ডদিনরাত পরিশ্রম করিয়া দুইদিনের মধ্যেই সে অনুবাদটি জমা দিয়া আসিল।
হাতে আবার কোন কাজ নাই। অখণ্ড অবসর। এক বন্ধুর বাড়ি হইতে আনা কারেনিনা চাহিয়া আনিয়াছিল। সমালোচকদের মতে পৃথিবীর দশটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মধ্যে আনা কারেনিনা স্থান পাইবার যোগ্য। কিন্তু পড়িতে শুরু করিয়া কাজল কেবলই হোঁচট খাইতে লাগিল, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও পঞ্চাশ-ষাট পৃষ্ঠার বেশি অগ্রসর হইতে পারিল না। ব্রাদার্স কারামাজোভ পড়িবার সময়ও তাহার এমনি হইয়াছিল। কিছুদিন বাদ দিয়া আবার আরম্ভ করিলে হয়তো শেষ করিতে পারিবে এই আশায় তখনকার মতো সে বইটি রাখিয়া দিল। আনা কারেনিনা সে আর শেষ করিতে পারে নাই, কিন্তু বছর দুয়েক পর ছিন্নপত্র পড়িতে পড়িতে হঠাৎ উল্লসিত হইয়া আবিষ্কার করিল–রবীন্দ্রনাথেরও আনা কারেনিনা ভালো লাগে নাই। আরম্ভ করিয়াও তিনি বইখানি অর্ধপঠিত রাখিয়াছিলেন। এতবড়ো মানুষকে দলে পাইয়া কাজল খুশি হইল। অন্তত কোনকিছু না পড়ার দিক হইতে রবীন্দ্রনাথের সহিত তাহার মিল আছে।
বরং ডিকেন্স্ চলিবে বলিয়া মনে হইল। আর সঙ্গে কিছু এইচ.জি. ওয়েলস এবং জুল ভার্নের গল্প ও উপন্যাস। বিজ্ঞানসুবাসিত গল্পের প্রতি তাহার পরিচিত অনেকেরই বিরূপ মনোভাব আছে। সায়েনস ফিকশনের পাঠকসংখ্যা এদেশে নিতান্তই কম। একদিন স্বয়ং গুহ মহাশয়, যাহার মতামতের উপর তাহার গভীর শ্রদ্ধা আছে, তাহাকে বলিয়াছিলেন—তুমি সায়েনস্ ফিকশন পড়ে সময় নষ্ট কর কেন? জানো কী, একজন মানুষ সারাজীবন অন্য কিছু না করে কেবলমাত্র বই পড়লেও মাত্র চারপাঁচ হাজারের বেশি বই পড়তে পারে না। এদিকে পড়বার মতো ভালো বই রযেছে এর দশগুণ। কাজেই পাঠকের সতর্ক নির্বাচক না হয়ে উপায় নেই। ক্লাসিক পড়—ক্লাসিক।
দ্বিজেনবাবুকে কাজল মনে মনে পিতার মতো শ্রদ্ধা করে, সে তাহার কথার প্রতিবাদ করিল। আসলে বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প পড়িতে সে ভালোবাসে, কারণ এই ধরনের লেখা তাহার মন ও চিন্তাকে প্রসারিত করে। মানুষ যে কেবল এই পৃথিবীটার বাসিন্দা এমন নহে। গ্রহতারকাখচিত সমগ্র বিশ্বজগৎটা তাহার জীবনের পটভূমি। এই সত্য একবার হৃদয়ের গভীরে যথার্থভাবে অনুভব করিতে পারিলে অনেক পার্থিব সমস্যা সরল হইয়া আসে। কারণ বেশিরভাগ সমস্যাই মানুষের লোভ, ক্ষমতার আকাঙক্ষা ও বাসনা কামনা হইতে সঞ্জাত। সংকীর্ণতা দূর করিয়া সমস্ত জীবনটাকে একসঙ্গে দেখিতে পাইলে নতুন আবিষ্কারের আনন্দে মন ভরিয়া ওঠে। অবশ্য আমেরিকায় আজকাল বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের কতগুলি অবাস্তব, বাজে গল্পে ভরা পত্রিকা বাহির হইয়াছে, যাহাকে পাল ম্যাগাজিন বলে—তাহাতে প্রকাশিত লেখাগুলি প্রকৃতই গাঁজাখুরি। তবে খুঁজিলে তাহার মধ্যেও দুএকটা ভালো লেখা চোখে পড়ে।
একদিন রাত্রে খাইতে বাসিয়া বাবার গল্প হইতেছিল। হৈমন্তী বলিল—লোকে তোর বাবার কত প্রশংসা করে। আমি মনে মনে ভাবি, বেঁচে থাকলে সে আরও কত লিখতে পারত। প্রথম যে দুখানা বই লিখে তোর বাবা নাম করে, সে দুটো নিজের জীবন নিয়েই লেখা—তা তো জানিস। মারা যাবার কদিন আগে থেকে কেবলই বলছিল—আমার তো বয়েস বাড়ল, ও বইখানার তৃতীয় খণ্ড এবার লিখব। অনেক বলার কথা জমেছে। তা শুরু করার আগেই তার দিন ফুরোলো।
কাজল বলিলকীভাবে লিখবেন সে বিষয়ে বাবা তোমাকে কিছু বলেন নি?
