দেশভ্রমণের অনুমতি আদায় করিতে কাজলকে বেশ বেগ পাইতে হইল। প্রস্তাব শুনিয়াই হৈমন্তী বলিল—সে কী কথা! সামনে তোর একজামিন, এখন বেড়াতে বেরুলে পাশ করতে পারবি?
—আমি ঠিক সে অর্থে বেড়াতে যাচ্ছি না মা। কলকাতা আর আমাদের এই শহর বড় একঘেয়ে হয়ে উঠেছে, পড়াতেও তো মন বসছে না। বরং কদিন কোথাও ঘুরে এলে মনটা হাল্কা হবে। বইপত্র সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, যেখানেই থাকি না কেন রোজ পড়াশুনা করব।
-কোথায় যাবি কিছু ভেবেছিস?
সহজে অনুমতি পাইবার জন্য কাজল এইখানে মায়ের সঙ্গে সামান্য তঞ্চকতা করিল। সে বলিল–না, তা এখনও ঠিক হয়নি। আমি তো একা যাচ্ছি না, প্রভাতও যাচ্ছে আমার সঙ্গে। দু-জনে মিলে ঠিক করব।
হৈমন্তী কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইয়া বলিল—প্রভাতও যাচ্ছে? তাহলে অবশ্য—
-হ্যাঁ মা, তুমি কিছু ভেবো না। আমরা খুব সাবধানে থাকব।
জিনিসপত্র কাজল বেশি কিছু সঙ্গে লইল না। একটা মাঝারি সুটকেসে কিছু পাঠ্য এবং কিছু অ-পাঠ্য বই, ডায়েরি, কলম-পেনসিল, কিছু লিখিবার কাগজ এবং কয়েক প্রস্থ জামাকাপড় ভরিল। কাঁধের একটা ঝোলায় লইল চাদর, ফু দিয়া ফোলানো যায় এমন একটা বালিশ, তোয়ালে আর দাড়ি কাটিবার সরঞ্জাম। নিজে বওয়া চলিবে না এমন কোনও জিনিস সে সইল না। বইপত্রের দরুন সুটকেসটা কিঞ্চিৎ বেশি ভারি হইয়া পড়িল বটে, কিন্তু রওনা হইবার আগের দিন রাত্রে কাজল অনেক হিসাব করিয়াও তাহা হইতে একখানা বইও কমাইতে পারিল না। বরং মনে হইল—উপায় থাকিলে আর কখানা বই নিতাম। সবরকম মুডের জন্য সঙ্গে বই নেওয়া ভালো, কখন কী পড়িতে ইচ্ছে করে তার ঠিক আছে কিছু?
কাজল কোথায় যেন পড়িয়াছিল, বাঙালি বেড়াইতে খুব ভালোবাসে বটে–কিন্তু রওনা হইবার সময় দরজায় তালা দিতে গিয়া মনটা একবার কেমন করিয়া ওঠে। মনে হয় না গেলেই যেন ভালো হইত।
সুটকেস আর ঝোলাটা গুছাইয়া ঘরের কোণে রাখা আছে। শুইয়া কাজলের ঘুম আসিতেছিল না। আগামীকাল এইসময় তাহার ট্রেন সগর্জনে ছুটিতেছে। বাহিরের পৃথিবীর যেমন একটা রহস্যময় আকর্ষণ আছে, তেমনি সেই অপরিচিত জগৎটা সম্বন্ধে ভয়মিশ্রিত শঙ্কাও মানুষের মজ্জাগত। নিজের গৃহকোণ শতরকমের প্রীতি ও ঘনিষ্ঠ মমতার আয়োজন সাজাইয়া লইয়া বসিয়া আছে। বৃহত্তর জগতে অজানার আকর্ষণ আছে বটে, কিন্তু নিকটজনের প্রতিপূর্ণ আহ্বান নাই। তবুও সে কেন বাহির হইতেছে?
