একটা পোকা উড়িয়া উড়িয়া আলোর বাবে ঠোক্কর খাইতেছে। সেদিকে তাকাইয়া থাকিতে থাকিতে কাজল ঘুমাইয়া পড়িল।
ঘুম ভাঙিল খুব সকালে। ট্রেন গুমগুম শব্দ করিয়া একটা বিশাল নদী পার হইতেছে। বাঙ্ক হইতে নামিয়া কাজল জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইল। চওড়া নদীগর্ভে ইতস্তত দু-একটা বড়ো পাথর পড়িয়া আছে। বালুকাপূর্ণ নদীখাতের অধিকাংশই শুষ্ক, দু-এক স্থান দিয়া জলধারা বহিয়া চলিয়াছে। এখনও সূর্য ওঠে নাই, প্রভাতের স্নিগ্ধ মাধুর্যে সমস্ত দৃশ্যটি ভরিয়া আছে। দুই অবাঙালি সহযাত্রী উঠিয়া পড়িয়াছিল, তাহাদের একজন কাজলের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া বলিল—ইয়ে শান নদ হ্যায় বাবুজি
দেখিতে দেখিতে শোনের দৃশ্য পিছাইয়া পড়িল।
সূর্য উঠিবার কিছু পরেই মোগলসরাই। কাজল দেখিল তাহার দুই অবাঙালি সহযাত্রীও নামিয়াছে। সে কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল—আপনারা কী কাশী যাচ্ছেন?
-হ্যাঁ বাবুজি, কেন?
—আমিও কাশী যাব। যদি টাঙায় যান তাহলে আমি সঙ্গে যেতে পারি। যা ভাড়া লাগবে তার অর্ধেক আমি দেব
নিশ্চয়, আসুন বাবু আমাদের সঙ্গে। ভাড়া কিছু দিতে হবে না। আমরা তো যাচ্ছিই, বাবুজি কী তীর্থ করতে চলেছেন?
কাজল জানাইল সে তীর্থ করিতে যাইতেছে না বটে, কিন্তু যাহারা তীর্থ করিতে যায় তাহাদের প্রতি তাহার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে।
—আমরা বাবা বিশ্বনাথের মাথায় জল দেব বলে যাচ্ছি বাবু। আমার নাম ধরমদাস, এ আমার চাচেরা ভাই, এর নাম রামচরণ। আমরা বিহারের পূর্ণিয়া জেলার লোক, দুভাই মিলে কলকাতায় ব্যবসা করি। এই প্রথম কাশী আসছি।
প্ল্যাটফর্মের কলে কাজল ও তাহার সঙ্গীয় মুখহাত ধুইয়া লইল। ধরমদাস বলিল—চলুন বাবুজি, কিছু নাস্তা করে নিয়ে টাঙায় উঠব।
মোগলসরাই বেশ বড়ো শহর। স্টেশনের বাহিরেই কিছুদূরে রাস্তার উপর হালুইকরের দোকান। তাহারা তিনজনে ঢুকিয়া পুরী-তরকারি, পেঁড়া ও জিলাপি খাইল। কাজল রাবড়িও সইতে চাহিয়াছিল, ধরমদাস ও তাহার সঙ্গী বারণ করিয়া বলিল—এখানে রাবড়ি খাবেন না বাবুজি, কাশীতে রাবড়ি বিখ্যাত—খেলে সেখানেই খাবেন।
খাওয়া হইলে কাজল সঙ্গীদের বারণ না শুনিয়া তিনজনেরই খাবারের দাম মিটাইয়া দিল। ধরমদাস দুঃখিতমুখে বলিল—এ বড়ো জুলুম করলেন বাবুজি, খেলাম তিনজনে মিলে, তাহলে আপনি একা পয়সা দেবেন কেন?
—তাতে কী হয়েছে ধরমদাস ভাই? বাইরে বেরিয়ে অত চুলচেরা হিসেব করলে চলে না। আপনারা তো টাঙার ভাড়া দিয়ে দেবেন বলেছেন, আমি কী তাতে আপত্তি করেছি?
টাঙায় উঠিয়া কাজল বলিল–আপনারা কোথায় উঠবেন কিছু ঠিক করেছেন?
