গ্রামের মানুষটি অন্য তিনজন ভদ্রলোকের দিকে তাকাইয়া কাজলকে দেখাইয়া বলিলেন–এই ইনিই অপূর্বাবুব ছেলে—
আগন্তুক ভদ্রলোক তিনজন যেন একটু কৌতূহলের সহিত কাজলের দিকে তাকাইলেন। কাজল বলিল–নমস্কার।
প্ৰতিনমস্কাব করিয়া তাহাদের মধ্যে একজন বলিলেন—আপনিই অপূর্বকুমার রায়ের ছেলে? আসুন, উঠে এসে এইখানটায় বসুন।
কাজলের মনে মনে হাসি পাইল, কাহাব বাড়িতে কে আমন্ত্রণ জানাইতেছে! পরমুহূর্তেই যেন কাজলের অন্তরের কথার প্রতিধ্বনি করিয়া ভদ্রলোক বলিলেন—আমরা কিন্তু এখানে অতিথি নই। সেজন্যই আপনাকে ডেকে বসতে বললাম। অপূর্ববাবু শুধু আপনার বাবা নন, তিনি সমস্ত দেশের মানুষের সম্পত্তি। তা এখানে তার স্মৃতিরক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেই?
কাজল সবিনয়ে জানাইল-চেষ্টা চলিতেছে, তবে কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয় নাই।
আগন্তুক বলিলেন—কিছু মনে করবেন না, এ বিষয়ে কিন্তু লেখকের ফ্যামিলি হিসেবে আপনাদের আর একটু উদ্যোগী হওয়া উচিত। মানুষ অনেক আশা নিয়ে এখানে আসে।
গ্রামের অচেনা ভদ্রলোক বলিলেন—আমিও তাই বলি। আপনার উচিত শহরের বাস ছেড়ে দিয়ে এখানে এসে থাকা
কাজল অবাক হইয়া বলিল—তা কি সম্ভব? আমার পড়াশুনো আছে তো—
আগন্তুকদের একজন বলিলেন—আপনি কী পড়েন?
–আমি এইবার এম.এ. দেব।
–তাহলে তো প্রায় শেষ করে এসেছেন। তারপরে এখানে থাকতে বাধা কী?
কাজল বলিল—পড়া শেষ হলেই তো সবকিছু শেষ হয় না। বরং সেখান থেকেই জীবনের শুরু। গ্রামে থেকে আমার কাজকর্ম
—আপনার বাবার তো আটকায় নি। এ গ্রামের মানুষ হয়েও তিনি বড়ো লেখক হয়েছেন।
—আমার বাবার জীবনী বোধহয় আপনারা ঠিক জানেন না। খুব ছোটবেলায় তিনি এ গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারপর সারাজীবন কেটেছে কলকাতায়, কাশীতে, মধ্যপ্রদেশের গভীর জঙ্গলে—আরও কত জায়গায়। গ্রামে আর কোনদিনই ফিরে আসতে পারেন নি। ভ্রমণ না করে নিশ্চিন্দিপুরে থেকে গেলে তিনি কী লেখক হতে পারতেন?
গ্রামের মানুষটি ঈষৎ রাগতস্বরে বলিল—তাহলে এই গ্রামের প্রতি আপনার যে একটা কর্তব্য এবং দায়িত্ব আছে সেটা আপনি অস্বীকার করতে চান?
আরও প্রায় আধঘণ্টা কাজল তাহাদের চাবজনকে বোঝাইবার চেষ্টা করিল—সে পলায়নপর উদাসীন নহে। মধ্যবিত্ত সংসারেব বিভিন্ন গ্রাস হইতে বাঁচাইয়া এই বাড়িটা নতুন করিয়া বানানো হইয়াছে। এরপর মনসাপোতার এবং মৌপাহাড়ির বাড়িটাও ঠিক করিতে হইবে। সে একমাত্র ছেলে, কত দিকে একসঙ্গে তাহার পক্ষে দৌড়ানো সম্ভব?