-নাঃ। সবে খসড়া করতে শুরু করেছিল, আর কিছুদিন সময় পেলে বলত হয়তো। তবে তোর কথা লিখত এটা আমি জানি, কারণ দ্বিতীয় উপন্যাসে তোর চরিত্র অনেকখানি আছে।
অনেক রাত্রে ছাদে পায়চারি করিতে করিতে কাজলের মনে হইল—বাবা যে উপন্যাসটা লিখিবে ভাবিয়াছিল সেটা শেষ করিয়া ফেলিলে কেমন হয়? অন্য কিছু না হলেও একটা সাহিত্যের অ্যাভেঞ্চার তো হইবে।
কিন্তু কী লিখিবে সে? বাবার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাহার নাই। দারিদ্রের সহিত তীব্র সংগ্রামও তাহাকে করিতে হয় নাই। পৃথিবীর সমস্ত মহৎ উপন্যাসের মূলবস্তু যে বঞ্চনা, দুঃখ এবং বিশাল আত্মিক অভিজ্ঞতা, সে তাহার আছে কী? খামোক একটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন সামাজিক উপন্যাস লিখিয়া কী লাভ? আরও দুই-একটা গল্প লিখিয়াই সে বুঝিয়াছে নিজস্ব জীবনসত্য অবলম্বন করিয়া কেবল বানাইয়া লিখিলে ভালো সাহিত্য হয় না। তাহা হইলে সে কী লিখিবে? বড়ো বড়ো বিশ্ববন্দিত সাহিত্যিকদের সহিত তাহার জীবনের যে কোনও মিলই নাই।
তাহার পরই মাথার উপরে বিরাট নৈশ আকাশটার দিকে তাকাইয়া তাহার মনে হইলনাই বা থাকিল অন্য কারও মতো অভিজ্ঞতা, জীবন কী সকলের একরকম হয়? এই যে আকাশটা তাহার মাথার ওপর রহিয়াছে, এই যে বর্ষার মেঘ ঘনাইয়া আসা দিনে সবুজ গাছপালার মধ্য দিয়া গ্রামের পথে বেড়াইবার গভীর আনন্দ—সেই আনন্দ সে পাইয়াছে। জীবন-মৃত্যুর রহস্য সম্বন্ধে চিন্তা কতদিন কতরাত্রি অবধি তাহাকে ঘুমাইতে দেয় নাই। নিকটতম মানুষের মৃত্যু তাহাকে চিরজীবনের মতো নিঃসঙ্গ করিয়া দিয়াছে, কোন ঐশ্বর্যেই যাহা আর পূর্ণ হইবার নহে। কত বিচিত্র মানুষের সহিত তাহার পরিচয় হইয়াছে—আখের আলি, রামদাসকাকা, ব্যোমকেশনাঃ, জীবনটা একেবারে হেলাফেলায় কাটে নাই। অভিনবত্বের ঘনঘটা না থাকিলেও এইসব সাধারণ কথাই সে লিখিবে, সে যদি ইহা হইতে আনন্দ পাইয়া থাকে তাহা হইলে সততার সহিত লিখিতে পারিলে পাঠকও নিশ্চয় সেই লেখা গ্রহণ করিবে।
