৎ ছলাৎ করিয়া ঢেউ আসিয়া লাগিতেছে। কাজল বেশ বুঝিতে পারিল জীবন বদলাইয়া যাইতেছে, নতুন দিকে বাঁক নিতেছে। এতদিন যেমন চলিতেছিল তেমন আর চলিবে না। তাহার পছন্দ-অপছন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর এতদিন যাপন কৰা একক জীবনের বিভিন্ন ছোট-বড় ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া একটা বিশেষ ধরনের পরিবর্তনের সুর জাগিয়া উঠিতেছে। নদীর জলের শব্দে, এই সান্ধ্য নির্জনতায় আর পশ্চিমাকাশের নক্ষত্রের দীপ্তিতে যেন আসন্ন সেই পরিবর্তনের সুস্পষ্ট সংকেত।
রাত্রে খাইবার সময়ে হৈমন্তী বলিল—অপালার কথা শুনে মনে হল তোর সঙ্গে ওর অনেকদিনের যোগাযোগ। অথচ তুই বললি এই নাকি তোদর দ্বিতীয়বার দেখা। ব্যাপারটা কী?
কাজল আমতা আমতা করিয়া বলিল–না, মানে-মাঝে-মধ্যে চিঠিপত্র দিত আর কি
-তুই দিতিস না?
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিবার পর কাজল বলিল—দিতাম।
হৈমন্তী বলিল—আমি একটা কথা বুঝতে পেরেছি। মেয়েটা তোকে পছন্দ করে। তোর কথা আমি জানিনে—এসব নিয়ে খেলা নয়, ভালো করে নিজের মন বুঝে দেখতেমন বুঝলে সময় থাকতে সরে আসা ভালো। নইলে তোর চেয়ে মেয়েটা কষ্ট পাবে বেশি। সবদিক বিচার করে দেখার আগে বেশি ঘনিষ্ঠতা করে ফেলিস না।
জীবনে এই প্রথম মা তাহার সহিত বড়োদের মতো সমানে সমানে কথা বলিল।
১৩. নারায়ণশিলা গ্রামটি বনেজঙ্গলে পূর্ণ
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
নারায়ণশিলা গ্রামটি বনেজঙ্গলে পূর্ণ। মাত্র ত্রিশ মাইল দূরের কলিকাতা শহরে যে বিংশ শতাব্দী তাহার আধুনিক ভাবনাচিন্তা এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার লইয়া মহাপ্রতাপে রাজত্ব করিতেছে, এ গ্রামের গভীর বাঁশবন, ছায়াচ্ছন্ন আম-কাঠালের বাগান আর অধিবাসীদের নিরুদ্বেগ জীবনযাত্রা দেখিয়া তাহা আন্দাজ করিবার কোন উপায় নাই। নিকটবর্তী রেলওয়ে স্টেশন হইতেও গ্রামটি মাইল চারেক দূর। অপালা গরু বা ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা রাখিতে চাহিয়াছিল, কাজল হাসিয়া বলিয়াছিল–আমি গ্রামেরই ছেলে, চার মাইল হাঁটার ভয়ে কাবু হই না। তাছাড়া ধরো যদি কোনও কারণে না যেতে পারি, তাহলে আমোক অতদূর এসে গাড়ি ফিরে যাবে। কিছু দরকার নেই–
ছোট সুটকেসটা হাতে লইয়া ধুলায় ভরা পথে হাঁটিতে হাঁটিতে কাজল ভাবিল-কীটস কী সত্যি কথাই লিখে গিয়েছেন। শহরের সেই ধোঁয়া আর ময়লা, গাড়িঘোড়ার আওয়াজ-আই হ্যাভ ল বীন ইন এ সিটি পেন্ট! এমন সবুজ গাছপালা না দেখলে মানুষ বাঁচে?
পথটা এক জায়গায় আসিয়া দু-ভাগ হইয়া গিয়াছে। এখানে একবার জিজ্ঞাসা না করিয়া লইলে পথ ভুল হইবার খুবই সম্ভাবনা। কিন্তু জায়গাটা সেইমুহূর্তে একেবারেই জনমানবশূন্য। কাজল সুটকেসটা নামাইয়া সিগারেট ধরাইল, এখানে একটু বিশ্রাম করিয়া লওয়া যাইতে পারে। পৌঁছাইবার এমন কিছু তাড়া নাই। শহরে সকাল হইতেই কর্মব্যস্ততা শুরু হইয়া যায়। সব কাজেরই পৃথিবীতে প্রয়োজন আছে কিনা কে জানে, কিন্তু দুনিয়াসুদ্ধ লোক সারাদিন খাঁটিয়া খুন হয়। এমন কি ছুটির দিনেও প্রকৃত বিশ্রাম পাওয়া কঠিন। সবাই যত কাজ জমাইয়া রাখে আর ছুটির দিনে তাহার কাছে আসিয়া হাজির হয়। এইরকম বাহির হইয়া পড়িলে তবে ইচ্ছামতো কিছু করিবার সুযোগ মেলে।
রাস্তার ধারেই মাদারগাছের ডালে কিকি করিয়া শালিক ডাকিতেছে। ঝিরঝিরে বাতাসে মুক্তির স্বাদ। বর্ষার জলে সতেজ হইয়া গাছপালা গভীর সবুজ সাজ পরিয়াছে। পৃথিবীর অনেক স্থানে ব্যবসায়িক লাভের জন্য এমন সুন্দর অরণ্যশোভা কাটিয়া নষ্ট করিতেছে ভাবিলেও মনের মধ্যে কেমন করে! তেমন ঝাকালো একখানা গাছ বড় হইতে লাগে পঞ্চাশ-ষাট কী একশো বছর। আর কাটিতে বড়জোর একদিন। বিলাত-আমেরিকায় বৈদ্যুতিক করাত দিয়া আধঘণ্টায় পনেরো ফুট বেড়ের গাছ কাটিয়া ফেলিতেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় জেনারেল শেরম্যান নামে নাকি একটি বিশাল রেডউড গাছ আছে, তাহার বয়েস প্রায় চার-পাঁচ হাজার বছর। ভাবিলে অবাক লাগে, ওই গাছটি যখন একশো-দেড়শো বছরের তরুণ, তখন মানুষ সবে কিছুকাল গুহা হইতে বাহির হইয়া সভ্যতা গড়িতেছে—মেসোপটেমিয়ায় বর্ণলিপির অভ্যুদয় ঘটিতেছে, মিশরে ফারাও খুফুর পিরামিড তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। মানবসভ্যতার সেই অস্পষ্ট ঊষাকালের সাক্ষী পাঁচহাজার বৎসরেব ওই রেডউড গাছ। কিন্তু হইলে কী হইবে, কাঠের লোভে কাণ্ডজ্ঞানশূন্য ব্যবসায়ীর দল উহা কাটিল বলিয়া। আধুনিক যুগ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তিই সত্য, সাধে কী আর লোকে তাহাকে ঋষি বলে! কমলাকান্ত আফিংয়ের ঘোরে যাহা বলিতেছে, তাহা বঙ্কিমেরই হৃদয়ের কথা। কমলাকান্তের জিজ্ঞাসা—এই যে মানুষ এত টাকা করিতেছে, রেলগাড়ি বানাইতেছে, টেলিগ্রাফের কল বানাইতেছে, মানুষে মানুষে প্রণয়ের একটা কল অবিষ্কার করা যায় না? নহিলে আর সব কলই যে বেকল হইয়া যাইবে।
