কাজল লজ্জিত স্বরে বলিল—আজ্ঞে আমি—মানে–
-লজ্জার কিছু নেই, সাহিত্যের আড্ডায় অমন করে একপাশে সরে থাকলে কি চলে? নাও, মুড়ি তোল
আর গল্পই বা কত রকমের! সেকালের কাহিনী হইতে আরম্ভ করিয়া ভূতের গল্প, বিশ্বসাহিত্যের বিশ্লেষণ, নেপোলিযনের জীবনী, পাঁচমিশেলি খোশগল্প—তাহার তালিকা করাই
কঠিন। বসিয়া থাকিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কাজ হইয়া যায়।
বসু এবং গুহ দুইজনেই খ্যাতনামা সাহিত্যিক বটে। প্রখ্যাত সাময়িকপত্রগুলির যে কোন সংখ্যা খুলিলে তাহাদের রচনা চোখে পড়িবেই। বোধহয় স্বত্বাধিকারীদ্বয় নিজেবা শিল্পী হওযার জন্য এই সংস্থায় ব্যবসার শুষ্ক বৈষয়িক আরহাওয়াটা নাই। বিজনেস উইথ প্লেজার যাহাকে বলে–ইহা তাই।
রাস্তার উপরে দোকান। পাশেই একটি ছোট দরজা, সেখান দিয়া ঢুকিলে সৰু ইটবাঁধানো গলির শেষে একটি মাঝারি ঘর। এইটিই প্রকাশনের কার্যালয়। দরজার সামনাসামনি ঘরের অপরদিকে একখানি সবুজ গদিমোড়া আরামকেদারা, কেদারার মাথার কাছে বঙ্কিমচন্দ্রের অয়েল পেন্টিং। বসু ও গুহ পাবলিশার্সের একজন লেখক, যিনি শিল্পীও বটে, তিনি আঁকিয়া উপহার দিয়াছেন। আরামকেদারাটি কাহার দখলে থাকিবে তাহা লইয়া প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা চলে। বসু মহাশয় আগে পৌঁছিলে তিনি হাত-পা ছড়াইয়া সেটিতে বসিয়া পড়েন, দেবিতে আগত অপর বন্ধু পাশের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়া সতর্কভাবে সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকেন। সামান্য কাজে বাহির হইতে দুই মিনিটের জন্য ঘুরিয়া আসিয়া বসু মহাশয় দেখেন সিংহাসন খালি রাখিলে সাধারণত যাহা হয় তাহা হইয়াছে—সেটি বেদখল হইয়াছে। এইবার প্রশান্তমুখে তাহার অপেক্ষা করিবার পালা। সামনেই একটি সোফা রহিয়াছে, অতিথিরা তাহাতে বসেন। অফিসের কাজের জন্য কয়েকটি চেয়ার-টেবিল আছে। আড্ডাধারীদের সংখ্যাধিক্য ঘটিলে সেগুলিও দখল হইয়া যায়। আড্ডাঘরে ঢুকিয়া কাজল দেখিল আজ এখনও সাহিত্যিক সমাগম আরম্ভ হয় নাই। প্রৌঢ় দ্বিজেন্দ্রকুমার গুহ আরামকেদারায় হেলান দিয়া আপনমনে কী ভাবিতেছেন, বজলকে দেখিয়াই তিনি হঠাৎ চমকাইয়া সোজা হইয়া বসিলেন। কিছুক্ষণ অবাক হইয়া তাকাইয়া থাকিয়া একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আবার কেদারায় হেলান দিলেন।
সামনের সোফায় বসিতে বসিতে কাজল বলিল—কী হল কাকাবাবু আমাকে দেখে অমন চমকে উঠলেন যে?
গুহ মহাশয় প্রথমে উত্তর দিলেন না। তারপর বলিলেন–তোমার চেহারাটা হয়েছে অবিকল তোমার বাবার মতন। হঠাৎ মনে হয়েছিল যেন অপুর্ববাবু ঢুকছেন। খেয়াল ছিল না মাঝখানে এতগুলো বছর কেটে গিয়েছে—সেসব সুখের দিন আর নেই–
বাবার কথা মনে পড়িয়া কাজলেরও মন ভারি হইয়া উঠিল। পৃথিবীতে কত লোক কত বেশি বয়েস পর্যন্ত বাচিয়া থাকে, তাহার বাবা আর অন্তত দশ-বারোটা বছর বেশি বাঁচিলে কাহার কী ক্ষতি হইত?