—না। ভালো কোন ধর্মশালায় উঠব ইচ্ছে আছে।
–আমি আপনাদের সঙ্গে থাকলে আপত্তি নেই তো? ভয় নেই, বিরক্ত করব না—
ধরমদাস বলিল–কী বলছেন বাবুজি! বেফিকর চলে আসুন, আমরা খুব খুশি হব—
এবার দূর হইতে বেণীমাধবের ধ্বজাটা দেখিতে পাওয়া মাত্র কাজলের মন কেমন করিয়া উঠিল। এই কাশী! এখানে তাহার বাবার শৈশবের অনেকখানি কাটিয়াছে, ঠাকুরদার স্মৃতি মাখানো রহিয়াছে। ঠাকুমার মমতা এখানকার বাতাস যেন এখনও বহিয়া ফেবে। ধরমদাসকে সে বলিল বটে যে সে তীর্থ করিতে আসে নাই, কিন্তু এও একপ্রকার তীর্থেই আসা।
বাবাব ডায়েরি হইতে ঠাকুরদার বাসার ঠিকানা সে লিখিয়া আনিয়াছে। সম্ভব হইলে আজই একবার জায়গাটা দেখিতে যাইবে।
যে ধর্মশালায় টাঙাওয়ালা তাহাদেব আনিয়া হাজির করিল তাহা খুব বড়ো না হইলেও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রথমেই কাজল ভালো করিয়া স্নান করিল। সকালে হালুইকরদের দোকানে যে পরিমাণ খাওয়া হইয়াছে তাহাতে এবেলা আর না খাইলেও চলিবে। কিন্তু বর্তমানে একটু ঘুমাইয়া লওয়া প্রয়োজন। ট্রেনে সারারাত ভালো ঘুম হয় নাই, বিকালে ঘুরিতে হইলে শরীরটা ঝরঝরে করিয়া লইলে ভালো হয়।
ঘূম হইতে উঠিয়া কাজল দেখিল বেলা পড়িয়া আসিতেছে। জিনিসপত্র ঘরে রাখিয়া কেবলমাত্র টাকার ব্যাগটি সঙ্গে লইয়া সে বাহির হইল। প্রথমে তো কেহই ঠিকানা শুনিয়া কোনও সন্ধান দিতে পারে না, পরে অনেককে জিজ্ঞাসা করিয়া এবং অনেক ঘুরিয়া মোটামুটি অঞ্চলটা বাহির হইল। কাশীর গলি সম্বন্ধে তাহার কোনও ধারণা ছিল না, পথের সংকীর্ণতা বিষয়ে কলিকাতার সরু গলিই তাহার ধারণার চরম সীমা। মাকড়সার জালের মতো এতগুলি সরু গলি একসঙ্গে কোনও শহরে থাকিতে পারে তাহা সে জানিত না। রাস্তায় সাইনবোর্ডও নাই যে পথের নাম ও নম্বর দেখিয়া লইবে। শেষে একটি সরু গলির মুখে সিমেন্ট বাঁধানো বোয়াকে বসিয়া তাম্রকূট সেবনরত এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিতে বাড়িটার সন্ধান পাওয়া গেল। লোকটি নিতান্ত বৃদ্ধ এবং নিতান্ত শীর্ণ। বিকট একটা কাশির দমক সামলাইয়া লইয়া বলিল—কেন, সে বাড়িতে কী?
-এই, এমনি একটু দরকার আছে
–রামধন মুখুজ্যের কেউ হও নাকি? তাদের এক ভাগ্নে শুনেছি কলকাতায় থাকে।
কাজল সবিনয়ে জানাইল সে রামধন মুখুজ্যের ভাগ্নে নহে।
–আচ্ছা, এগিয়ে যাও, ডাইনে চারখানা দরজা ছাড়িয়ে পাঁচ নম্বরেরটা-বুঝেছো?
কাজল ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া গলিতে ঢুকিল। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন প্রায় ঘনাইয়া আসিয়াছে। ইট বাঁধানো পথে নানা ধরনের বর্জ্যদ্রব্য জমিয়া পরিবেশে একটা স্থায়ী অপ্রীতিকর গন্ধের জন্ম দিয়াছে। এমন সময় বোধহয় না আসিলেই ভালো হইত। সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান, যে বাড়িতে যাইতেছে সেখানেও তাহাকে কেহ চেনে না। সঙ্গে বেশ কিছু টাকাপয়সাও রহিয়াছে। কে জানে, কাশীর গুণ্ডার গুজবটা যদি হঠাৎ সত্য হইয়া পড়ে। একবার মনে হইল ফিরিয়া যায়, কাল সকালে আসিলেই হইবে। তারপরই ভাবিল—দুর ছাই! ভয়ের কী আছে? দেখিই না কী হয়—