কল্পনায় রেলগাড়ির চাকার শব্দ শুনিতে শুনিতে সে ঘুমাইয়া পড়িল।
পরদিন সন্ধ্যায় হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাইয়া কাজল দেখিল মনের মধ্যে আশঙ্কা আর দ্বিধার ভাবটা আর নাই। চারিদিকে লোজ্জন ব্যস্ত হইয়া ছুটিতেছে, কুলিদের কোলাহল, ক্যানাডিয়ান এঞ্জিন হইতে তীক্ষশব্দে স্টিম ছাড়িবার উচ্চনিনাদ, কিছু যাত্রী লাইন দিয়া কুঁজায় জল ভরিয়া লইতেছে— ইহারই মধ্যে কী একটা ট্রেন হুইল দিয়া ছাড়িয়া গেল। সব মিলাইয়া বেশ একটা রোমাঞ্চকর পরিবেশ। কিছুক্ষণ থাকিলেই সুদূরে কোথাও যাত্রা করিবার সম্ভাবনায় মন উৎফুল্ল হইয়া উঠে।
আজ বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় পর্যন্ত কাজল কোথায় যাইবে কিছু ঠিক করে নাই। তাহাদের বাড়ির মাঝখানের ঘরটায় বনমালী মিস্ত্রির তৈয়ারি কাঁঠাল কাঠের আলমারিতে তাহার বাবার অনেক বছরের ডায়েরি বহিয়াছে। কলেজ জীবনের কিছুদিন পর হইতে মৃত্যুর পূর্ব অবধি অপু নিয়মিত দিনলিপি লিখিত। অবসর পাইলেই কাজল সেগুলি লইয়া পড়ে। বিশেষ করিয়া বাবাব জীবনের কোনও কিছু জানিবার জন্য নহে—আসলে ডায়েরি পড়িতে বসিলেই বহুদিন আগে বিদায় লওয়া প্রিয় মানুষটা যেন সম্পূর্ণভাবে সজীব হইয়া আবার সামনে আসিয়া দাঁড়ায়। বাবার সহিত আবার একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়।
বাবার একটা ডায়েরিতে সে পড়িয়াছে বাবাও একবার কিছু ঠিক না করিয়া হাওড়া স্টেশনে আসিয়া প্রথম যে গাড়িটা ছাড়িতেছে টিকিট কাটিয়া সেটায় উঠিয়া বসিয়াছিল। সে অবশ্য অতটা করিবে না, কারণ হাওড়া ব্রিজ পার হইবার সময় গঙ্গার ওপারে সমস্ত পশ্চিম দিগন্তব্যাপী সিন্দুরবর্ণ আশ্চর্য সুন্দর সন্ধ্যার দিকে তাকাইয়া থাকিতে থাকিতে অকস্মাৎ সে কোথায় যাইবে ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে।
সে কাশী যাইবে, যেমন বাবা গিয়াছিলেন।
কালো কোট পরা একজন টিকিট কালেকটরকে সে জিজ্ঞাসা করিল–কাশীতে যাবার ট্রেন এখন কী পাব বলতে পারেন?
লোকটা বোধহয় কী জরুরি কাজে যাইতেছিল, থামিবার সময় নাই। চলিতে চলিতেই বলিয়া গেল–কাশী? ভালো ট্রেন পাবেন দিল্লি মেল–
বাকিটা ভালো শোনা গেল না।
কাউন্টারে গিয়া কাজল প্রথমে বেনারস সিটির একখানা টিকিট কিনিল। তাহার পর এনকোয়ারিতে খোঁজ করিয়া জানিল দিল্লি মেল আরও দেড়ঘণ্টা পরে চারনম্বর প্ল্যাটফর্ম হইতে ছাড়িবে। তবে দিল্লি মেল বেনারস সিটির উপর দিয়া যায় না। মোগলসরাই নামিয়া ট্রেন বদলাইয়া অথবা টাঙায় যাইতে হইবে। টাঙাই ভালো, সে কখনও টাঙায় চড়ে নাই।
ট্রেনে উঠিয়া একটা বাঙ্কে সে বিছানা পাতিয়া ফেলিল। দূরভ্রমণের সময় সহযাত্রীদের সঙ্গে খুব সহজেই আলাপ জমিয়া যাওয়াটা নিয়ম, কিন্তু এই কামরায় দুইজন অবাঙালি স্বল্পবাক প্রৌঢ় এবং অনেকগুলি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রহিয়াছে। অবাঙালি সহযাত্রীদ্বয় ট্রেন ছাড়িবার পূর্বেই পুঁটুলি হইতে চাপাটি ও ভাজি বাহির করিয়া নৈশাহার সম্পন্ন করিল এবং পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উপেক্ষা প্রকাশ করিয়া ঘুমাইতে আরম্ভ করিল। বয়স্কদের দলটি বাঙালি বটে, তাহারাও বাবা বিশ্বনাথের মাথায় জল দিতে কাশী চলিয়াছে এমনও জানা গেল, কিন্তু বর্ধমান ছাড়াইবার পরও তাহাদের সম্মিলিত এবং সরব বৈষয়িক আলোচনায় কাজলের প্রাণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। যাইতেছে কাশীতে, সেটেলমেন্টের খাজনার রসিদ, আমমোক্তারনামা এবং খুড়তুতো ভাইকে জব্দ করিবার জন্য উকিলের আবিষ্কৃত কূটবুদ্ধির বিষয়ে আলোচনা এখন কোন কাজে আসিবে? কাজলের হাসি পাইল। মূর্খের দল! ধর্ম করিতে চলিয়াছে, ধর্মের মূল উপদেশটিই গ্রহণ করে নাই।