গুহ মহাশয় বলিলেন—তোমার দুর্ভাগ্য, বাবাকে তুমি বেশিদিন পেলে না। আমি তোমাকে জোর গলায় বলছি, অমন মানুষ হয় না। সৎ, নির্লোভ, সবরকম আসক্তিহীন পুরুষ। বৈদিক যুগের ঋষিদের দেখিনি, কিন্তু বর্তমান যুগে জন্মালে হয়তো তারা এইরকমই হতেন। মনে মনে আমি নিজেকে অপূর্ববাবুর শিষ্য বলে মনে করি। জীবনের অনেক গভীর শিক্ষা আমি তার কাছ থেকে পেয়েছি। এখনই কী হয়েছে, এমন একটা দিন আসবে দেখো যেদিন লোকে তার ছবি টাঙিয়ে পুজো করবে।
এইসময় একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন—এই যে দ্বিজেনবাবু, ভালো আছেন তো? আমার সে অনুবাদগুলো কই? আজ পাব তো?
গুহ মহাশয় টেবিলের টানা হইতে একতাড়া কাগজ বাহির করিয়া তাহার হাতে দিয়া বলিলেন—একটা বাদে সবগুলো আছে। নিন-
-একটা বাদ? সর্বনাশ! কালই প্রেসে দেব যে! বাকি কপি কবে পাওয়া যাবে?
দ্বিজেনবাবু বলিলেন—যাকে দিয়ে করাবো তার হয়েছে জ্বর। আচ্ছা দেখি কী করা যায়—
–একটু দেখুন দয়া করে, নইলে বড্ড মুশকিলে পড়ে যাব।
ভদ্রলোক বিদায় লইলে গুহ মহাশয় বলিলেন–উনি বইপাড়ারই একজন নতুন প্রকাশক। সারা পৃথিবীর কিছু গল্প বেছে অনুবাদ করিয়ে বিশ্বসাহিত্যে সেরা গল্প নাম দিয়ে একটা সংকলন প্রকাশ করতে চান। নতুন ব্যবসায় এসেছেন, কাউকে তেমন চেনেন না। তাই গল্পগুলো অনুবাদ করিয়ে দেবার ভার দিয়েছেন আমাকে। শেষ গল্পটার জন্য কাজ ঠেকে থাকছে, দু-একদিনের মধ্যে না দিতে পারলে প্রেস দাঁড়িয়ে যাবে–
কথা থামাইয়া গুহ মহাশয় কাজলের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকাইয়া রহিলেন, তারপর বলিলেন—তুমি তো ইংরেজির ছাত্র, কিছুদিন আগে কী পত্রিকায় তোমার একটা গল্পও দেখলাম। তুমি কাজটা করে দিতে পারবে না?
কাজল অবাক হইয়া বলিল—আমি? আমি করে দেব বলছেন?
-হ্যাঁ, কেন নয়? এমন কিছু কঠিন কাজ নয়-দশবারো পাতা ইংরেজি থেকে সরল বাংলায় তর্জমা করতে হবে। আর তোমার তো নিজের সাহিত্যিক প্রবণতাও রয়েছে। করবে?
ঢোঁক গিলিয়া কাজল বলিল—–আজ্ঞে করবো।
আবার টেবিলের টানা খুলিয়া কয়েক পাতা টাইপ করা কাগজ বাহির করিয়া গুহ মহাশয় কাজলের হাতে দিলেন। বলিলেন—তাহলে ওঠো, আজ আর বোসো না। বাড়ি গিয়ে কাজে লেগে যাও। পরশু কিংবা তরশুর মধ্যে অনুবাদটা চাই।
বাড়ি আসিবার সময় ট্রেনের কামরায় বসিয়া কাজলের নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস হইতেছিল না। হাতে লেখা পত্রিকায় গল্প প্রকাশ নয়, সাময়িকপত্রেও নয়, একেবারে বাঁধাই করা দুই মলাটের মধ্যে তাহার গল্প ছাপা হইবে? অবশ্য মৌলিক নয়, অনুবাদ গল্প এবং অন্য আরও গল্পের সহিত, কিন্তু তাহাতে কী আসে যায়? জীবন তো কোথাও না কোথাও শুরু করিতেই হইবে। কে জানে, ইহাই হয়তো তাহার জীবনের প্রথম লাকি ব্রেক। কোথায় যেন পড়িয়াছিল-নাম করিতে হইলে প্রতিভার সহিত ঠিক সময়ে ঠিক জায়গাতে উপস্থিত থাকিবার যোগাযোগও ঘটা চাই। আজ সে বসু ও গুহ পাবলিশার্সে না ঢুকিয়া সরাসরি বাড়ি চলিয়া গেলে এই মোগাযোগটি ঘটিত না। যোগাযোগ ঘটিয়াছে, বাকিটা এবার তাহার হাতে।
