একদিন বিখ্যাত একটি বাংলা সংবাদপত্রের চিঠিপত্রের স্তম্ভে অপুর স্মৃতিরক্ষার প্রসঙ্গে একটি পত্র প্রকাশিত হইল। পত্ৰলেখক অপুর জনৈক ভক্ত। তিনি জানিতে চাহিয়াছেন আধুনিক বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক অল্প বয়েসে মারা গিয়াছেন বলিয়া কি সবাই তাহাকে ভুলিয়া গিয়াছে? তিনি সম্প্রতি নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম দেখিতে গিয়াছিলেন, সেখানে লেখকের আদি বাসভবন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। মৌপাহাড়িতে লেখকের মৃত্যু হয়—সেখানেও স্মৃতিরক্ষার কোনও ব্যবস্থা নাই। অপূর্ব রায়ের সাহিত্য চিরজীবী হইবে বলিয়া তিনি মনে করেন, অবিলম্বে সকলে কাজে না লাগিলে ভবিষ্যৎ যুগের মানুষের নিকট গালি খাইতে হইবে।
এই চিঠি বাহির হইবার পর একই পত্রিকায় আরও কয়েকটি পত্র প্রকাশিত হইল। তাহাদের লেখক আলাদা হইলেও মর্ম এক।
মনসাপোতায় ঘুরিয়া আসিয়া কাজলেরও মনে হইয়াছিল বাড়িটার মেরামত প্রয়োজন। যাহারা তাহার বাবাকে ভালোবাসে, তাহাদের এরুপ দাবি করিবার অধিকার আছে বটে। হৈমন্তীর সঙ্গে পরামর্শ করিয়া সে তেলি-গৃহিণী এবং রানুদিকে চিঠিসহ কিছু টাকা পাঠাইয়া দিল। ঠিক করিল, মৌপাহাড়িতে নিজে গিয়া বাড়িঘর সারাইয়া আসিবে।
রানুদিকে লিখিল বাবার কেনা সাম্প্রতিক বাড়িটাকে মেরামত করিতে। পুরানো ভিটা যেমন আছে এখন থাকুক।
পরীক্ষার একেবারে মুখে মুখে কাজল রানুদি এবং কুণ্ড-গৃহিণীর চিঠি পাইল। বাড়ির কাজ হইয়া গিয়াছে। কাজল যেন গিয়া দেখিয়া আসে।
রানুদিদি নিজেই তাহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেল।
ভালো করিয়া কান পাতিলে যেন হারানো মানুষগুলির কণ্ঠস্বর শুনিতে পাওয়া যাইবে।
বিকাল হইয়া আসিয়াছে। অপরাহের বিদায়ী সুর লাগিয়াছে দিবসবীণার তন্ত্রীতে। কোথাও কোনো শব্দ নাই, কেবল একটা নাম-না-জানা পাখি কিচমিচ্ করিয়া পাতার আড়ালে লুকাইয়া ডাকিতেছে। অকস্মাৎ বিচিত্র এক অনুভূতিতে কাজলের শিহরিয়া উঠিল। সময় অদ্ভুত জিনিস। মানুষের যা কিছু একান্ত প্রিয়, একান্ত আপন, সবই মহাকালের স্রোতে কেমন অনিবার্যভাবে বিস্মৃতিব মোহনাব দিকে বহিয়া যায়। আজ যাহা নিতান্ত বাস্তব, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ হাসিকান্না লইয়া যে বৃহৎ সংসারটা—আগামীকাল তাহা তাৎপর্যহীন ইতিহাসে পরিণত হয়। যদি না তাহার বাবার মতো হে একটা দাগ কাটিয়া যায়, তাহা হইলে কেহ তাহাকে মনে রাখে না। এই যে আজ পৈতৃক ভিটায় দাঁড়াইয়া তাহার পবিত্র অনুভূতি, রানুদিদির ভালোবাসা-হাজার বৎসর পরে কে মনে রাখিবে? চলিয়া তো যাইতেই হইবে, তবু ইহসর্বস্ব মানুষ অর্থ খ্যাতি প্রতিপত্তির জন্য কত লালায়িত হয়। কাজলের মহাভারতের শ্লোক মনে পড়িল—অহনহনি ভূতানি…।
বেলা একেবারেই পড়িয়া আসিয়াছে। তাহারা দুইজন বাড়ির দিকে ফিরিল।
এইবার নিশ্চিন্দিপুর ভ্রমণে কাজলের এমন একটা অভিজ্ঞতা হইল, যাহা আগে কখনোই হয় নাই। বস্তুত অপ্রত্যাশিত স্থান হইতে আঘাত পাইয়া তাহার মন হঠাৎ খুব দমিয়া গেল। এখন সে অন্যত্র থাকে বটে, কিন্তু এই গ্রামের মাটির সহিত তাহার অন্তরের নিগুঢ় যোগাযোগ আছে, এখানকার মানুষকে সে নিতান্ত আপন বলিয়া মনে করে। এইবার চলিয়া আসিবার পূর্বে সতু তাহাকে ডাকিয়া বলিল—তুমি কি আজই চলে যাচ্ছো নাকি?