লোকগুলি বিশেষ বুঝিল বলিযা মনে হইল না। তাহাবা কাজলের প্রতি কথাব উত্তবে নানান সম্ভব-অসম্ভব যুক্তি দেখাইতে লাগিল। গ্রামেব ভদ্রলোকটি তো মনে হইল কাজলের উপব কোনো অজ্ঞাত কাবণে ভয়ানক চটিয়া বহিছেন। এইটাই কাজলের মনে বেশি করিয়া লাগিল। তাহার নিজের গ্রামের মানুষ কিনা তাহাকে ভুল বুঝিয়া তিরষ্কার করিতেছে! তাহাদেব স্বপ্নের নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ! তাহার বাবার স্মৃতিরক্ষার প্রসঙ্গে তাহার দায়িত্বেব কথা সে ভালো করিয়াই জানে, এবং সে তাহা অস্বীকারও করিতেছে না। কিন্তু তাহার নিজেরও তো একটা জীবন আছে। সে বাবার মতো লেখক হইতে চায়, পৃথিবীটা ঘুরিয়া দেখিতে চায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, নিজের মতো করিয়া বাঁচিতে চায়। অপূর্বকুমার রায় যেমন তাহার একাব বাবা নহে, সমস্ত দেশবাসীর গর্বের স্থল, তাহার স্মৃতিরক্ষার বিষয়েও তো দেশবাসীর মনোযোগী হওয়া উচিত।
১০. এম.এ. পরীক্ষা হইয়া গেল
দশম পরিচ্ছেদ
এম.এ. পরীক্ষা হইয়া গেল। পরীক্ষা দিয়া কাজল বুঝিতে পারিল সে পাশ করিবে বটে, কিন্তু বিশেষ চমকপ্রদ ফল হইবে না। তেমন ফল করিতে গেলে যে পদ্ধতি অনুযায়ী সাধনা করা উচিত এবং যতখানি সময় দেওয়া প্রয়োজন, তাহার কোনোটাই কাজলের পক্ষে সম্ভব হয় নাই। তাহাতে দুঃখ নাই, জীবনে চলার পথেব দুই ধারে যে সৌন্দর্য এবং বিস্ময় ছড়ানো রহিয়াছে তাহাকে অনুভব করা এবং স্বীয় অস্তিত্বের কারণ সন্ধান—এই দুইটিই মানুষেব প্রধান কাজ। সেগুলি সুচারুভাবে সম্পন্ন করিতে পারিলেই জীবন অনেকখানি সার্থক।
আপাতত কী করা যায়? পরীক্ষা শেষ হইবার উল্লাসে প্রথম কয়েকদিন সে খুব বেড়াইল, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিল, বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু পড়াশুনাও কবিল। ইহার মধ্যে একমাত্র পড়াশুনা ছাড়া অন্য প্রসঙ্গে দিন-দশেকের মধ্যেই সে বিরক্ত হইয়া উঠিল। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ ভালো জিনিস, কিন্তু কাঁহাতক অর্থহীন আড্ডা দেওয়া সম্ভব?
একদিন প্রভাতের সঙ্গে সারা দুপুর গল্প করিবার পর কাজল কলেজ স্ট্রীটে তাহার বাবার প্রকাশকদের কাছে গেল। দুই মালিকের নামে দোকানের নাম-বসু ও গুহ পাবলিশার্স। দুই বাল্যবন্ধু মিলিয়া ব্যবসা চালান। বাঙালির কোনোপ্রকার যৌথ উদ্যোগ সচরাচর বেশিদিন স্থায়ী হয় না। অংশীদারকে ছাড়াইয়া নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির করিবার ব্যগ্রতায় এবং নানাবিধ ছোটবড়ো স্বার্থের সংঘাতে অচিরেই নষ্ট হইয়া যায়। কিন্তু এই দুই বন্ধু ব্যবসাক্ষেত্রে বাঙালি জাতির আরহমান ঐতিহ্যকে মিথ্যা প্রমাণ করিয়া বহুদিন পাশাপাশি অনড় বসিয়া আছেন। কলেজ-জীবন হইতেই কাজল সপ্তাহে অদ্ভুত একদিন এদের দোকানে গল্প শুনিবার লোভে গিয়া হাজির হয়। দুপুর হইতেই বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত মানুষেরা আড়ার নেশায় আসিয়া জমিতে শুরু করেন। মুড়ি, তেলেভাজা এবং চায়ের সদাব্রত খোলাই আছে। খবরের কাগজে মুড়ি ঢালিয়া হাতের ঠোঙা হইতে গরম বেগুনি তুলিয়া রাত আটটা অবধি গল্প চলিতেছে। এই আড্ডায় হোটবড়ো ভেদাভেদ নাই। এতগুলি বিখ্যাত লোকের সামনে প্রথম দিন কাজল সংকুচিত হইয়া একপাশে একটু সরিয়া বসিয়া ইঁহাদের কথা শুনিতেছিল। একজন তাহা লক্ষ করিয়া বলিলেনক হে, তুমি মুড়ি নিচ্ছ না যে? তেলেভাজা খাবে না?
