পরের কয়েকদিন সে বাবার শেষদিকের দুই-তিন বছরের ডায়েরি ভালো করিয়া খুঁজিয়া দেখিল, কোথাও কোন পরিকল্পনা বা খসড়া পাওয়া যায় কিনা। না, সে রকম কিছুই নাই। বাবা যদি কিছু ঠিক করিয়া থাকে, সেটা তাহার মনের ভিতরেই ছিল। যাক, এক দিক দিয়া ভালোই হইল। সে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে লিখিতে পারিবে। বাবা নিজের জীবনের কথা লিখিয়াছিল, সেও শৈশব হইতে তাহার নিজের জীবনের কথা লিখিবে। পিতার আরব্ধ কর্ম সম্পন্ন করা এক ধরনের পিতৃতর্পণ, বাবা হয়তো স্বর্গ হইতে তাহাকে আশীর্বাদ করিবে।
কিছু কাগজ কিনিয়া একদিন সকাল হইতে কাজল লিখিতে বসিল।
১১. জলাশয়ের কেন্দ্রে ঢেউ উঠিলে
একাদশ পরিচ্ছেদ
জলাশয়ের কেন্দ্রে ঢেউ উঠিলে সে ঢেউয়ের বৃত্ত ক্রমবিস্তীর্ণ হইয়া একসময় যেমন দুরতম কোণে অবস্থিত জলজ উদ্ভিদের ক্ষুদ্র পাতাটিতে কম্পন জাগায়, তেমনি সমগ্র পৃথিবীতে ঘটিয়া যাওয়া কয়েকটি ঘটনার প্রভাব মহাদেশ পার হইয়া কাজলকে স্পর্শ করিল। জাপানে পরমাণু বোমা পড়িয়া বিশ্বযুদ্ধ থামিলে পৃথিবীসুদ্ধ লোক হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে ব্যাপারটার নৃশংসতায় অবাক হইয়া গেল। যুদ্ধ যাহারা করে তাহাদের নিকট আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অনেক বাছা বাছা যুক্তি থাকে। আমেরিকা বলিল–এই শেষপর্বেও জাপান যেভাবে মরীয়া হইয়া যুদ্ধ চালাইতেছিল, তাহাতে পরমাণু বোমা ব্যবহার করা ছাড়া অবিলম্বে এই নিরর্থক লোকয় বন্ধ করিবার আর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু কিছু লোক এই যুক্তি মানিল না, তাহারা বলিল–জাপান যেভাবে কোণঠাসা হইয়া আসিতেছিল, তাহাতে যুদ্ধ আর কয়েকদিন বাদে আপনিই থামিয়া যাইত। মৃতপ্রায়, হতবল একটা জাতির নিরস্ত্র ও অসামরিক জনগণের উপর এই মহাশক্তিশালী অস্ত্রের প্রয়োগ নিজের শক্তি দেখাইবার একটা অমানবিক পন্থা মাত্র। বার্ট্রান্ড রাসেল প্রমুখ শান্তিবাদী দার্শনিকেরা এই মতের পক্ষ লইলেন। যাঁহার বস্তু ও শক্তির অভেদ নির্ণায়ক সূত্র অনুযায়ী বোমা বানানো হইয়াছিল, সেই আইনস্টাইন স্বয়ং ধ্বংসদেবতার নির্মম রুপ দেখিয়া মুহ্যমান হইয়া পড়িলেন। এই ভয়ানক অস্ত্র ব্যবহার না করিবার জন্য তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করিয়া চিঠি দিয়াছিলেন, সে চিঠি খোলাই হইল না। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট বদল হইয়া গেল। যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে কে খোঁজ রাখে কোথাকার একটা পাগলা বৈজ্ঞানিক কী বলিতেছে! প্রথমে নেভাদার মরুভূমিতে এবং পরে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার জোরদার পরীক্ষা হইয়া গেল।