–হ্যাঁ সতুকাকা। সামনে আমার পরীক্ষা, পড়া আছে। নইলে আরও দু-একটা দিন থাকতে পারলে ভালো হত–
–হুঁ, তা আবার আসবে কবে?
—পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই একবার ঘুরে যাব। চাবি রানুপিসির কাছে রইল।
-চাবির কথা হচ্ছে না, তোমাকে একটা দরকারি কথা বলি শোনন, অপুর বইয়ের তো বাজারে খুব নাম, আজকাল তোমাদের ভিটে দেখতে বহু লোক আসে। কোনো একটা ছুটির দিন এলে দেখবে বাড়ির সামনে মেলা বসে গিয়েছে। আবার শুনছি মহকুমা শহরের ইস্কুলের ছেলেরা এক বছর তোমাদের ভিটেয় অপুর জন্মদিন পালন করবে। তা তোমার কর্তব্য এখন এখানে একটা পাকাপাকি রকমের কিছু ব্যবস্থা করা। চাবি তত দিয়ে যাচ্ছে, তার হ্যাপা সামলাবে কে? রোজ নিত্যিদিন লোক এসে যদি বাড়ি দেখতে চায়, আমি তো কাজকর্ম ফেলে দৌড়তে পারব না? তার কী ব্যবস্থা করে যাচ্ছো?
কথাগুলি শুনিতে কিঞ্চিৎ কটু হইলেও ন্যায়সঙ্গত বটে। কাজল গ্রামের মুখুজ্যেবাড়ি হইতে ঈশানীবালা নামে এক বৃদ্ধাকে খুঁজিয়া বাহির করিল। তাহার স্বামী পরেশনাথ কলিকাতায় চাকরি করিতেন, বছর দশেক হইল গত হইয়াছেন। জমিজমা বিষয়সম্পত্তি কিছুই নাই, চলাচলতির ভয়ানক কষ্ট। মাসিক ত্রিশ টাকার বিনিময়ে তিনি অপুর নবনির্মিত বাড়িতে থাকিয়া দেখাশুনা করিতে রাজি হইলেন। তাঁহার নিজের বাড়িও জীর্ণ প্রায়, বৃষ্টি হইলে ঘরের সর্বত্র হুহু করিয়া জল পড়ে। দেওয়ালেরও যা অবস্থা, বড়ো রকমের একটা ঝড় হইলেই ধসিয়া পড়িবে। এমতাবস্থায় ঈশানীবালার রাজি না হইবার কথা নহে। কাজল কিছুটা নিশ্চিন্ত হইল, পিতৃপুরুষের ভিটায় অন্তত সন্ধ্যাবাতি পড়িবে।
রওনা হইয়া আসিবার সময়ে কাজল ব্যাগ হাতে একবার তাহাদের বাড়িটা দেখিয়া আসিতে গেল। সঁড়িপথের বাঁক ফিরিবার পূর্বেই শুনিল উঠানে দাঁড়াইয়া কাহারা কথা বলিতেছে। পথের মোড় ঘুরিয়া দেখিল তাহাদের বাড়ির দাওয়ায় তিন-চারজন লোক বসিয়া রহিয়াছে। তাহাদের মধ্যে একজন গ্রামেরই মানুষ, কাজল চেনে, কিন্তু নাম জানে না। তাহাবা চলিয়া যাইবাব পবে নিশ্চিন্দিপুরে অনেক নতুন লোক আসিয়া বসবাস করিয়াছে, সকলের সঙ্গে তাহার পরিচয় হয় নাই।