অনেকদিন আগে রেললাইনের ধারে একটা মরা গরুকে পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া কাজলের মনে ভয়ানক ধাক্কা লাগিয়াছিল। তখনও তাহার বাবা বাঁচিয়া আছে। তাহার ভীত, আতঙ্কিত মুখ দেখিয়া অপু সস্নেহে তাহাকে একহাত দিয়া জড়াইয়া বুকের কাছে আনিয়া অনেক সানা দিয়াছিল। এখন বাবা নাই, যেদিকে তাকানো যায় জীবনের কোনোক্ষেত্রে নির্ভর করিবার মতো একটা ব্যক্তিত্ব নাই। বীভৎসতার নগ্নরূপ দেখিয়া কাজল কেমন যেন দমিয়া গেল। তাহা হইলে কী কাব্য, দর্শন, সংগীত মিথ্যা? সম্পূর্ণ অর্থহীন? শৈশব হইতে মানবসভ্যতার শুভ প্রভাব সম্বন্ধে তাহার যে গভীর বিশ্বাস, তাহা কী কেবলই কথার কথা? বারবার তাহার মনে পড়িতেছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা মা ইট গ্রিভ মাই হার্ট টু সি হোয়াট ম্যান হ্যাজ মেড অফ ম্যান!
কিছু ভালো লাগে না। কবিতা বিস্বাদ লাগে, ভালো গান শুনিতে ইচ্ছা করে না, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আশাবাদী সাহিত্যকর্মকে হাসির গল্প বলিয়া মনে হয়। চোখের উপর দিয়া মিছিল করিয়া যায় তেজস্ক্রিয়তার কামড়ে আসন্ন মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষারত নিরপরাধ নরনারীর দল। কাহারও গায়ে দগদগে ঘা, কাহারও শরীর হইতে মাংস খসিয়া পড়িতেছে, কেহ বা কোটর হইতে বাহির হইয়া আসা নিজের গলিত চোখ হাতে লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। কোথাও বা সোকাহত মা নর্দমা হইতে আঁচল ভিজাইয়া জল আনিয়া মৃত শিশুর মুখে দিয়া তাহার জ্ঞান ফিরাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছে। কোথাও নির্জনে গিয়া বসিলেই এইসব দৃশ্য চোখের সামনে ভাসিয়া ওঠে। মনে হয় পৃথিবী সম্পূর্ণ গ্লানিমুক্ত না হইলে এই পাখির ডাক, মায়াময় রঙে রাঙানো সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত, মালকোষের শিহরণ জাগানো আলাপ–কোনও কিছুরই কোনো মূল্য নাই। এই মুহূর্তে যখন বিধ্বংসী কামানের গর্জনে দিগন্ত কাঁপিতেছে, বোমারু বিমানের সার্চলাইটের আলোতে রাত্রির আকাশ শতধা বিভক্ত, তখন সেই সৌন্দর্যহীন, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসহীন পৃথিবীতে সুকুমার বৃত্তির স্থান কোথায়?
ভারতের স্বাধীনতা আসন্ন। সংবাদপত্রের খবরে বিভিন্ন মহলের তৎপরতায় সেই আশ্বাস ক্রমেই স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে যে, ইংরাজ যাইবার সময় ভারতকে দুইটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করিয়া দিয়া যাইবে। যে ঐশ্বর্য তাহারা নিজেরা ভোগ করিতে পারিল না, কুটিল ইংরাজ তাহা অপরকেও সুখে ভোগ করিতে দিবে না। দুই রাজ্য কীভাবে এবং কিসের ভিত্তিতে ভাগ হইবে তাহা লইয়া সর্বত্র জল্পনা-কল্পনা আরম্ভ হইল। দেশের ভিতর যেসব বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায় এতদিন শান্তিতে বাস করিত, পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতির কোন অভাব ছিল না—এইবার সেই সহিষ্ণুতা ও বন্ধুত্বের শান্ত জলে ইংরাজ নিক্ষিপ্ত ঢিল আসিয়া পড়িল।
